ভূত! স্রেফ এই একটা শব্দই যথেষ্ট! ওমনি কেউ সিঁটিয়ে যাবে ভয়ে। রোমাঞ্চের গন্ধ পেয়ে কেউ বা হয়ে উঠবে আরও সাহসী। এ বারের ভূত চতুর্দশীতে বরং সেই সাহসীদের জন্যই থাক এমন এক বেড়ানোর প্ল্যান, যার আপাদমস্তক জড়িয়ে আছে গায়ে কাঁটা দেওয়া সব কাহিনি! একেবারে অকুস্থলে বসে যে সব গল্প শোনা যাবে জমিয়ে। ভূতেদের মর্ত্যে আগমনের রাতে সে আসর বসলে তো কথাই নেই!
গল্পের পটভূমি একেবারে চোখের সামনে। চারপাশের পরিবেশটাও কেমন যেন সেই গল্পের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার! রাজস্থানের আরাবল্লি পাহাড়ে আছে ঠিক এমনই এক পরিত্যক্ত নগরী, যেখানে সূর্য ডুবলে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। কাছেই ঘন জঙ্গল, পাহাড়ের মাথায় পুরনো দুর্গ আর শতাব্দীপ্রাচীন সব জনপদ। দিন চারেকের ছুটি জমিয়েই ঘুরে আসা যায় ভানগড় আর সরিস্কার পথ ধরে। যে পথ ধরেছিলাম আমরাও।
প্রথম দিন জয়পুর থেকে গাড়ি নিয়ে পৌঁছলাম আলওয়ারের কাছে দধিকর ফোর্ট-এ। ইচ্ছে করেই বেছে নিয়েছিলাম এই পুরনো আস্তানা। পাথরের দেওয়াল, নির্জন অলিন্দ আর খিলানের ছায়ায় যেন কত বছরের অন্ধকার থমকে আছে। মনে হয়, লৌকিক আর অলৌকিকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই কেল্লা যক্ষের মতো আগলে রেখেছে এমন কিছু গল্প, যা এখনও পুরোপুরি বলা হয়নি। মোটা পাথরের দেওয়াল, খিলানওয়ালা দরজা, এঁকেবেঁকে ওঠা সিঁড়ি। ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যায় রুক্ষ পাহাড়। সন্ধেয় উঠোনে বসে চা খেতে খেতে মনে হল, এই বাড়িতে ভূতের গল্প শোনার জন্য আলাদা কোনও আয়োজনের দরকার নেই। বাতাসে দরজাটা একটু নড়লেই যথেষ্ট!
পরদিন সকালে সোজা ভানগড়। এক সময়ে এখানে ছিল বাজার, রাজপ্রাসাদ, মন্দির। এককালের জমজমাট বাজারে এখন ভাঙা দোকানের সারি। কোথাও ঘাসের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে সিঁড়ি, কোথাও ছাদ উধাও হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু চার দেওয়াল। এমনই এক বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ভিতরে আলো পৌঁছয় না ভাল করে। আচমকা মনে হল, অন্ধকারের মধ্যে কেউ যেন আমাদেরই দেখছে। পিছনে পর্যটকদের হাসির শব্দ, মাথার উপরে পাখির ডাক। তবু কেন জানি গা ছমছম করে উঠল নিমেষে! লোককথায় রয়েছে ভানগড়ের রাজকন্যা রত্নাবতীকে ঘিরে এক তান্ত্রিকের গল্প। রাজকন্যাকে বশ করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় মৃত্যুর আগে নাকি গোটা নগরীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন তিনি। আর এক কাহিনিতে সাধক বালাউ নাথ। তাঁর আশ্রমে প্রাসাদের ছায়া পড়লে নগরীর সর্বনাশ হবে, এমনই ছিল সতর্কবার্তা। সত্যি-মিথ্যে যা-ই হোক, ভাঙা প্রাসাদের অন্ধকার ঘরে উঁকি দিতে গিয়ে যুক্তির চেয়ে কল্পনাই যেন মাথার দখল নেয়।
সে রাতেই দধিকরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। হোটেলের লোকজনকে বলে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল স্থানীয় এক গল্পকথককে। উঠোনে টিমটিমে আলো, সামনে গরম চায়ের কাপ। তিনি শুরু করলেন ভানগড়ের হারিয়ে যাওয়া বাসিন্দাদের গল্প। কখনও গভীর রাতে শোনা নূপুরের শব্দ, কখনও পরিত্যক্ত প্রাসাদের জানলায় দেখা অচেনা ছায়া। সবই লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি। কখনও ফিসফিসে স্বরে, কখনও আবার চরম মুহূর্তে আচমকা চুপ করে গিয়ে গল্পগুলোকে যেন চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলছিলেন তিনি। আসর ভাঙার পরে অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে ঘরে ফিরতে গিয়ে আমরা বোধহয় অকারণেই কয়েক বার পিছনে তাকিয়েছিলাম।
তৃতীয় দিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম সরিস্কার জঙ্গলে। ভোরের হিমেল হাওয়ায় খোলা জিপে বসে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। শুকনো পাতা মাড়িয়ে জিপ এগোচ্ছিল জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। দূর থেকে ভেসে আসছিল ময়ূরের ডাক। হঠাৎ পাশের ঝোপে কিছু একটা নড়ে উঠল না? আমরা সবাই চুপ করে সে দিকে তাকিয়ে। শেষ পর্যন্ত বাঘের দেখা মেলেনি বটে, তবে সরিস্কার সেই অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আর অজানা কিছুর অপেক্ষায় থাকার অনুভূতি মনে গেঁথে রইল। অনুমতি মিললে এগিয়ে দেখে আসা যায় পাহাড়ের মাথায় কনকওয়াড়ি দুর্গ। এখানেই বন্দি ছিলেন শাহজাহানের পুত্র দারা শিকোহ। ভূতের গল্প না থাকলেও নির্জন সেই দুর্গের ইতিহাসই যথেষ্ট অন্ধকারময়।
শেষ দিন আজবগড়। পাহাড়ঘেরা পুরনো জনপদ, ভাঙা দুর্গ, নির্জন পথ। ভানগড়ের অভিশাপের সঙ্গে আজবগড়কেও জুড়ে দেন স্থানীয় গল্পকথকেরা। ভাঙাচোরা পুরনো দেওয়ালে হাত রেখে সে দিন মনে হয়েছিল— কত মানুষের জীবন, কত গল্প হারিয়ে গিয়েছে এখানে। যার স্মৃতিটুকু লেগে আছে দেওয়ালের খাঁজে খোঁজে!
ফেরার পথে গাড়ির জানলা দিয়ে আরাবল্লির পাহাড়গুলো ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছিল। না, চার দিনের সেই সফরে ভূতের দেখা মেলেনি। তাতে অবশ্য ভালই হয়েছে। বরং সঙ্গে ফিরেছে গল্পকথকের বলা কাহিনি, ভানগড়ের হাঁ করা জানলা আর সরিস্কার অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যা মনে পড়লে আজও ফিরে ফিরে আসে শিরশিরে ভয়।
খরচ (কলকাতা থেকে দু’জন, ৪ দিন/৩ রাত):
বিমানে গেলে টিকিট, গাড়ি, দধিকর ফোর্ট-এ থাকা, খাওয়াদাওয়া ও সাফারি মিলিয়ে আনুমানিক ৭৫,০০০ টাকা। ট্রেনে গেলে টিকিটের শ্রেণি ও হোটেলের ভাড়া অনুযায়ী মোট খরচ আনুমানিক ৪০,০০০ টাকা।
গল্পকথকের ব্যবস্থা ও পারিশ্রমিক আলাদা করে নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।