অক্টোবরের শেষ রাত। ইংল্যান্ডের উত্তরে কুয়াশায় ঢাকা এক শতাব্দিপ্রাচীন দুর্গ। কোনও জানলায় আলো জ্বলছে না। পাথরের দেওয়াল বেয়ে নামছে কালি গোলা অন্ধকার। পাশে একটা দরজা আচমকা বিকট ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। অথচ ও দিকে তো কেউ যায়নি!
আজ, হ্যালোউইনের রাতে যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ নকল ভূত আর ভ্যাম্পায়ার সেজে উৎসবে মেতেছে, ইংল্যান্ডের এই প্রাচীন দুর্গে তখন রাতের অন্ধকারে জেগে উঠছে কয়েকশো বছরের পুরনো সব অবয়ব। কানে আসছে বন্ধ ঘরে শিশুর কান্না, ফাঁকা করিডরে পোশাকের খসখস, অন্ধকার সিঁড়িতে কারও পায়ের আওয়াজ। এখানকার আদ্যিকালের কিছু বাসিন্দা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও এই দুর্গ থেকে যে কখনওই বিদায় নেননি!
উত্তর ইংল্যান্ডের নর্দাম্বারল্যান্ড। স্কটল্যান্ডের সীমান্তের কাছাকাছি নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে চিলিংহ্যাম ক্যাসল। প্রায় আটশো বছরের পুরনো দুর্গ। পাথরের উঁচু দেওয়াল, ভারী কাঠের দরজা, সরু সিঁড়ি আর সেকেলে সব ঘর। দিনের আলোতেও বেশ গা ছমছমে। আর সন্ধের পরে? কুয়াশায় ঢাকলে দূর থেকে মনে হয়, অন্ধকারের গুহা থেকে যেন উঠে এসেছে বিশাল এক পাথুরে দানব। ব্রিটেনের সবচেয়ে ভূতুড়ে দুর্গগুলির অন্যতম চিলিংহ্যাম। এখানে শুধু ভূতের গল্প শোনানো হয় না। নিশুতি রাতে দর্শনার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয় ঘোস্ট ট্যুরে। শুধু ভূতের গল্প শুনে মন না ভরলে রয়েছে গভীর রাতের ঘোস্ট হান্ট। সেখানে ভূত খোঁজার দায়িত্ব কিন্তু আপনার নিজের!
ছবি: সংগৃহীত
ভাবুন, দুর্গের বিশাল দরজা পেরিয়ে আপনি ঢুকছেন। বাইরে হিমেল বাতাসে গাছের ডালপালায় শিরশির শব্দ। পাথরের মেঝেতে পা ফেললেই চার পাশ থেকে সেই শব্দ যেন ফিরে আসছে দ্বিগুণ জোরে। গাইডের টর্চের আলো কখনও পড়ছে পুরনো পেন্টিংয়ের গায়ে, কখনও বা অন্ধকার সিঁড়ির নীচে। কোথাও স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের গন্ধ, কোথাও পুরনো কাঠের ফাঁকে ইঁদুরের খসখস শব্দ। একটু পিছিয়ে পড়লেই মনে হচ্ছে, দলের বাকি সবাই বুঝি অনেক দূরে এগিয়ে গিয়েছে!
আরও পড়ুন:
দুর্গের অশরীরী বাসিন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত বোধহয় ব্লু বয়। শোনা যায়, গভীর রাতে একটি ঘর থেকে ভেসে আসত শিশুর কান্না। অথচ ঘরে কেউ নেই! কখনও আবার দেওয়ালে দেখা যেত নীলচে আলোর ঝলক। কে সেই ছেলে, কী হয়েছিল তার? কেউ জানে না। তবে তাকে ঘিরে গল্পের শেষ নেই। আরও আছেন লেডি মেরি বার্কলি। লোকে বলে, স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার দুঃখ নিয়ে তাঁর আত্মা নাকি এখনও ঘুরে বেড়ায় দুর্গের অলিন্দে। শোনা যায় তাঁর রেশমের পোশাকের খসখস শব্দ। অন্ধকার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এ সব শুনলে নিজের জামার খসখস শব্দেও বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠতেই পারে!
ছবি: সংগৃহীত
তার পরে আসে দুর্গের অন্ধকার কারাকক্ষ। পাথরের ঠান্ডা দেওয়াল আর নির্যাতনের ভয়ঙ্কর সব কলকব্জা। এই ঘরের দেওয়ালে কান পাতলে নাকি আজও ভেসে আসে বন্দিদের যন্ত্রণাভরা আর্তনাদ। মধ্যযুগে ইংল্যান্ড-স্কটল্যান্ড সীমান্তের
সংঘর্ষের সাক্ষী এই দুর্গ। ইতিহাসের সঙ্গে লোককথা এখানে এমন ভাবে মিশেছে যে, কোনটা সত্যি আর কোনটা পুরনো শ্যাওলার মতো জমে ওঠা গল্প, বোঝা মুশকিল।
গভীর রাতের ঘোস্ট হান্টে ভয়টা এসে ধরে আস্তে আস্তে। প্রথমে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। তার পরে শুরু হয় অপেক্ষা। চার দিকে নিস্তব্ধতা। আচমকা হয়তো একটা দরজা সজোরে খুলে গেল। কোথাও বা কাঠের মেঝে কেঁপে উঠল খটখট শব্দে। এ সবের স্বাভাবিক ব্যাখ্যা থাকতেই পারে। কিন্তু অন্ধকারে বসে সেটা মনে রাখা বেশ কঠিন!
শেষ রাতে দুর্গের ফটক পেরিয়ে বাইরে এলে খোলা হাওয়ায় বেশ স্বস্তি লাগে। দূরে গাছের কালো অবয়ব। মাথার উপরে তারাভরা আকাশ। পিছনে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দুর্গটা যেন মুচকি হাসছে। হাঁটতে হাঁটতে যদি হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দ শুনতে পান, ফিরে তাকাবেন?
কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে বিমানে এডিনবরা বা নিউকাসল। সেখান থেকে গাড়িতে চিলিংহ্যাম। ঘোস্ট ট্যুর ও গভীর রাতের তদন্তের জন্য আগে থেকে বুকিং জরুরি।
খরচ (কলকাতা থেকে দু’জনের): চার-পাঁচ দিনের সফরে বিমানভাড়া, থাকা, খাওয়া, গাড়ি ও ঘোস্ট ট্যুর মিলিয়ে আনুমানিক ৩ লক্ষ টাকা। হ্যালোউইনের বিশেষ অনুষ্ঠানে খরচ আরও বাড়তে পারে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।