“বাংলা ছবির ওপরে একটা ভাল গবেষণামূলক কাজ হওয়া দরকার।… আমার অথবা অন্য আর্টিস্টদের জীবনী বা স্টুডিয়ো রিপোর্ট লিখে কিছু হবে না, একটা স্থায়ী কিছু করো। সিনেমার, বিশেষ করে আমাদের এখানকার সিনেমার ওপরে রেডি রেফারেন্স কিছু নেই, এটা দুঃখের।” ১৯৭২ সালের শরতে চলচ্চিত্র-সাংবাদিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষকে কথাগুলো বলেছিলেন উত্তমকুমার। সেই কথা শিরোধার্য করেই বৃহদায়তন আকরগ্রন্থ সোনার দাগ: শতবর্ষের আলোয় বাংলা চলচ্চিত্র লেখায় হাত দিয়েছিলেন গৌরাঙ্গপ্রসাদ। ১৯৫৫ সাল অর্থাৎ পথের পাঁচালী ছবির মুক্তিবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত সেই গ্রন্থের প্রথম পর্ব; দ্বিতীয় পর্ব আজও অপ্রকাশিত। একুশ শতকের সিকিভাগ পার করেও বাংলা ছবির বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের অভাব এবং প্রয়োজনীয়তা আজও একই রকম সত্যি বলা চলে।
সেই গুরুদায়িত্ব মাথায় নিয়েই আর এক চলচ্চিত্র-সাংবাদিক অবনীনাথ ভট্টাচার্য বাংলা চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখায় হাত দিয়েছিলেন। নিজের তাগিদেই। বইয়ের ভূমিকায় তাঁর পুত্র অম্বরীশ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, সাত বছরের চেষ্টায় লেখা এই বই প্রকাশের তোড়জোড়ের সময়ে ক্য়ানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালে লেখক প্রয়াত হন। সম্প্রতি অম্বরীশই সেটি প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন।
আদিপর্ব (১৯১৭-১৯৩৪), মধ্যপর্ব (১৯৩৫-১৯৫০) ও আধুনিক পর্ব (১৯৫১ থেকে)— এই তিন ভাগে বইটিকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় বায়োস্কোপের পদার্পণ এবং হীরালাল সেনের চলচ্চিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ হয়ে ওঠার বিবরণী সত্ত্বেও হীরালালের মৃত্যুর বছরটিকে আদিপর্বের সূচনা হিসাবে চিহ্নিত করা হল কেন, তার ব্যাখ্যা অবশ্য দেওয়া হয়নি। একটা ব্যাখ্যা হতে পারত প্রথম বাংলা কাহিনিচিত্র সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র-এর মুক্তি। কিন্তু এখানে সেই নামটি অনুপস্থিত। তার বদলে রয়েছে নল দময়ন্তী ছবির নাম, যা বস্তুত ১৯২১ সালে মুক্তি পেয়েছিল। ভাগ্যচক্র (১৯৩৫) ছবিতে প্লেব্যাকের সূচনা এবং পঞ্চাশের দশকে ছিন্নমূল (১৯৫১) থেকে বাংলা ছবির নতুন উড়ানের সঙ্গে পর্ব ভাগের ধারণাটিকে অবশ্য মিলিয়ে নেওয়া যায়। এই শতকের গোড়ায় লেখা হলেও, যে কোনও কারণেই হোক, এই ইতিবৃত্ত ১৯৬০-এই সীমায়িত করেছেন লেখক।
গোটা রচনাটি যদিও সন-ওয়ারি যতিচিহ্ন অনুসরণ করে চলেছে, তবুও একে একেবারে স্থানকাল-চিহ্নিত ইতিহাসের বদলে অ-ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার ঢঙে আলগা পড়লেই বেশি ভাল লাগে। হয়তো তা বাঞ্ছনীয়ও বটে। কারণ খুঁটিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তথ্যনিষ্ঠার দাবি প্রবলতর হয়ে ওঠে, যা সব সময়ে পূরণ না-ও হতে পারে। গোড়ায় ‘লেখকের কথা’য় অবনীনাথ নিজেই বলেছেন, “ইতিহাস লিখতে গেলে যে সামান্য তথ্য লাগে তার অভাব সত্যিকারের ইতিহাস লেখকের পথে বাধা হয়ে আছে।” সেই সঙ্গে এ কথাও কবুল করছেন যে, “অনেক তথ্য অনুমাননির্ভর ও পরস্পরবিরোধী।”
বাংলা চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
অবনীনাথ ভট্টাচার্য
১২০০.০০
কারিগর
তবে ইতিহাসের ধরাবাঁধা গণ্ডির বাইরেও যাপিত আখ্যানের একটা বড় পরিসর থাকে। কোন অভিনেতা কবে কোন ছবিতে প্রথম মুখ দেখালেন, একটি ছবিতে সকলকে চমকে দিয়েও কে কোথায় হারিয়ে গেলেন, দারুণ প্রতিভা সত্ত্বেও বাজারে দর পেলেন না কোন শিল্পী— সে-সব বৃত্তান্ত স্বাভাবিক নিয়মেই সার দিয়ে এসেছে। সবচেয়ে ভাল লাগে বরং নানা ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ। যেমন রিক্তা (১৯৬০) ছবির পুনর্নির্মাণের পরে এক প্রৌঢ় দম্পতি এসে পরিচালক সুশীল মজুমদারকে জানান, মনোমালিন্যের জেরে বারো বছর তাঁদের মধ্যে বাক্যালাপ বন্ধ ছিল, এ ছবি দেখার পরে ফের মিলমিশ হয়ে গিয়েছে। পরিচালক নিজেই লেখককে বলেছিলেন সেই কথা। বা, পার্থপ্রতিম চৌধুরীর সুভা ও দেবতার গ্রাস (১৯৬৪) ছবির শুটিংয়ের অবসরে শর্মিলা ঠাকুর জানিয়েছিলেন, প্রতি বছর ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ তিনি মেঘদূত পড়েন। এই ধরনের কিছু উল্লেখ অবশ্য ষাটের বেড়া মানেনি।
তবে যে বই তার নামেই ‘ইতিহাস’ শব্দটি ধারণ করছে, তথ্যের প্রতি তার কিছু দায় তো থাকতেই হয়। কিছু সংখ্যক পাতার ফারাকে প্রথম বাঙালি চিত্রপ্রযোজক বা প্রথম কার্টুন-ছবির নাম পাল্টে গেলে পড়ার তাল কাটতে বাধ্য। যে রচনার মধ্যে কথকধর্মিতা রয়েছে, তাতে ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠা খোঁজা অবান্তর। কিন্তু তা বলে নানা আলগোছ মন্তব্যও নিষ্প্রয়োজন। বেশ কিছু উদাহরণের মধ্যে একটি হল বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৯) ছবিটিকে ‘অত্যন্ত সাধারণ মানের’ বলে দাগিয়ে দেওয়া, বা ‘কলকাতাকে দেখানোর মধ্যে আবেগ ছিল কিন্তু শিল্প ছিল না’ ইত্য়াকার মন্তব্য। অথচ এই ছবির মুক্তির দিনেই আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছিল, “কলকাতা শহরকে এত অন্তরঙ্গ ভাবে এর আগে পর্দায় সম্ভবত উপস্থিত করা হয়নি।” পরে চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক ধ্রুব গুপ্ত লেখেন, “কলকাতার রাস্তাঘাটের এমন জীবন্ত চেহারা… ঋত্বিকের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মের একটি বলে বিবেচিত হতে পারে।” (চিত্রভাষ, জুলাই-ডিসেম্বর ১৯৮৫) তবে দোষ একা অবনীনাথের নয়। বাংলার চলচ্চিত্র-মহলে এই ছবিটি সম্পর্কে নাক-সিঁটকানো মনোভাব বহু দিন পর্যন্ত ছিল।
বাংলা প্রকাশনায় সম্পাদক নামে অস্তিত্বটি কোনও কালেই ছিল না, আজও নেই। কিন্তু প্রয়াত লেখকের রচনা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পাদনা অতি জরুরি, যে-হেতু তা তিনি নিজে সেরে রেখে যেতে পারেননি। এই দায়িত্ব কিন্তু তাঁর পরিজনদের উপরে বর্তায় না, বরং যিনি কাঞ্চনমূল্যে তা বিপণনে উদ্যোগী হয়েছেন, দায় সেই প্রকাশকের। সেই দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে বললে কম বলা হয়।
আদিপর্বের শুরুতেই চলচ্চিত্র উদ্ভাবনের ইতিহাসের দুই স্তবকের মধ্যে আচমকা চলে আসে ‘সূত্রনির্দেশ’ নামে একটি তালিকা, যাতে ‘প্র: প্রযোজক’, ‘গঙ্গো— গঙ্গোপাধ্যায়’ ইত্যাদি শব্দ-সংক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে। তালিকাটি যে স্থানচ্যুত শুধু তা-ই নয়, গোটা বইয়ে এই ধরনের সংক্ষেপ কোথাও নেই। মূল রচনার আগে-পিছনে সঙ্কলিত তালিকাগুলিও (পরিশিষ্ট এক, দুই,, তিন বাদে) অসংলগ্ন। মনে হয়, লেখক প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন, ছাপাছাপির পর্বে ঘষামাজা করবেন সেটা মাথায় রেখেই। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই শ্রম আর কেউ স্বীকার করেনি।
ছাপার আগে সম্পাদনা ছাড়া আর একটা বড় কাজ যত্ন করে প্রুফ দেখা। এই বাজারে বহু প্রকাশক সেই কাজটি অসহায় লেখককে দিয়েই করিয়ে নেন। অনাথ এই বইটি সেই কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে মুদ্রণপ্রমাদ পাতায়-পাতায় থরে-বিথরে ছড়ানো। এমনকি দেড় পাতার ক্ষুদ্র ভূমিকায় প্রকাশকের নামটিও দু’বার দু’রকম বানানে লেখা। প্রকৃত বানানটি জানার বাসনা রইল।
সোমেশ ভট্টাচার্য