আজকের সমাজমাধ্যম-লাঞ্ছিত সময়ে কোনও বিখ্যাত বা নাতিবিখ্যাত মানুষের প্রয়াণের পর পরই তাঁর স্মরণলেখ-র ঢল নামে। এবং কী আশ্চর্য, দশটির মধ্যে ন’টি লেখাতেই লেখক আসলে সদ্যপ্রয়াতের স্মৃতির অছিলায় বলে চলেন নিজের কথা, অবিরল। আমরাও ক্রমে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। সেই অভ্যাসের মধ্যে রুশতী সেনের বইটি এক নির্ভুল ব্যতিক্রম। সত্যজিৎ রায় থেকে শঙ্ঘ ঘোষ, মণীন্দ্র গুপ্ত-দেবারতি মিত্র থেকে শাঁওলী মিত্রের মতো খ্যাতিমান বাঙালির কথা, অথবা তাঁর স্কুলের প্রথম ক্লাস টিচার মিস হালদারের কথা— যাঁরই স্মৃতিচারণ করুন রুশতী, নিজেকে আশ্চর্য ভাবে প্রচ্ছন্ন রেখেছেন প্রতিটি লেখায়। নিজের কথা যতটুকু উল্লেখ করেছেন, তাও অতি বিনীত ভঙ্গিতে, তৃণাদপি তুচ্ছ হিসাবে দেখিয়ে। সুখপাঠ্য গদ্যে রচিত এই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, অতিপরিচিত কিছু মানুষের সঙ্গেও পাঠককে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় কিছু আপাত-সামান্য, টুকরো অভিজ্ঞতার আলোয়।
রুশতীর পিতা ছিলেন অর্থশাস্ত্রের অধ্যাপক, বারোমাস পত্রিকার সম্পাদক অশোক সেন। বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির জগতে তাঁর পরিচিতি ছিল বিপুল। রুশতী নিজেই জানিয়েছেন, এই বইয়ে যাঁদের কথা আছে তাঁরা অনেকেই তাঁকে প্রথম চিনেছিলেন ‘অশোকবাবুর কন্যা’ হিসাবে— শৈশবেই। তবে, কবিতা সিংহের কথাও বলেছেন রুশতী, যিনি তাঁর মা-বাবার বিশেষ পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও সেই পরিচয়ে চেনেননি লেখিকাকে। যখন জানতে পারলেন সেই পরিচয়, ভারী অবাক হলেন: “কবিতাদি যে আমার লেখা পড়ে, আর কোনো পরিচয় না-জেনেই আমায় ডেকেছেন, এতে আমার বেজায় খুশি লাগল।”
তিস্তাপারের বৃত্তান্ত পড়ে মুগ্ধ লেখিকা ‘পাত্রাপাত্র নির্বিচারে’ সবাইকে উপহার দিচ্ছেন সে বই, সে খবর জেনে দেবেশ রায় তাঁকে গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, “রুশু, তুমি নাকি এখন মুখেভাতেও তিস্তাপার উপহার দিচ্ছ? এ রকম করে না, ছিঃ!” এই দেবেশ রায় কি সাধারণ পাঠকের চেনা? অথবা, এই দেবারতি মিত্র, যিনি আকাশবাণী-তে একটা সামান্য কথোপকথন অনুষ্ঠানের জন্যও আগে থেকে নোট তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে বলার সময় গুলিয়ে না যায়! সে আলোচনার বিষয় ছিল ‘রবীন্দ্র সৃজনে নারী’। দেবারতির রবীন্দ্রপাঠ সম্বন্ধে যাঁদের ধারণা আছে, তাঁরাই জানবেন, নিজের কাজের প্রতি কতখানি নিষ্ঠা থাকলে সেই গভীর প্রজ্ঞা সত্ত্বেও এমন ভাবে তৈরি হওয়া যায়। শঙ্খ ঘোষ রুশতীকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর কলকাতার প্রথম ঠিকানা, কলাবাগান বস্তির রেলওয়ে কোয়ার্টার্স— যে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েই শঙ্খ ঘোষের কাছে এসেছিল ‘যমুনাবতী’ কবিতার মুহূর্ত।
পুরোটাই ব্যক্তিগত
রুশতী সেন
২৫০.০০
সেরিবান
অনেক পাঠকের কাছেই স্মৃতিকথা পড়ার একটা বিশেষ আকর্ষণ, সেই মানুষটির সূত্রে অতীতের কিছু সময়কে স্পর্শ করতে পারা। প্রতিক্ষণ-এর আড্ডা থেকে শঙ্খ ঘোষের বসার ঘর, এমন অনেক প্রসঙ্গই এসেছে এই লেখায়, যা আশি-নব্বইয়ের দশকের শিক্ষিত বাঙালির খুব চেনা। তার চেয়েও বড় কথা, যে মানুষগুলির প্রসঙ্গ এসেছে লেখায়, তাঁরা যেন সশরীরে ধারণ করে আছেন একটা গোটা সময়পর্ব— বাঙালি মেধার ঔজ্জ্বল্যের সময়কাল, যখন নিজেকে প্রকাশ করার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল অপরকে জানা, বোঝা।
সত্যজিৎ রায়ের অভিনেতা বললে প্রথম যে তিনটি নাম মনে পড়বে, সন্তোষ দত্ত নিঃসংশয়ে সেই তালিকায় থাকবেন। কিন্তু, সন্তোষ দত্ত মানেই কি শুধু জটায়ু? বা বড় জোর শুন্ডি-হাল্লার রাজা, হীরকরাজ্যের বিজ্ঞানী, অথবা প্রফেসর ননী? এই সঙ্কলন সন্তোষ দত্তকে বাঙালি পাঠকের সামনে বহুরূপে উপস্থিত করেছে— সত্যজিতের অভিনেতা বাদেও বাংলা ছবিতে অন্যান্য ভূমিকায়, নাটকে এবং অতি অবশ্যই আইনজীবী হিসাবে। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে এখনও অবধি সবচেয়ে সম্পূর্ণ পাঠ।
জটায়ু ১০০ পেরিয়ে
সম্পা: ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায়
৪৯৯.০০
দে’জ
বাংলা বইয়ের দুনিয়ায় সম্পাদনার নামে গড়পড়তা ক্ষেত্রে যা হয়, তা সঙ্কলন। এই ক্ষেত্রে সম্পাদক ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যতিক্রমী। গ্রন্থের ‘পূর্বভাষ’টি সুলিখিত, বিশ্লেষণাত্মক ও তথ্যসমৃদ্ধ। তার আড়াই পাতা দীর্ঘ তথ্যসূত্রটির কথা বিশেষ উল্লেখ্য, কারণ বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে এই পরিশ্রমটি কম লোকই করেন। বইটি বিভক্ত দু’টি পর্যায়ে: বিশ্লেষণ ও স্মৃতি; সঙ্গে দু’টি পরিশিষ্টে সন্তোষ দত্তের নিজের লেখা ও সাক্ষাৎকার, তাঁকে নিয়ে অন্যদের সাক্ষাৎকার।
বিশ্লেষণ অংশে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রবন্ধ ও সায়নদেব চৌধুরীর লেখা সন্তোষ দত্তকে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির স্তর অতিক্রম করে অভিনয়ের ‘ক্র্যাফ্ট’-এর বিশ্লেষণে নিয়ে গিয়েছে। ব্রজবুলি ছবি সম্বন্ধে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “লোককে হাসাও কিন্তু নিজেকে হাস্যকর করে তুলো না... [সন্তোষ দত্ত] এই ছবিতে একটি ট্রাপিজের দড়ির উপর দিয়ে হেঁটেছেন। তিনি হাসিয়েছেন। কিন্তু সীমানা অতিক্রম করেননি।” এই অংশে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, শোভন তরফদার, কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের লেখাও উল্লেখযোগ্য। স্মৃতি অংশে আইনজীবী অশোক বক্সীর রচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন সন্তোষ দত্তের জুনিয়র আইনজীবী, বাস্তবে প্রায় সর্বসময়ের সঙ্গী। কী ভাবে আদালতে আইনজীবীর গম্ভীর সত্তা থেকে সিনেমার সেটে ঝলমলে কমেডিতে পৌঁছে যেতেন অভিনেতা, তাঁর পারিবারিক জীবনই বা কেমন ছিল, সে বিষয়ে অজানা বা অল্প জানা কথা উঠে আসে তাঁর লেখায়। নীতা শীলের লেখাটি মনোগ্রাহী; ‘তোপসে’ সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় ব্যক্তি সন্তোষ দত্তের স্নেহময় রূপ স্পষ্ট। সন্দীপ রায়ের ছোট লেখাটিও উল্লেখযোগ্য।