E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নদী-অর্থনীতির ইতিহাস ভূগোল

ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তারের ভিত্তিভূমি ছিল বাংলা। বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উত্থানে তাই ঔপনিবেশিক যুগ জনমানসে এক যুগসন্ধিক্ষণ, তথাকথিত ‘বাংলার নবজাগরণ’ রয়েছে যার কেন্দ্রে।

কণাদ সিংহ

শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪১

বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে বই কম লেখা হয়নি। আবার গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার তৈরি পৃথিবীর বৃহত্তম বাংলা ব-দ্বীপের ভৌগোলিক বিবর্তন ও নদীর গতিপথের পরিবর্তন নিয়েও লেখালিখি হয়েছে। কিন্তু ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত রাধাকমল মুখোপাধ্যায়ের একটিমাত্র বই ছাড়া বাংলার নদী-অর্থনীতির ইতিহাস ও ভূগোলের বিশ্লেষণমূলক কাজ বিশেষ হয়নি। কল্যাণ রুদ্র সেই অভাব পূরণ করেছেন তাঁর নতুন বইটিতে। সাতটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত এই বইয়ে লেখক তুলে ধরেছেন বাংলার নদী-অর্থনীতির ইতিহাসের বি-ঔপনিবেশিকীকরণের প্রয়োজনীয়তাও।

ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তারের ভিত্তিভূমি ছিল বাংলা। বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উত্থানে তাই ঔপনিবেশিক যুগ জনমানসে এক যুগসন্ধিক্ষণ, তথাকথিত ‘বাংলার নবজাগরণ’ রয়েছে যার কেন্দ্রে। বাংলা যে এক নবীন ভূখণ্ড যা গড়ে উঠেছে মাত্র গত চার-পাঁচ হাজার বছরে এবং কলকাতা-সহ বাংলার সমৃদ্ধ বসতিগুলি গড়ে উঠেছে হাল আমলে ইউরোপীয়দের হাতে— এই ভ্রান্ত ধারণার উৎস ঔপনিবেশিক আমলে জেমস ফার্গুসনের লেখায়। যদিও বাংলা ব-দ্বীপ পৃথিবীর নবীনতম ভূখণ্ডগুলির একটি, কিন্তু অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে বাংলায় নানা জনপদের ঐতিহাসিক নিদর্শন মিলেছে। বঙ্গোপসাগরের অগভীর অংশ থেকে ধীরে ধীরে এই ব-দ্বীপ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু অন্তত ৭৫০০ বছর আগে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের বয়ে আনা পলি জমে বাংলার উপকূল গঠনের কাজ এখনও চলছে। বইয়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদে বাংলার ভূ-প্রকৃতি ও নদীর গতিপথের পরিবর্তনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন লেখক— যে বিষয়ে তাঁর প্রজ্ঞা প্রশ্নাতীত। বাংলার ভৌগোলিক আত্মপ্রকাশের যে স্বরূপ এই পরিচ্ছেদে ধরা পড়ে, তার নিরিখেই বাকি বইটির প্রতিপাদ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চতুর্থ ও পঞ্চম পরিচ্ছেদ দু’টি দেখায় যে, প্রাক্-ঔপনিবেশিক বাংলা চিহ্নিত ছিল তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যই। রাজনৈতিক ভাবে হয়তো বাংলা কোনও বড় সাম্রাজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি— গ্রিক-রোমান বিবরণের ‘গঙ্গারিডি’ সম্ভবত প্রাচ্য (মগধ) সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি জনগোষ্ঠীর নাম, কোনও পৃথক সাম্রাজ্য নয়। কিন্তু নদীমাতৃক বাংলা নৌযান নির্মাণ ও নৌচালনায় পারদর্শিতা দেখিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে বিভিন্ন উপাদানে উঠে আসে তাম্রলিপ্ত ও গঙ্গা বন্দর দু’টির সমৃদ্ধির কথা। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে তাম্রলিপ্ত থেকে সিংহল যাত্রা করেছিলেন চিনা ভিক্ষু ফাশিয়ান (ফা-হিয়েন)। তেমনই মধ্যযুগের মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল-পরম্পরায় আমরা পাই চাঁদ সওদাগর, ধনপতি, ও শ্রীপতির সিংহল যাত্রা, এবং তাতে ব্যবহৃত নানা রকম নৌযান নির্মাণের বিবরণ। পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতকে লিখিত এই মঙ্গলকাব্যগুলিতে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে গেছে, তথ্যগত ভ্রান্তিও প্রচুর। একাদশ-দ্বাদশ শতকের সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র সমুদ্রযাত্রায় আপত্তি জানায়। মঙ্গলকাব্যের বণিকদের বিবরণ হয়তো মৌখিক পরম্পরায় সঞ্চিত অষ্টম শতকের সমুদ্রবাণিজ্যের স্মৃতি, এই সম্ভাবনার কথা লেখক বলেছেন। কিন্তু পাশাপাশি অগণিত বিদেশি পর্যটকের দেওয়া বিবরণ থেকে যে ছবি তিনি তুলে ধরেছেন তাতে মঙ্গলকাব্যের নৌবাণিজ্য তৎকালীন বাস্তব থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় না।

বাংলার সমৃদ্ধির স্রোতোধারা ও ঔপনিবেশিক অবক্ষয়

কল্যাণ রুদ্র

১২০০.০০

সাহিত্য সংসদ

পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে নিকালো কন্তি বাংলায় প্রায় ৩০০ পোতাশ্রয় দেখেছেন; ভারথেমা বলেছেন, প্রতি বছর বাংলা থেকে অন্তত ৫০টি জাহাজ-ভর্তি সুতি ও রেশমবস্ত্র পশ্চিম এশিয়া পাড়ি দিত; মানরিক লিখেছেন, ৩৬ জন মাঝিবিশিষ্ট বাংলার দ্রুতগামী নৌকা ‘জেলিয়া’-র কথা। সেন আমলের রক্ষণশীলতা যে বাঙালি সমাজে বিশেষ প্রভাব ফেলেনি তার প্রমাণ মেলে মানরিকের বিবরণে, যিনি বাঙালিদের প্রায় ‘ধর্মহীন’ জনগোষ্ঠী ভেবেছিলেন! বাংলার সমৃদ্ধিই— যা মোগলদের চোখে বাংলাকে করে তুলেছিল ‘স্বর্গরাজ্য’— আকৃষ্ট করেছিল পর্তুগিজ়, ফরাসি, ওলন্দাজ বা ইংরেজ বণিকদের। এই বিপুল কৃষিসম্পদ ও বাণিজ্যের উৎস বাংলার ভূগোলে। এখনও গড়ে উঠতে থাকা নদীমাতৃক বাংলা ব-দ্বীপে বিভিন্ন নদীর বন্যা বয়ে আনত নতুন পলি— যা জমিকে দিত অতুলনীয় উর্বরতা।

বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত করা ঔপনিবেশিক শাসন বাংলার সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করেনি, বরং এনেছে অর্থনৈতিক অবক্ষয়, যার ফলে একদা পৃথিবীর সমৃদ্ধতম ভূখণ্ডে সাতটি দুর্ভিক্ষ হয়েছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কৃষকের হাত থেকে জমির মালিকানা তুলে দিয়েছে জমিদারের হাতে। জমিদারদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাজনা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা যে কোনও উপায়ে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর খোঁজ করতে বাধ্য করেছে তাঁদের। ফলে একের পর এক নদীতে বাঁধ দেওয়া প্লাবনভূমিতে স্বাভাবিক পলি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। যে দামোদরের বন্যা বর্ধমানকে করে তুলত পৃথিবীর অন্যতম উর্বর অঞ্চল, তাকে ঔপনিবেশিক পাঠ্যবইয়ের অন্ধ অনুকরণ দাগিয়ে দিয়েছে ‘বাংলার দুঃখ’ হিসাবে। রেলপথ-সড়কপথের অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্যার জলের দ্রুত স্বাভাবিক নেমে যাওয়ার পথ বন্ধ করেছে। দীর্ঘ দিন জমা জল নিয়ে এসেছে মশাবাহিত মহামারি। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী ‘আধুনিকতা’-র পরিবেশ-ধ্বংসকারী কার্যকলাপ ঔপনিবেশিক শাসকের হাত ধরে এসেছে বাংলাতেও। সুন্দরবনের বিপুল ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে বাংলা এখন নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত। চা, নীল, পাটের মতো অর্থকরী ফসলের চাষে ঔপনিবেশিক উদ্যোগের অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও অনেক সময়ই (যেমন নীলচাষের ক্ষেত্রে) তা হয়ে উঠেছে শোষণের হাতিয়ার।

বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসে প্রাক্-ঔপনিবেশিক সমৃদ্ধি আর ঔপনিবেশিক অবক্ষয়ের বিষয়টি তুলে ধরায় উদ্যোগী হলেও লেখক ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার অবদান সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট নন। বরং বাংলার মানচিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ জেমস রেনেলের ছ’টি জরিপ অভিযানের বিবরণ, সঙ্গে জড়িত আটটি ম্যাপ, এবং দ্য এনভিল, থর্টন, জাও দ্য ব্যারোস ও ভন লিনেনের মতো ইউরোপীয়দের আঁকা মানচিত্র-সহ মোট ৩০টি ম্যাপ বইয়ের প্রাপ্তি। পরিশিষ্টে রয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের অঙ্কন-শিক্ষক কোলসওয়ার্দি গ্রান্টের আঁকা ঔপনিবেশিক বাংলার ছবি।

এ রকম একটি জরুরি বইতে অজস্র ছাপার ভুল পাঠ-অভিজ্ঞতায় বার বার ছন্দপতন ঘটায়, অনেক সময় ঘটায় অর্থবিকৃতিও— যেমন ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনালগ্ন হিসাবে ১৭৫৭-কে ১৯৫৭ ছাপা, বা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যকে দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য বলে উল্লেখ। কোথাও কোথাও পুরনো উপাদানের উপর নির্ভর করে দেওয়া ঐতিহাসিক তথ্য পুনর্বিবেচনার অবকাশ আছে। যেমন, ১৮৮৫-তে লেখা বার্নেলের বিবরণের ভিত্তিতে লেখক বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে নালন্দা ধ্বংসের কথা লিখেছেন— যদিও এখন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সুপ্রতিষ্ঠিত যে, বখতিয়ার খিলজির কয়েক শতাব্দী পরেও নালন্দা টিকে ছিল, বখতিয়ারের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বৌদ্ধ বিহার সম্ভবত বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী। দীপবংশ ও মহাবংশ অনুসারে যে বিজয়সিংহ সিংহলে রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন, তাঁর আদি বাসস্থান রাঢ় না গুজরাতের লাট না কি দক্ষিণ ভারত, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

ঔপনিবেশিক আমলে অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের বিশ্লেষণে দাদাভাই নৌরজি, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, রমেশচন্দ্র দত্তের মতো ইতিহাসবিদরা সম্পদের নির্গমন, অবশিল্পায়ন প্রভৃতি যে ধারণাগুলি তুলে ধরেছিলেন, এবং সে বিষয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসবিদদের যে নানান অবস্থান— তা বইটিতে প্রায় অনুচ্চারিত। অল্প পরিসরে বাংলার দীর্ঘ ইতিহাসের বিশ্লেষণী ধারাবিবরণী সাধারণ পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া এই বইয়ে ঐতিহাসিক বিতর্কগুলির সম্পর্কেও দু’-চার কথা থাকলে পাঠক আরও উপকৃত হতেন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
book review Review Colonial History River

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy