E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

জীবন থেকে আসা আলো

এ শুধুই ‘কেমন আছি’ নয়, তুমুল সংঘাতের ইতিবৃত্ত। যেন পিঠের চাবুকের শুকনো দাগ। এ বই অন্য অনেক বইয়ের থেকে আলাদা।

যশোধরা রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:০৮
গৃহান্তরালে: রন্ধনরতা নারী। সহজ পাঠ-এ নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি।

গৃহান্তরালে: রন্ধনরতা নারী। সহজ পাঠ-এ নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি।

কাকে বলে লড়াকু মেয়ে? যে গড়ে নেয় নিজের ভাগ্য, নিজের জীবন? যার লড়াইয়ের সঙ্গে অন্য মেয়ে আত্মীয়তা বোধ করবে? বারোটি আত্মকথামূলক গদ্যের বইয়ের পৃষ্ঠপ্রচ্ছদের লেখা বলছে, “কোনো একটি কথকতাও শুধুমাত্র সেই কথকের নিজের কথা নয়, আর পাঁচজনের কথা ঘরে-বাইরের দাবি-দাওয়া, কর্মজগতের আনুকূল্য-প্রতিকূলতা, সম্পর্কের সুর-বেসুর, অনেক সঙ্গের ভিতরেও নিঃসঙ্গতার অভিযান।” রুশতী সেন জানতে চান, “কেমন আছি আমরা।”

এ শুধুই ‘কেমন আছি’ নয়, তুমুল সংঘাতের ইতিবৃত্ত। যেন পিঠের চাবুকের শুকনো দাগ। এ বই অন্য অনেক বইয়ের থেকে আলাদা। কাহিনি বা ফিকশনের তুলনায় অনেক বেশি ঘনত্ব, তীব্রতা এ গদ্যে। অতি নৈকট্য থেকে, আনুবীক্ষণিক ভাবে জীবন দেখা গদ্য। প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের সাফল্যের পর তৃতীয় খণ্ড আরও উচ্চতায় গেছে, লেখক-তালিকার বৈচিত্রে। সমাজের যে অংশকে নিয়ে ইতিহাস অনেকাংশে নীরব, একদা যে অংশের মুখে প্রায়শই ভাষা থাকত না। এখনও মেয়েরা মুখ খুললে, তাদের ‘অপভাষা’ প্রয়োগ নিয়ে কটুকাটব্য চলে।

রুশতী সেনের লেখক খুঁজে আনার প্রক্রিয়াটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই বইয়ে লিখেছেন যথাক্রমে শিবানী রায়চৌধুরী, টুটুল চক্রবর্তী, মৈত্রী রায় মৌলিক, ভাস্বতী চক্রবর্তী, গায়ত্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণিমা চৌধুরী, সীমা মুখোপাধ্যায়, সোমা বিশ্বাস, অসীমা চক্রবর্তী, অদিতি বাগচি, তাপসী দোলুই, স্বপ্না ত্রিপাঠী। এঁদের পেশাগত পরিচয়ের বৈচিত্র দেখলে তাক লেগে যাবে। বিদেশে শিক্ষা বিভাগের সরকারি স্কুলপরিদর্শক, চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, চিত্রকর, নাটককার ও নাট্য-অভিনেতা, শিক্ষক, অধ্যাপক, গৃহবধূ, সমাজকর্মী। মৎস্যজীবীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা তাপসী দোলুই আজ লড়াকু নেত্রী। লিখেছেন নিজের অল্পবয়সের স্মৃতি, স্বেচ্ছায় পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করা, দারিদ্র, শ্বশুরঘরের বঞ্চনা, যেখানে বৌমার খাদ্যে টান পড়ে ছেলে উপার্জন কম করে বলে। নিজে মাছ ধরে সংসারকে স্থাপনা দেওয়ার অত্যাশ্চর্য কাহিনি। পুকুরে মাছের চারা ফেলে মাছ করে সেই উপার্জনে সংসার চালিয়ে টাকা জমিয়ে, সোনাদানা কিনে, পরে সেই সোনা বিক্রি করে ছেলের জন্য নৌকা ও জাল কিনে দেওয়ার গল্প। ক্রমশ ব্যক্তির সংগ্রাম থেকে সমাজের পাঁচজনার হয়ে সংগ্রামে চলে যাওয়া। যেন নতুন ব্রতকথা, ঘরে ঘরে পাঠের যোগ্য।

স্বপ্না ত্রিপাঠীর লেখাও তাই। স্বল্পবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা, শিক্ষার লড়াই, বাবা-মায়ের অমতে অব্রাহ্মণকে বিবাহের লড়াই। সমাজকর্মী হিসেবে লড়াই। তাঁর সামাজিক সক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গ্রামীণ ক্ষমাহীন কুচক্রীরা বাবার পুকুরে বিষ ঢেলে সব মাছ মেরে ফেলে। মেয়েকে রোধ করতে, মা নিজে মেয়েকে মেরেধরে ঘরে বন্দি করেন। আবেগহীন নির্লিপ্ততায় বলেছেন একশো দিনের কাজ প্রকল্পে মেয়েদের কাজকে অন্তর্ভুক্ত করার লড়াই, জব কার্ড করিয়ে তাদের ক্ষমতায়নের কাহিনি। “মেয়েদের শাড়ি সায়া কাদায় লটকে যাচ্ছে। মাথায় মাটির ঝুড়ি নিয়ে পাঁকের মধ্যে পা তুলতে, শাড়ি সায়া সামলাতে, বুকের কাপড় ঠিক রাখতে মেয়েরা হিমশিম খাচ্ছে। এই প্রথম মেয়েদের নদীর চরে মাটি কাটা-দেখবার জন্য মেলার মতো লোক জুটে যায়। কত টিপ্পনী আর কী নোংরা ভাষা!” “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৬২ সি.এফ.টি. মাটি কাটতে পারল না মেয়েরা।... একশো ষাট টাকা মজুরি হলো না। খুব কষ্ট হলো মেয়েদের। অনেকের স্বামী বাড়িতে মারধর করল এই কাজের জন্য। অনেকে কিন্তু জোর গলায় বলল, ‘আজ পারিনি, কাল, কাল ৬২ সি.এফ.টি. কাটবই।’”

মেয়েদের কথা মায়েদের কথা ৩

সম্পা: রুশতী সেন

৪৬০.০০

অক্ষর প্রকাশনী

যে ভাষাকে ধারণ করল বইটি, সে জন্য কুর্নিশ। ভদ্র মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমের গন্ধমাখা বাংলা গদ্যকে ‘মান্য গদ্য’ বলতে শিখে আমরা ভুলেছি প্রকৃত লড়াকু মেয়েদের খোঁজ নিতে। পুষ্টিবর্ধক পানীয়ের বিজ্ঞাপনের ঘামতেল-মুখের লড়াকুদের বানানো অবয়ব ভেঙেচুরে বেরিয়ে পড়েছেন এই বইয়ের সত্যিকার লড়াকু মেয়েরা। এখানে আকরিক ধাতুর কঠিন বিগলিত সত্তা উঁকি দেয় আপাত-শুষ্ক লেখায়। প্রামাণ্য ব্যক্তিগত ইতিহাস থেকে নতুন করে ইতিহাসকে দেখে নিতে পারি।

মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের একাধিক রচনায় রয়েছে ষাট-সত্তরের দশকের তুল্যমূল্য বিবরণ। ভাড়াবাড়ি, বাঙালদের পাড়া, যুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন। আর মেয়েদের সারি। মায়েদের সঙ্গে অন্য মেয়েরা। অবিবাহিতা বা স্বামীপরিত্যক্তা পিসিমারা। ভূবিজ্ঞানী মৈত্রী রায় মৌলিক বিস্তারে লেখেন তাঁর জীবন গড়ে দেওয়া শয্যাশায়ী ঠাকুমার কথা। ছোঁয়া যায় এই ‘আম্মা’কে। চক্ষুবিশেষজ্ঞ টুটুল চক্রবর্তী বলেন ‘ডোনেশনবিহীন, বিনা-বেতনের, অজ্ঞাতকুলশীল, পাতি বাংলা মিডিয়াম’ বাঙাল মাঠ ইস্কুলে পড়ার গল্প। নানা ইশকুল এসেছে বইয়ে। বার বার এসেছে লাইব্রেরি-ঘরের বইয়ের গন্ধ। শিল্পী অরুণিমা চৌধুরী থেমে যাওয়া গান-ছবি ফিরিয়ে আনার লড়াইদীর্ণ পথ লেখেন, আর ছবির মতো করে লেখেন শিলিগুড়ির মড়া-কাটা ঘরে তার ইশকুলের চেনা মেয়ের লাশ কাটার গল্প, “চেরা হবে মাথা থেকে তলপেট অবধি। ফেঁড়ে দেখা হবে কী কারণে ওকে মরতে হয়েছে।... বীণার পাকস্থলীতে পাওয়া গেছে সবুজ কলকে ফুলের বীজের মণ্ড। তারও নীচে বাঁ দিকের তলপেটের থলিতে মানুষের বাচ্চা। বেশ বড়সড়, মানুষের মতোই আকার হয়ে উঠেছিল তার।”

শিবানী রায়চৌধুরী লেখেন দ্রুত বিবাহ দিতে বদ্ধপরিকর বাবার সঙ্গে লড়াই করে বিদেশে যাওয়া ও স্বোপার্জিত ‘শ্রমিক জীবন’ নিয়ে। লেখাপড়ার ফাঁকে অস্থায়ী চাকরি নানান— চকলেট ফ্যাক্টরিতে বাক্স প্যাক করা। ঢালাই কারখানায় ফার্নেসে কয়লা ঠেলতে গিয়ে পোশাকে আগুন ধরে যাওয়া। বাঙালি তরুণী, আপাত-সুরক্ষিত ষাট দশকের বইমুখো জীবন থেকে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিতির জীবনে। বইয়ের প্রায় প্রতি লেখার শেষেই আছে ঘুরে দাঁড়ানোর, সাফল্যের, নিজের স্বপ্নকে হাসিল করার একটা করে গল্প। সীমা মুখোপাধ্যায়ের যেমন নাটকের কাছে ফেরা। মেয়েদের জৈব ঘড়ির বিপরীতে হাঁটা। বিবাহ-সন্তানের হার্ডল রেসের বিরুদ্ধে নিজের প্যাশনের আর্তি। উল্লেখ্য, এই বইয়ে আছে এক জন গৃহবধূর লেখা-ও। অসীমা চক্রবর্তী সংসারপাকের লড়াইয়ের কথা বিবৃত করেন অকপটে। স-সীম বন্ধনে, এও আর এক লড়াই, আর এক জয়। কন্যার প্রজন্ম জীবন উপভোগ করতে পারে আজ। তার তারিফ তিনি করেন অপূর্ব ঔদার্যে। এই বই নিশ্চিত ভাবেই অনেক মেয়েকে সামনে এগোনোর ইন্ধন দেবে। বানানো কথা আর সাজানো বাক্যে যাদের ক্লান্তি এসেছে, সেই পাঠকের প্রিয় হবে জীবন থেকে চুইয়ে আসা আলো।

যশোধরা রায়চৌধুরী

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Review book review

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy