E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

শত্রুরূপে চিহ্নিত বই

এ রাজ্যে সরকার বদলের পরে পরাজিত বিরোধীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখলের ঘটনা আকছার ঘটে। এ বারও নতুন দল আসার পরে পাড়ার ক্লাব, পুজো কমিটি, পার্টি অফিস, রিকশা বা অটো স্ট্যান্ড দখল হয়েছে, এখনও তার পালা চলছে।

রঞ্জিত শূর

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫০
বই-দাবি: বই হাতে রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ মানুষের প্রতিবাদ, আরামবাগ, ১৯ অক্টোবর।

বই-দাবি: বই হাতে রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ মানুষের প্রতিবাদ, আরামবাগ, ১৯ অক্টোবর।

ভুখা মানুষ ধর বই, ওটা হাতিয়ার”— বিখ্যাত জার্মান কবি ও নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখটের এই ডাক সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা থাকত। বহু বছর পর আবার এই কথাটি উঠে এল কলকাতার রাস্তায়— এ বার সচল হয়ে। পুজোর সময় বইয়ের স্টল ভেঙেছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী, তার বিরুদ্ধে বেরিয়েছিল নাগরিক মিছিল, ১৮ অক্টোবর, যাদবপুরে। সেখানে পোস্টারে, স্লোগানে, ফের দেখা গেল এই কথাটি। দলমত-নির্বিশেষে বহু মানুষ হাঁটলেন সেই মিছিলে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিনোদনের বিষয় থেকে বই ফের সর্বসমক্ষে উঠে এল রাজনীতির বিষয় হয়ে।

এ রাজ্যে সরকার বদলের পরে পরাজিত বিরোধীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখলের ঘটনা আকছার ঘটে। এ বারও নতুন দল আসার পরে পাড়ার ক্লাব, পুজো কমিটি, পার্টি অফিস, রিকশা বা অটো স্ট্যান্ড দখল হয়েছে, এখনও তার পালা চলছে। ত্রিপুরায় ক্ষমতা বদলের (২০১৮) কয়েক দিনের মধ্যে লেনিনের দু’টি মূর্তি ভাঙা হয়েছিল, তার পর থেকে মূর্তি ভাঙাও প্রায় ‘স্বাভাবিক’ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বইয়ের স্টলে ভাঙচুর গোটা পশ্চিমবঙ্গকে নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। দুর্গা পুজোর সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের বুক স্টল ভেঙে দেওয়া, বুক স্টল করতে না দেওয়া, বেছে বেছে বাম মতাদর্শের বই তুলে ছুড়ে ফেলা, ছিঁড়ে ফেলা, পুকুরে ফেলে দেওয়া, এমনকি পুড়িয়ে দেওয়া— সমাজমাধ্যমে তার ছবি দেখে শিউরে উঠেছেন সব মতামতের মানুষ।

পাওয়া গিয়েছে নতুন শব্দও — ‘বই জেহাদ’। বইয়ের স্টলের আয়োজকদের ‘দেশদ্রোহী’, ‘জেহাদি’ ও ‘ধর্মদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়েছে জেলায় জেলায়। তবে যাদবপুরে রীতিমতো ‘দৃশ্য’ রচনা করা হয়েছে— বইয়ের স্টল ভাঙার জন্য বুলডোজ়ার, বই তোলার জন্য পুরসভার জঞ্জালের লরি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ এবং লাঠিচালনা, এ সব দৃশ্যই রাজনৈতিক নির্মাণ। কিন্তু জনপরিসরে দৃশ্য নির্মাণের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শাসকের হাতে থাকে না। যে দিন বিশাল পুলিশ বাহিনী যাদবপুরে বইয়ের স্টল ভেঙেছে, সেই রাতে শহরের আর এক প্রান্তে পূজামণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের উপস্থিতি ছিল যৎসামান্য, তা সরকারও অস্বীকার করতে পারছে না। ফলে বইয়ের স্টল গুঁড়িয়ে দিয়ে বিরোধী রাজনীতির মতাদর্শের পরাভবের যে বার্তা দিতে চাইছিল রাজ্যের শাসক দল, তার মুখ ফিরে গিয়েছে শাসকের দিকেই। মণ্ডপগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের থেকে বইয়ের দোকান ভাঙা পুলিশ-প্রশাসনের কাছে বেশি গুরুত্ব পায় কী করে, সে প্রশ্ন উঠেছে। বাম চিন্তার ভাল-মন্দের বিচারকে ছাপিয়ে গিয়েছে প্রশাসনের কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় ক্ষোভ।

তবে রাজনৈতিক বার্তাটিকেও ছোট করে দেখা চলে না। তা এই যে, মুখ খুললেই কথা বলতে হবে রাষ্ট্রের সুরে। ভিন্ন সুর মানেই বেসুরো, বর্জনীয়। সাম্যবাদের চর্চা তো দূরের কথা, জাতীয়তাবাদ মানে হয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘রাষ্ট্রবাদ,’ মত প্রকাশের স্বাধীনতা এখন রাষ্ট্রের সুরে কথা বলা। যারা ভিন্ন কথা আলোচনা করে তারাই লক্ষ্য। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনও বৌদ্ধিক চর্চা চলবে না। ভিন্ন চিন্তা থেকে উঠে আসে নতুন নতুন প্রশ্ন, সমালোচনা। তাই কোনও নির্দিষ্ট দল নয়, সব বামপন্থী সংগঠনের স্টলই আক্রান্ত হয়েছে। এমনকি নির্দল মানবাধিকার সংগঠনের স্টলও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই কার্যসূচিকে কোনও দলের স্থানীয় নেতৃত্বের অতি-উৎসাহ বলে ধরা যাচ্ছে না। এ হল পরিকল্পিত আক্রমণ।

বুলডোজ়ার দিয়ে বইয়ের স্টল ভাঙার প্রতিবাদে তার পরের দিন যাদবপুরে কফি হাউসের সামনে প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে। সে যেন এক ভিন্ন উৎসবের দৃশ্য। মানবাধিকার সংগঠনের নাগরিক মিছিল ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকে আলাদা মিছিল হয়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে স্টলগুলোর আয়োজকদের পাশে দাঁড়ান, বই কেনেন। হুহু করে বিক্রি বেড়ে যায় স্টলগুলোতে। ‘ওয়ার্কার্স ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি সংগঠনের ডাকে গার্ডেনরিচ এলাকায় শ্রমিকদের মিছিল বার হয়। বইয়ের স্টল ভাঙার প্রতিবাদে, মার্ক্সবাদী সাহিত্য পড়ার অধিকারে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে।

যে কোনও উৎসবে কিছু কৌতুকময় দৃশ্যও তৈরি হয়। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতে নাৎসিদের বই পোড়ানোর সময় এক লেখক, অস্কার মারিয়া গ্রাফ দেখেছিলেন যে তাঁর বই পোড়ানোর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ‘বার্ন মি’ শিরোনামে একটি চিঠিতে বলেছিলেন, তাঁর বইও যেন অবিলম্বে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কারণ তিনি কোনও অবস্থাতেই বই-পোড়ানো দলের লোকেদের পছন্দের তালিকায় থাকতে চান না। এ বারেও দেখা যাচ্ছে, যে সব বইয়ের স্টল আক্রান্ত হয়নি, তাদের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেমন এক হতাশা তৈরি হয়েছে— তাঁরা কি ঠিক মতো স্টলটা তৈরি করতে, প্রচার করতে পারেননি? তাঁরা কেন ভাঙচুরের যোগ্য বিবেচিত হলেন না?

বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো বই পোড়ানো নিয়ে ফারেনহাইট ৪৫১ (১৯৬৬) নামে একটি ছবি করেছিলেন। ৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট হল সেই তাপমাত্রা, যাতে বই জ্বলে ওঠে। রে ব্র্যাডবেরি-র বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছায়াছবির প্রেক্ষাপট এক ভবিষ্যৎ সমাজ, যেখানে বই পড়া বা রাখা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। সমাজকে প্রশ্নহীন ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে বই খুঁজে খুঁজে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সেখানে অগ্নিনির্বাপকদের মূল কাজ আগুন নেবানো নয়, বইয়ের সন্ধান পেলেই তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। এই ছবির প্রধান চরিত্র মন্টাগ, যে নিজেও একজন অগ্নিনির্বাপক। এক দিন চুরি করে-আনা একটি বই পড়ে তার ভিতরে তোলপাড় শুরু হয়, তার ভাবনা-চিন্তায় আমূল বদল আসে। সে অনুধাবন করে বইয়ের গুরুত্ব, এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে বই রক্ষকদের দলে যোগ দেয়। ছবিটা শেষ হয় কিছু মানুষের আত্মত্যাগের দৃশ্যে, যারা প্রত্যেকে এক-একটি বই মুখস্থ করে নিজেদের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখে— যাতে বইয়ের শরীর ধ্বংস হলেও তার ভিতরে সঞ্চিত জ্ঞান বেঁচে থাকে। এ ভাবেই বইয়ের অবিনশ্বরতা তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে।

বাংলা এবং বাঙালি চিরকালই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছে, ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ও মোড়ে সর্বদা বাঙালিকে প্রতিবাদী ও প্রশ্নকারীর ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। বাংলায় একটি দীর্ঘ বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্য রয়েছে, যা দল-নির্ভর নয়। এখানেই কি শাসকদের ভয়? শাসক দলের নেতারা যেন বুঝতে পারছেন যে তাঁদের পছন্দের কিছু জননায়কের জীবনী পড়িয়ে, ইতিহাসের কিছু রক্তাক্ত অধ্যায়কে সামনে এনে, স্কুল-কলেজে পাঠ্য বই ‘সেন্সর’ করে, ইতিহাস থেকে বিজ্ঞান, সব ধরনের বিষয়ে পাঠ্যসূচিতে কাটছাঁট করে, খাদ্যতালিকা থেকে আমিষ বাদ দিয়েও পশ্চিমবঙ্গে তথাকথিত ‘হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ’ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এমন মরিয়া চেষ্টা করতে হচ্ছে।

বহু বছর ধরে পুজো অঙ্গনে বামপন্থী, নিরীশ্বরবাদী মতাদর্শের বইয়ের স্টল দেওয়া হয়। আজ কেন সাদামাঠা স্টলগুলি এত বিপজ্জনক মনে হচ্ছে? বিপদটা অন্যত্র। সামনে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সঙ্কট আসছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে চাষের জমি থেকে পাহাড়, জঙ্গল, কারখানা, সর্বত্র জনপ্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে দেশের, তথা রাজ্যের শাসক দলকে। বিরোধীদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় তাই এত তৎপরতা। পুজোকে কাজে লাগিয়ে শাসক মেপে নিতে চাইল নাগরিকের প্রতিক্রিয়া। বিরুদ্ধ মতের বই পদদলিত করলে মানুষ কতখানি ক্ষুব্ধ হয়, শাসকের পালে হাওয়া লাগে, না কি হাওয়া ঘুরে যায় উল্টো দিকে, ২০২৬-এ তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হল।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Vandalism CPM BJP

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy