E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সর্ষে, ভূত, আর ভুল

এআই ভুল করে কেন? এআই মানুষের মতো বাস্তব জগতের সত্যকে প্রত্যক্ষ করে উত্তর দেয় না। তার কাছে থাকা বিপুল তথ্য ও ভাষাগত নিদর্শনের ভিত্তিতে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করাই তার কাজ।

তৃণাঙ্ক মিত্র

শেষ আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:২৬

সকাল সাড়ে সাতটা। ­ওয়টস্যাপের নোটিফিকেশন বেজে উঠছে একের পর এক। সুধাংশুবাবু একটি উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক। প্রতি দিন এই সময়ে তিনি আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সুপ্রভাত বার্তা-সহ ছবি পাঠান। সেগুলির অভিনবত্ব পরিচিত মহলে প্রশংসাও কুড়োয়। আজ সেই স্বাভাবিক ছন্দে হঠাৎ বাধা পড়ল, চায়ের আড্ডার খগেনবাবুর বার্তা এল, “সে কী, তুমি না বাংলার শিক্ষক? তা বানানে ভুল? তোমাকে তো ছেলেছোকরাদের রোগে ধরল!” বিব্রত সুধাংশুবাবু মোবাইলের গ্যালারি খুলে দেখলেন, শ্যালক মহাশয় এক অভিনব ছবি-সহ সুপ্রভাত-বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই সেটি ফরওয়ার্ড করেছিলেন। কার্ডের বানান যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করেননি। আরও খুঁজে দেখলেন, দোলের দিন যাঁরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের বার্তাতেই একই রকমের ভুল। কোথাও যুক্তাক্ষর ভেঙে গেছে, কোথাও নতুন রূপ নিয়েছে, কোথাও ইংরেজি বর্ণ ঢুকে পড়েছে, কোথাও বর্ণবিন্যাসে ভুল। পরিচিত বাংলা ভাষার চেহারাটাই যেন পাল্টে গিয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা আজকাল আমাদেরও— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সৌজন্যে। বিশেষত বাংলা বা অন্য আঞ্চলিক ভাষায় লেখা-সম্বলিত চিত্র নির্মাণে এই সমস্যা আরও স্পষ্ট। সতর্ক হয়ে সংশোধনের নির্দেশ দিলেও, এক ভুল শোধরাতে গিয়ে নতুন বিকৃতির জন্ম হয়। এআই চ্যাটবট ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকেই লক্ষ করেছেন, চ্যাটবট খুললে ইনপুট দেওয়ার বাক্সের নীচে ছোট্ট সতর্কবার্তা ভেসে ওঠে যে এরা ভুল করতে পারে। অর্থাৎ, ভুল হতেই পারে, আমরা যেন মেনে নিয়েই তা ব্যবহার করি। আর একটু জোর দিয়ে বললে, ভুল করা তার অধিকার।

কিন্তু এই ‘অধিকার’-এর ভুক্তভোগী কারা? আমরা। এআই-এর ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই তার ভুলের পরিণতিও দেখা যাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে। ভুলগুলো শুধু আমাদের ওয়টস্যাপের কার্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব জীবনেও এর গুরুতর, আবার কখনও হাস্যকর পরিণতি দেখা গিয়েছে। আমেরিকায় ২০২৩-এ একটি মামলায় এক আইনজীবী মামলার নজির খুঁজতে চ্যাটজিপিটি-র সাহায্য নেন। চ্যাটজিপিটি তাঁকে ছয়টি অস্তিত্বহীন আদালতের মামলার নাম ও উদ্ধৃতি দিয়েছিল। আইনজীবী সেগুলো যথাযথ যাচাই না করেই আদালতে জমা দেন। পরে বিচারক অনুসন্ধান করে দেখেন, তাদের অস্তিত্বই নেই। ফলস্বরূপ আইনজীবীকে জরিমানার মুখে পড়তে হয়।

এখানেই প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: এআই ভুল করে কেন? এআই মানুষের মতো বাস্তব জগতের সত্যকে প্রত্যক্ষ করে উত্তর দেয় না। তার কাছে থাকা বিপুল তথ্য ও ভাষাগত নিদর্শনের ভিত্তিতে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করাই তার কাজ। সেই তথ্যের ভুল, অস্পষ্টতা বা অসম্পূর্ণতা থাকলে তার তৈরি উত্তরে বা ছবিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সহজ উদাহরণে বোঝানো যাক। ধরুন, আপনি রাজস্থানের মরুভূমিতে একটি পাইন গাছের ছবি চাইলেন। এআই-এর কাছে রাজস্থানের মরুভূমি সম্পর্কিত বিপুল তথ্য ও ছবি রয়েছে, আবার পাইন গাছ সম্পর্কেও। সে সেই দুইয়ের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে একটি নতুন চিত্র তৈরি করতে পারে। কিন্তু তার ব্যবহৃত তথ্যের মধ্যেই যদি কোনও ভুল থেকে থাকে— ধরা যাক, কোনও ছবিতে দেবদারু গাছকে ভুল করে পাইন গাছ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল— তা হলে সেই ভুলও নতুন সৃষ্টির মধ্যে চলে আসতে পারে। এটি তথ্যের মধ্যে থাকা ভুল থেকে জন্ম নেওয়া ভুলের একটি রূপ।

আবার, এআই-এর বহুল আলোচিত ‘হ্যালুসিনেশন’ কিছুটা আলাদা। যে-হেতু এআই নিজে ‘না’ বলতে শেখেনি, তাই অনেক সময় তথ্য ঠিক থাকলেও মডেল এমন তথ্য বা উত্তর তৈরি করতে পারে, যা দেখতে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হলেও বাস্তবে ঠিক নয়। উপরে বলা আইনজীবীর সেই মামলার নজিরগুলি ছিল তেমনই। এখানেই মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এআই কোনও উত্তর তৈরি করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। ব্যবহারকারীর যাচাই, সংশোধন ও বিচারবোধই শেষ পর্যন্ত তার ব্যবহারের মান নির্ধারণ করে।

ঐতিহাসিক ভাবে ভাষার নির্ভুলতার প্রতি আমাদের যে গভীর শ্রদ্ধা ছিল, আজকের এই দ্রুততার যুগে তার সঙ্গে তুলনা করলে বৈপরীত্যটি আরও স্পষ্ট হয়। ইউরোপে ছাপাখানার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রুফরিডারদের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। তাঁদের কাজ ছিল বানান, যুক্তাক্ষর, মাত্রা ও বিরামচিহ্নের ভুল চিহ্নিত করে সংশোধন করা। প্রকাশনার নির্ভুলতা ছিল বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতারও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা মুদ্রণের ইতিহাসেও নির্ভুল হওয়ার এই সাধনা কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয়-এর একাধিক সংস্করণে পরিবর্তন ও সংশোধন করেছিলেন। বাংলা মুদ্রণের বিকাশে পঞ্চানন কর্মকারের ভূমিকা এবং হ্যালহেডের ব্যাকরণগ্রন্থের জন্য বাংলা হরফ প্রস্তুত করার ইতিহাসও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি ভাষাকে মুদ্রণে প্রতিষ্ঠিত করতে কতখানি যত্ন ও পরিশ্রম প্রয়োজন হয়েছিল। অথচ আজ এআই-এর দ্রুততা ও অভিনবত্বের মোহে আমরা কখনও কখনও অনভিপ্রেত নানান ভুলকেই সহজ ও স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি।

মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ভুলকে মূল্যায়ন করার প্রেক্ষিত আরও গুরুগম্ভীর। একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, কোনও ভুল বা বিচ্যুতিকে বার বার মেনে নিলে বা উপেক্ষা করলে মানুষের মানসিকতায় ক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। প্রথমে যে বিষয়কে অস্বাভাবিক বা অগ্রহণযোগ্য মনে হত, বারংবার দেখার পর সেটাও পরিচিত হয়ে যায়। মনোবিদ রবার্ট জ়ায়েন্স তাঁর ‘মিয়ার এক্সপোজ়ার’ গবেষণায় দেখিয়েছেন— পরিচিতি থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা। সমাজবিজ্ঞানী ডায়ান ভন-এর ‘নর্মালাইজ়েশন অব ডিভিয়েন্স’-এর ধারণাও বলে, কোনও বিচ্যুতি বার বার ঘটতে থাকলে তা ক্রমে স্বাভাবিক বলে গণ্য হয়ে যায়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, ‘এ-সব তো হয়েই থাকে’, বা ‘সবাই তো মেনে নিচ্ছে’। ফলে ভুল নিয়ে কথা বলার সাহস ক্রমশ কমে, সমালোচনামূলক দৃষ্টি দুর্বল হয়। এক সময় সেই ভুল আর নৈতিক বা সামাজিক সমস্যা বলেই মনে হয় না।

অ্যামি এডমন্ডসন-এর ‘সাইকোলজিক্যাল সেফটি’ এবং ভ্যান ডাইক-সহ অন্য গবেষকদের ‘এরর ম্যানেজমেন্ট কালচার’ দেখায়— ভুল হওয়া নিজে বড় সমস্যা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ভুল নিয়ে কথা বলার সাহস হারানো, এবং ভুল থেকে শেখার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। মানুষ ধীরে কম প্রশ্ন করতে শেখে, কম চ্যালেঞ্জ করে। ভুল থেকে শেখার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে সমাজের শেখার ক্ষমতাই দুর্বল হয়ে পড়ে। নৈতিক চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় এক ধরনের উদাসীনতা জন্ম নিতে পারে— যা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বড় সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

এই প্রশ্নে সংস্থাগুলি তাদের নৈতিক দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। সৃষ্টিশীলতার নৈপুণ্যের প্রতি আমজনতার কদরও যে প্রতিনিয়ত কমছে, সেই প্রসঙ্গও অগ্রাহ্য করার বিষয় নয়। একই সঙ্গে এই ভুলকে স্বীকার করে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক জীবনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও অদূর ভবিষ্যতে পড়তে চলেছে কি না, সেটাও বিচারের সময় এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপকারী দিকগুলিও উন্মুক্ত। আমরা বর্তমান বিশ্বে এআই-কে অস্বীকার করতে পারব না, আর তা অভিপ্রেতও নয়।

তা হলে প্রশ্ন, আমরা কী করব? আমরা এআই-কে যখন কোনও কাজ করতে বলছি, তখন যেন নিজে এক বার ভাল করে যাচাই করে নিই— কোনও ভুল নির্দেশ দিইনি তো? বিশেষ করে আমাদের নির্দেশ বা ‘প্রম্পট’-এর শেষে যদি এমন বাক্য জুড়ে দেওয়া যায়— ‘ফাইনাল আউটপুট দেওয়ার আগে নিজে এক বার ক্রসচেক করবে, প্রয়োজনে সংশোধন করবে’, অথবা ‘বাংলা ভাষার অধ্যাপকের মতো ব্যাকরণ, বাক্যবিন্যাস ও শব্দ নির্বাচনে কঠোর নজর রাখবে’— তা হলে আউটপুট-এর উৎকর্ষ বাড়ে। সর্বোপরি, সেই সৃষ্টিকে এক বার নিজে দেখে নেওয়া এবং কোনও ভুল চোখে পড়লে প্রম্পট-এর মাধ্যমেই তা এআই-কে জানানো জরুরি। এর সুফল দু’টি। এক, আমাদের নির্দেশ মেনে এআই উত্তর দেওয়ার আগে নিজে এক বার তা যাচাই করে নেওয়ার চেষ্টা করবে— যদিও সেই যাচাই করাও সব সময় নির্ভুল হয় না; তাই শেষ ‘দেখা’টা আমাদেরই। দুই, ভুললে চলবে না, এআই আমাদের নির্দেশ ও সংশোধনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়; আমরা ভুল ধরিয়ে না দিলে সেই আলাপচারিতায় সে একই ভুলের বারংবার পুনরাবৃত্তি করতে পারে। তাই নির্ভুল উত্তর আর সংশোধিত তথ্য, দুই-ই আমাদের হাতে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল করতেই পারে। সেটা তার সীমাবদ্ধতা। কিন্তু, সেই ভুলকে আমরা কতটা নিজেদের যাপন এবং উদ্‌যাপনের মধ্যে নিয়ে আসব, সেটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই দায়িত্বকে উপেক্ষা করে যাওয়ার মতো ‘ভুল’ যেন আমরা না করি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
AI Human Data

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy