সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শরৎমেঘে’ (রবিবাসরীয়, ১৩-৯) শীর্ষক প্রবন্ধটির মূল চরিত্র দেবদাস বাঙালি মননে অমর। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের ১৫০ বছর পরেও তাঁর এই উপন্যাসের নায়ক আজও অমর এবং তা খুব সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে এই প্রবন্ধে। ভাবলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়, কী ভাবে তাঁর লেখনী জন্ম দিয়েছিল এই কালজয়ী উপন্যাসের, যা আজও অমলিন প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমীর কাছে। এই উপন্যাসে উল্লিখিত পূর্ব বর্ধমানের কালনা শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের হাতিপোতা গ্রামটি মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। এই গ্রামই প্রবন্ধটির মূল আলোচ্য, যেখানে আজও হাতিপোতা দেবদাসময়। তাঁর নামে যেমন বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ও সংরক্ষিত স্থান আছে, তেমনই মেলা থেকে খেলা— সবই দেবদাসের নামে আজও মহাসমারোহে উদ্যাপিত হয়।
তবে, আধুনিক কালে নানা আলোচনায় দেবদাসকে খলনায়ক হিসাবে দেখা বা তাঁর বিয়োগান্ত পরিণতির জন্য শুধু তাঁকেই দায়ী করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে প্রশ্নও থাকে। বলা যেতে পারে, তৎকালীন জাতপাতের দূরত্ব ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করতে না পারাটাই পার্বতী ও দেবদাসের মিলনের পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবশ্য আজও আমরা জাতপাতের দূরত্ব থেকে সমাজকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারিনি, যা দুর্ভাগ্যজনক। শরৎচন্দ্র কেন এই উপন্যাস প্রকাশ করতে চাননি, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বলা যায়, সেই ঘটনা ঘটলে আমরা বঞ্চিত হতাম এই উপন্যাসের স্বাদ গ্রহণে।
প্রবন্ধকার তাঁর প্রবন্ধে দেবদাস-এর চলচ্চিত্রায়ণ নিয়ে নির্বাক ছবি থেকে শুরু করে প্রমথেশ বড়ুয়া, দিলীপকুমার, এমনকি অভয় দেওল অভিনীত ছবির কথাও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাংলা দেবদাস-এর কথা, যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় দেবদাস এবং উত্তমকুমার চুনীলাল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, থাকলে ভাল লাগত। দুই কিংবদন্তি অভিনেতার এই অভিনয়-জুটিও দেবদাসের চলচ্চিত্র-ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি
জীবন-আলেখ্য
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শরৎমেঘে’ (রবিবাসরীয়, ১৩-৯) দেবদাস-কেন্দ্রিক বিশেষ এক অনুভবী রচনা। অনবদ্য। তবে আজও আধোরাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়, তখন দেবদাস-পার্বতীর সঙ্গে চোখে ভাসে সতীশ-সাবিত্রী, সুরেন-মাধবী, শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মীর মুখ। মনের মধ্যে ভিড় করে ললিতা-শেখর, রমা-রমেশ, অচলা-সুরেশ’সহ কত সব চরিত্র! ঘরোয়া বাঙালি জীবনের নিগূঢ় মান-অভিমান, প্রেম-পরিণয়ের সার্থকতা ও ব্যর্থতা এবং অপচয়িত জীবনের বেদনাবিধুরতা আজও অনন্য শরৎচন্দ্রের লেখনীতে। আসলে বিচিত্র জীবন-অভিজ্ঞতা, হৃদয়ানুভূতির অকৃত্রিমতা ও প্রবল মনুষ্যত্ববোধই ছিল শরৎচন্দ্রের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
সামাজিক নিষ্ঠুরতা, নীতিহীনতা ও নারীর প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শরৎচন্দ্র নির্ভয়ে লেখনী ধারণ করেছিলেন। শরৎ-সাহিত্য হয়ে উঠেছিল বাংলা তথা ভারতীয় প্রাণচৈতন্যের এক অপরূপ লাবণ্যময় প্রকাশ। সামাজিক অত্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শরৎচন্দ্রকে পাই তাঁর অরক্ষণীয়া, বামুনের মেয়ে, পল্লীসমাজ প্রভৃতি রচনায়। রমা ও রমেশের প্রেম-জটিলতার অন্তর্গূঢ় এক কাহিনি হিসাবে তাঁর পল্লীসমাজ আজও স্মরণীয়। আবার কৌলীন্য প্রথার কুফল, কৌলীন্যগর্বের অন্তঃসারশূন্যতা তাঁর বামুনের মেয়ে উপন্যাসের আলোচ্য বিষয়। সমাজ-অনুমোদিত, নীতিজ্ঞান-সমর্থিত এক সহজ প্রেমের সর্বাঙ্গসুন্দর চিত্র দেখতে পাই তাঁর দত্তা উপন্যাসে।
শ্রীকান্তকে তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা মনে করা হয়। এখানে এক দিকে শ্রীকান্তের বাল্যকালের কৌতুকমধুর জীবনযাত্রা, অন্য দিকে শ্রীকান্তের প্রতি রাজলক্ষ্মীর গভীর ভালবাসা, অভয়ার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও তেজ, অন্নদাদিদির স্বামী-অনুগত জীবনের কাহিনি বাংলা সাহিত্যে আজও অনন্য মর্যাদায় আসীন। আর তাঁর চরিত্রহীন এক আশ্চর্য ভালবাসার কাহিনি। মূলত সতীশ ও সাবিত্রীর জটিল সম্পর্ক ও আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস। সাবিত্রী যেমন এক দিকে ভালবাসা ও আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল, তেমনই কিরণময়ী বুদ্ধিমত্তা ও স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল এক অসাধারণ আকর্ষণীয় চরিত্র রূপে এখানে হাজির হয়েছে। তাঁর গৃহদাহ-এ মহিম ও সুরেশের প্রতি অচলার দোলাচল, প্রেম ও দ্বন্দ্ব এক দাহ-দীপ্তিপূর্ণ অসাধারণ উপন্যাসের রূপ পেয়েছে।পথের দাবী শরৎচন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপন্যাস, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলনের কাহিনি এবং সব্যসাচীর নেতৃত্বে এক গোপন বিপ্লবী সংগঠনের কর্মকাণ্ডের রূপায়ণ ঘটেছে।
তাঁর গল্পে একান্নবর্তী বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপড়েন, সম্পর্কের জটিলতা, স্নেহ-মমতা এবং বিশেষ করে নারীর জীবন ও ভূমিকার নানা দিক ফুটে উঠেছে। ‘দর্পচূর্ণ’ গল্পের ইন্দুমতীর আত্মমর্যাদাবোধ যেন লেখকের যুগচিন্তার প্রতিফলন। তাঁর ‘মহেশ’, ‘অভাগীর স্বর্গ’ ভাগ্যহত মানুষের নিষ্ঠুর বাস্তবতার কথ্যচিত্র। হৃদয়হীন সমাজজীবনে অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচার-নিপীড়নে দুলে-বৌ অভাগীর মরেও চিতায় ওঠার সৌভাগ্য হয়নি। আর নিরন্ন চাষি গফুর দারিদ্রের নির্মম কশাঘাতে তার পরম আদরের মহেশকে নিজেই লাঠি মেরে শেষ করে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আসলে শরৎচন্দ্র অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে শাসন-শোষণের শৃঙ্খলমুক্ত ভারতের কাঙ্ক্ষিত ছবিটিও চোখের জলে অঙ্কন করেছেন।
শরৎচন্দ্র সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও অশ্রু-বেদনাকে অত্যন্ত সহানুভূতি ও আবেগের রসে ডুবিয়ে রচনা করেছিলেন স্নিগ্ধমধুর, বেদনাবিধুর সব কাহিনি।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
সুখস্পর্শ
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শরৎমেঘে’ পড়ে তৃপ্তি পেলাম। কে না জানে, সারা দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের সমস্ত বাঙালি শরৎচন্দ্রের দেবদাস পড়েছে। তারই মধ্যে রবিবার সকালে শরৎচন্দ্র, দেবদাস ও হাতিপোতাকে নিয়ে এমন সুখস্পর্শ, এমন সুখানুভূতি পেলাম, যা লিখে বলে বোঝানো যাবে না। শরৎচন্দ্রের দীর্ঘ জীবনের ঘটনা, দেবদাসের জীবনপ্রবাহ, হাতিপোতার জমিদার, এখানকার মাঠ-ঘাট, নদী, মজে যাওয়া নদী, বটগাছ, জমিদারের অগোছালো সংসার, হাতি, পচানো পাট, পাট থেকে পাটকাঠি, গ্রামের মানুষের জীবন, রাস্তাঘাট, হাতিপোতা প্রাথমিক ও জুনিয়র হাই স্কুল প্রভৃতি এই লেখায় সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
সরডাঙায় কালাজ্বরের চিকিৎসার ওষুধ আবিষ্কার করা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, বাংলা সংবাদপত্রের পথিকৃৎ গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য, চুপির অক্ষয়কুমার দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ মানুষকে নিয়েও এ ভাবে লেখা প্রকাশের অনুরোধ জানাই। হাতিপোতা গ্রামের বিভিন্ন রাস্তার নাম শরৎচন্দ্রের বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের নামে দেওয়া যায়। এ ছাড়া এখানে শরৎ-গবেষণাগার, পাঠাগার এবং লেখকের সমস্ত গল্প-উপন্যাসের সম্ভার সাজিয়ে রাখলে সব বয়সের মানুষ, শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পাবে।
দীপঙ্কর চক্রবর্তী, পারুলিয়া, পূর্ব বর্ধমান
মনের গল্প
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শরৎমেঘে’ সম্পর্কে কিছু কথা।
দেবদাস উপন্যাসটির শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, গল্প বলার মুন্শিয়ানা, পাঠককে আটকে রাখার মন্ত্র এবং সর্বশেষ চিরকালের জন্য পাঠকের মনে ছাপ ফেলে যাওয়ার ক্ষমতা— এ এক অসামান্য কীর্তি। সে জন্যই বোধ করি দেবদাস এত বিপুল পঠিত একটি উপন্যাস।
সাহিত্যের এক সাধারণ ছাত্র হিসেবে এই কথাটি বারে বারে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যদি হন অকল্পনীয় কল্পনাশক্তি এবং প্রখর বাস্তববোধের সার্থক মেলবন্ধন, শরৎচন্দ্র তা হলে বাংলা ভাষার সহজতা এবং বঙ্গমনের অনুভূতির গভীরতার সার্থক সংমিশ্রণের আর এক নাম। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যদি হন বাংলা সাহিত্যের গরিমার দুই শৃঙ্গ, শরৎচন্দ্র তা হলে ওই দু’টি প্রতিস্পর্ধী পর্বতের মধ্যে স্থির এক সত্তা। খুব সহজ করে, গভীর মন্ত্রের মতো করে শরৎচন্দ্র বলেছেন মানুষের মনের গল্প।
অয়নকুমার মল্লিক, বাগনান, হাওড়া