তারকা পরিবারের সন্তান, বলিউডে হইহই করে অভিষেকের পরেও হারিয়ে যান যে ‘নেপো-কিড’রা
তারকা পরিবারের সন্তান হলে অভিনয়জগতে পা রাখার সুযোগ পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়। নামী প্রযোজক, পরিচালকের সঙ্গে কাজের সুযোগ থেকে শুরু করে প্রচারের আলো, প্রথম ছবিতেই অনেক কিছু মেলে। কিন্তু সেই সুযোগকে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যে পরিণত করতে পারেননি অনেকেই।
বলিউডে ‘নেপোটিজ়ম’ বা পরিবারতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তারকা পরিবারের সন্তান হলে অভিনয়জগতে পা রাখার সুযোগ পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়। নামী প্রযোজক, পরিচালকের সঙ্গে কাজের সুযোগ থেকে শুরু করে প্রচারের আলো, প্রথম ছবিতেই অনেক কিছু মেলে। কিন্তু সেই সুযোগকে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যে পরিণত করতে পারেননি অনেকেই। কারও প্রথম ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে, কেউ একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েও দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারেননি। আবার কেউ অভিনয় ছেড়ে বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। দেখে নেওয়া যাক এমনই কয়েকজন তারকাসন্তানকে।
উদয় চোপড়া: বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযোজনা সংস্থা যশরাজ ফিলম্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত যশ চোপড়ার ছোট ছেলে উদয় চোপড়া। দাদা আদিত্য চোপড়াও বলিউডের প্রথম সারির পরিচালক ও প্রযোজক। ২০০০ সালে আদিত্য পরিচালিত ‘মহব্বতেঁ’ ছবিতে শাহরুখ খান ও অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয়ের সফর শুরু উদয়ের। ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্যও পায়। পরে ‘মেরে ইয়ার কি শাদী হ্যায়’ এবং ‘নীল অ্যান্ড নিকি’-র মতো ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তবে সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ‘ধুম’ সিরিজ়ে আলি চরিত্রে দর্শকের নজর কাড়লেও একক নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। ২০১৩ সালে ‘ধুম ৩’-এর পরে আর বড়পর্দায় দেখা যায়নি তাঁকে। পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের বদলে প্রযোজনার কাজে মন দেন উদয়।
হরমন বাওয়েজা: তাঁর বাবা হ্যারি বাওয়েজা পরিচালক এবং মা পাম্মি বাওয়েজা পেশায় প্রযোজক। ২০০৮ সালে ‘লাভ স্টোরি ২০৫০’ ছবির মাধ্যমে প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার বিপরীতে আত্মপ্রকাশ করেন হরমন। ছবিটি ঘিরে প্রচার ছিল যথেষ্ট। তাঁর চেহারা ও নাচের সঙ্গে হৃতিক রোশনের তুলনাও চলেছিল। কিন্তু ছবিটি বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি। পরের বছর ‘ভিক্টরি’ এবং ‘হোয়াটস ইয়োর রাশি?’-তেও অভিনয় করেন তিনি। সেগুলিও সাড়া ফেলতে পারেনি। এর পরে অভিনয় থেকে দূরে গিয়ে প্রযোজনা ও চিত্রনাট্য লেখার কাজে মন দেন। যদিও ‘স্কুপ’-এর মতো ওয়েব সিরিজ়ে অভিনয় করে প্রশংসা পান তিনি। কিন্তু নায়ক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি তিনি।
জ্যাকী ভগ্নানী: প্রযোজক বাশু ভগ্নানীর ছেলে জ্যাকির প্রথম ছবি ‘কাল কিসনে দেখা’। পরিবারের নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা থাকায় ছবির প্রচার এবং পরবর্তী কাজের সুযোগ পেতে তাঁর সুবিধা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি। এর পরের ছবিটি কিছুটা সাড়া ফেললেও ‘অজব গজ়ব লভ’, ‘রংরেজ়’ এবং ‘ইয়ংগিস্তান’-এর মতো ছবিতে নায়ক হিসাবে সাফল্য পাননি জ্যাকী। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সেই দিকেই বেশি মনোযোগ দেন।
মিমো চক্রবর্তী: মিঠুন চক্রবর্তীর পুত্র মিমোও রয়েছে এই তালিকায়। ২০০৮ সালে ‘জিমি’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। ছবিটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছে বিশেষ সাড়া ফেলতে পারেনি। এর পরে ‘দ্য মার্ডারার’, ‘হন্টেড ৩ডি’ এবং ‘লুট’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন মিমো। বিশেষ করে ‘হন্টেড ৩ডি’ তাঁকে কিছুটা পরিচিতি দিলেও সেই ভাবে বলিউডে তিনি পাকাপাকি জায়গা তৈরি করতে পারেননি এখনও। বাবার মতো জনপ্রিয় তারকা হয়ে উঠতে না পারলেও অভিনয় এখনও ছাড়েননি মিমো।
আরও পড়ুন:
সূরজ পাঞ্চোলী: অভিনেতা আদিত্য পাঞ্চোলি ও জ়রিনা ওয়াহাবের ছেলে সূরজ পাঞ্চোলিকে বলিউডে লঞ্চ করেছিলেন সলমন খান। ২০১৫ সালে ‘হিরো’ ছবির মাধ্যমে আথিয়া শেট্টীর সঙ্গে কাজ শুরু তাঁর। ছবিটি ছিল সলমন খানের প্রযোজনায় তৈরি, ফলে মুক্তির আগে প্রচারও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেই প্রচার বক্সঅফিসে সাফল্য এনে দিতে পারেনি। অভিনয় নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন সূরজ। অভিনেতা হিসাবে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন, এখনও পর্যন্ত তা মনে করেন না দর্শক।
আথিয়া শেট্টী: অভিনেতা সুনীল শেট্টীর মেয়ে আথিয়ার প্রথম ছবিও ‘হিরো’। বিপরীতে সূরজ পাঞ্চোলী। নতুন মুখ হিসেবে আথিয়াকে নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও ছবিটি বক্সঅফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। পরে ‘মুবারকাঁ’ এবং ‘মতিচুর চাকনাচুর’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। তবে নায়িকা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। অভিনয়জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরির আগেই তাঁর কেরিয়ার থমকে যায়। ক্রিকেটার কে এল রাহুলের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁকে পর্দায় আরও কম দেখা গিয়েছে।
তনিশা মুখোপাধ্যায়: অভিনেত্রী তনুজার মেয়ে এবং কাজলের বোন তনিশা মুখোপাধ্যায়ের কাছে বলিউডে পরিচিতির অভাব ছিল না। ২০০৩ সালে ‘শশশশ…’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরে ‘পপকর্ন খাও! মস্ত হো যাও’, ‘ট্যাঙ্গো চার্লি’ এবং ‘নীল অ্যান্ড নিকি’-র মতো ছবিতে কাজ করেন তিনি। ২০০৫ সালের ‘সরকার’ এবং তার পরের ছবি ‘সরকার রাজ’-এও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। কিন্তু একাধিক ছবিতে অভিনয় করেও মুখ্য অভিনেত্রী হিসাবে নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি তনিশা।
ফরদীন খান: প্রয়াত অভিনেতা ও পরিচালক ফিরোজ় খানের ছেলে ফরদীনে প্রথম ছবি ১৯৯৮। বাবার পরিচালনায় ‘প্রেম অগন’ ছবির জন্য নবাগত অভিনেতা হিসাবে প্রশংসা পেয়েছিলেন তিনি। পরে ‘জঙ্গল’, ‘পেয়ার তুনে ক্যা কিয়া’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন। তবে তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্যগুলির মধ্যে রয়েছে ‘নো এন্ট্রি’, ‘হে বেবি’ এবং ‘অল দ্য বেস্ট’-এর মতো ছবি। তা সত্ত্বেও একক নায়ক হিসাবে সাফল্য স্থায়ী হয়নি। ২০১০ সালের ‘দুলহা মিল গয়া’-র পর দীর্ঘ সময় বড়পর্দা থেকে দূরে ছিলেন তিনি। তবে পরে প্রত্যাবর্তন হয় তাঁর। ‘হীরামন্ডী’ এবং ‘খেল খেল মে’-র মতো কাজের মাধ্যমে আবার অভিনয়ে ফিরেছেন ফরদীন।
আরও পড়ুন:
জ়ায়েদ খান: সঞ্জয় খানের ছেলে জায়েদ খানের বলিউডে প্রথম ছবি ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’ (২০০৩)। প্রথম ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি। তবে পরের বছর শাহরুখ খানের সঙ্গে ‘ম্যায় হুঁ না’ ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি। ছবিটি সফল হওয়ার পাশাপাশি জ়ায়েদের জনপ্রিয়তাও বাড়িয়েছিল। এর পরে ‘দশ’, ‘শব্দ’ এবং ‘ফাইট ক্লাব’-এর মতো ছবিতে কাজ করেন তিনি। ২০০৫ তবে এই ছবিগুলিও তাঁকে প্রথম সারির নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ক্রমশ তিনি অভিনয় থেকে সরে যান।
শমিতা শেট্টী: অভিনেত্রী শিল্পা শেট্টীর বোন শমিতা শেট্টী বলিউডে পা রাখেন ২০০০ সালে ‘মহব্বতেঁ’ ছবির মাধ্যমে। আদিত্য চোপড়া পরিচালিত ছবিতে শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন ও ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের মতো তারকাদের সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্যও পায়। এর পরে ‘মেরে ইয়ার কি শাদী হ্যায়’, ‘জ়েহের’-এর মতো ছবিতে দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু মুখ্য অভিনেত্রী হিসাবে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেননি শমিতা। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেও জনপ্রিয়তার নিরিখে দিদি শিল্পার কাছাকাছি পৌঁছননি তিনি। পরে রিয়্যালিটি শোতে যোগ দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি।
রিঙ্কি খন্না: রাজেশ খন্না ও ডিম্পল কাপাডিয়ার ছোট মেয়ে রিঙ্কি খন্নাও বলিউডে অভিনয় করতে এসেছিলেন তারকা পরিবারের পরিচিতি নিয়ে। অভিনেত্রী টুইঙ্কল খন্নার বোন রিঙ্কির অভিষেক হয়েছিল ১৯৯৯ সালে ‘পেয়ার মে কভি কভি’ ছবির মাধ্যমে। পরে ‘জিস দেশ মে গঙ্গা রহেতা হ্যায়’, ‘মুঝে কুছ কহনা হ্যায়’ এবং ‘ঝঙ্কার বিট্স’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। কয়েকটি ছবিতে নজর কাড়লেও বলিউডের মূলধারায় নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেননি রিঙ্কি। পরবর্তী সময়ে বিয়ে করে সংসারে মন দেন তিনি এবং অভিনয় থেকে সরে যান।
অধ্যয়ন সুমন: অভিনেতা শেখর সুমনের ছেলে অধ্যয়ন সুমনের বলিউডে সূচনা হয় ২০০৮ সালে ‘হাল-এ-দিল’ ছবির মাধ্যমে। প্রথম ছবিটি বিশেষ সাফল্য না পেলেও পরের বছর ‘রাজ়: দ্য মিস্ট্রি কন্টিনিউজ়’-এ অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি। ইমরান হাশমী ও কঙ্গনা রনৌতের সঙ্গে ওই ছবিতে কাজ করেছিলেন অধ্যয়ন। ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পাওয়ায় তাঁর কেরিয়ার নিয়েও প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু এর পরে তাঁর তেমন কোনও সফল ছবি নেই। বেশ অনেক বছর পরে ‘আশ্রম’, ‘ইনস্পেক্টর অবিনাশ’ এবং ‘হীরামন্ডি’-র মতো সিরিজ়ে অভিনয় করে ফের আলোচনায় এসেছেন তিনি।
হর্ষবর্ধন কপূর: অনিল কপূরের পুত্র এবং সোনম কপূরের ভাই তিনি। ২০১৬ সালে ‘মির্জ়া’ ছবির মাধ্যমে পা রাখেন বলিউডে। ছবির প্রচার বেশ বড় করেই হয়েছিল। পরিচালক ছিলেন রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা। দ্বৈত চরিত্র ছিল হর্ষবর্ধনের। তবে ছবিটি সাড়া ফেলতে পারেনি। এর পরেও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু সেই ভাবে নায়কের জায়গায় আসতে পারেননি।
ঈশা দেওল: ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর মেয়ে ঈশা দেওল যখন বলিউডে পা রাখেন, তখন তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল যথেষ্ট। ২০০২ সালে ‘কোই মেরে দিল সে পুছে’ ছবির মাধ্যমে সূচনা তাঁর। প্রথম ছবির জন্য সেরা নবাগতা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পেয়েছিলে তিনি। পরে ‘যুবা’, ‘ধুম’ এবং ‘নো এন্ট্রি’-র মতো ছবিতে অভিনয় করেন ঈশা। বিশেষ করে ‘ধুম’ এবং ‘নো এন্ট্রি’ বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিল। একটা সময়ে সফল ছিলেন অভিনেত্রী এবং নায়িকা হিসাবে। কিন্তু ক্রমশ অভিনয় কমিয়ে দেন। মাঝে দীর্ঘ বিরতিও নিয়েছেন।