ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে বক্তৃতার নজির গড়লেন নরেন্দ্র মোদী। মঙ্গলবার বক্তৃতায় দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের উল্লেখ করে মোদী বলেন, ‘‘ভারত ও ইন্দোনেশিয়াকে সমুদ্র (ভারত মহাসাগর) বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রামায়ণ ও মহাভারতের ঐতিহ্য আমাদের সংযুক্ত করেছে।’’
প্রসঙ্গত, প্রাচীনকাল থেকেই ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতিতে রামায়ণ ও মহাভারতের প্রভাব গভীর। ওই দু’টি মহাকাব্য শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির শিল্প, সাহিত্য এবং জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রয়ে গিয়েছে। প্রাচীন জাভান ভাষায় রচিত কাকাবিন রামায়ণ ইন্দোনেশিয়ার সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন। ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ বা ওয়েয়াং কুলিত এর মূল বিষয়বস্তু রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনা। বালি দ্বীপে বিশেষ পূর্ণিমা তিথির রাতে রামায়ণের নৃত্যনাট্য পরিবেশন করা সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ। মুসলিম প্রধান ওই দেশের সরকারি বিমান সংস্থার নাম ‘গড়ুর’। সামরিক বাহিনীর প্রতীকে রয়েছে হনুমানের উপস্থিতি। এমনকি, রাজধানী জাকার্তার শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের রথের বিশাল ভাস্কর্য রয়েছে।
আরও পড়ুন:
মোদীর বক্তৃতায় সেই ইতিহাসের পাশাপাশি উঠে এসেছে আগামী দিনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের রূপরেখা। তাঁর বক্তৃতায় এক দিকে ভারত-ইন্দোনেশিয়ার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন নিবিড় করার লক্ষ্যে ‘গঙ্গা-মাকাম (ইন্দোনেশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী নদী) ভিশন’-এর কথা এসেছে। অন্য দিকে এসেছে, সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার অপরাধের মোকাবিলায় যৌথ দ্বিপাক্ষিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা। রাষ্ট্রপুঞ্জ নিরাপত্তা পরিষদের পুনর্গঠনের পক্ষে সওয়াল করে মোদী ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবি যৌক্তিকতাও তুলে ধরেছেন ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে। সেই সঙ্গে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘ভারত উন্নয়নের পথ অনুসরণ করে, আধিপত্যবাদের নয়।’’
১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় আয়োজিত ঐতিহাসিক বান্দুং সম্মেলনে এশিয়া এবং আফ্রিকার ২৯টি দেশের রাষ্ট্রনেতারা জোট নিরপেক্ষতা ও শান্তির পক্ষে ঐকমত্য হয়েছিল। ভারতও সেই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, ‘‘বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের জন্য অসীম সুযোগ অপেক্ষা করছে।’’ ২০১৮ সালের ভারত-ইন্দোনেশিয়া কৌশলগত অংশীদারি পরিকাঠামো অনুযায়ী বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে এ বার মোদীর সফরের মূল লক্ষ্য বলে সরকারি সূত্রে খবর। মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে তাঁর বক্তৃতার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে মোদীর আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে প্রতিরক্ষা, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, ওষুধ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দু’পক্ষ প্রায় এক ডজন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদী বলেন, ‘‘আমি নিশ্চিত যে আজ ভারত-ইন্দোনেশিয়া অংশীদারির একটি স্বর্ণালি অধ্যায়ের সূচনা হল। এই অধ্যায় একুশ শতকে সমগ্র মানবজাতির উপর গভীর, ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’’