বছর কয়েক আগেকার কথা। বলিউডের গীতিকার ও কৌতুকশিল্পী বরুণ গ্রোভার একটি ‘টক শো’তে বলেছিলেন, ‘‘বিহার-উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যের মানুষকে জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট করা যাবে না বললে তাঁরা ভারী মুশকিলে পড়বেন। জাতপাত না দেখে ভোট দিতে হবে? তা হলে কী দেখে ভোট দেব? সরকার কেমন কাজ করেছে? চাকরি হচ্ছে কি না? উন্নয়ন হচ্ছে কি না? বিরোধীরা কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে? এত সব দেখে কি ভোট দিতে হবে!’’ হিন্দি বলয়ের ভোটের সেই চেনা ছকটাই বদলে দিল বিহারের বাঁকিপুর। সৌজন্য, প্রাক্তন ভোটকুশলী তথা জনসুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা-প্রধান পিকে।
গত তিন দশক ধরে ‘বিজেপির দুর্ভেদ্য দুর্গ’ হিসাবে পরিচিত বাঁকিপুরে সবচেয়ে বেশি ভোটার কায়স্থেরা। বিহার রাজনীতিতে ভূমিহার, লালা (বানিয়া) রাজপুতদের পাশাপাশি তাঁরাও বিজেপির ‘একনিষ্ঠ ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত। বাঁকিপুর যে পটনা সাহিব লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সেখানে ২০০৯ সাল থেকে টানা বিজেপির টিকিটে জিতে চলেছেন শত্রুঘ্ন সিন্হা (বর্তমানে তৃণমূল সাংসদ), রবিশঙ্কর প্রসাদের মতো কায়স্থ প্রার্থীরা। বাঁকিপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনও জাতিতে কায়স্থ। পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানী পটনার ওই বিধানসভা আসনে ১৪ শতাংশ কায়স্থ, ১২ শতাংশ যাদব (ওবিসি), ১২ শতাংশ মুসলিম, ৯ শতাংশ চন্দ্রবংশী (‘অতি পিছড়া’ বা ইবিসি গোষ্ঠীভুক্ত কাহার), ৯ শতাংশ বানিয়া, ৯ শতাংশ দলিত (তফসিলি জাতি বা এসসি), ৮ শতাংশ ভূমিহার, ৮ শতাংশ ব্রাহ্মণ, ৭ শতাংশ রাজপুত, ৫ শতাংশ কুর্মি (ওবিসি) এবং ৩ শতাংশ কুশওয়াহা (ওবিসি) ভোট রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ভোটের ফল বলছে ব্রাহ্মণসন্তান পিকে সেখানে জয়ী হয়েছেন ৪৯ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে। বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ৩৪ শতাংশের সামান্য বেশি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদের দল আরজেডি পেয়েছে ১১ শতাংশেরও কম ভোট! বিহার রাজনীতিতে বিজেপির তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণ’ (এর মধ্যে বানিয়ারা বিহারে ওবিসি তালিকাভুক্ত হলেও দেশের অন্যত্র অসংরক্ষিত জাতির অন্তর্গত) ভোটব্যাঙ্কের উপস্থিতি বাঁকিপুরে ৩৭ শতাংশেরও বেশি। এর উপর ছিল জোটশরিক নীতীশ কুমারের দল জেডিইউ এবং উপেন্দ্র কুশওয়াহার রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চা কুর্মী –কোয়েরী-কুশওয়াহা এবং প্রভাবশালী দুই দলিত নেতা চিরাগ পাসোয়ানের দল লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জিতনরাম মাঁঝির ‘হিন্দুস্থান আওয়াম মোর্চা’ (হাম)-র সমর্থন। কিন্তু তবুও মাত্র ন’মাসের ব্যবধানে বিজেপির ভোট প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।
প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি, ককরোচ জনতা পার্টির প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের (দিল্লির পাশাপাশি যে আন্দোলনের তীব্রতা পটনাতেও ছিল প্রবল, এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ ছিল অসংরক্ষিত শ্রেণির) প্রভাব পড়ার পাশাপাশি আরও দু’টি কারণে বাঁকিপুরে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে ধস নেমেছে— প্রথমত, বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার। শেষ মুহূর্তে বিতর্কের কারণে প্রার্থী বদল করে তাঁকে আনা হয়েছিল। জাতিতে কায়স্থ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বিধায়ক হওয়ার উপযুক্ত মনে করেননি বিজেপি চিরাচরিত সমর্থকদের একটি অংশ। দ্বিতীয়ত, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সম্রাটের মতো কুশওয়াহা নেতাকে বেছে নেওয়ায় তাদের ‘উচ্চবর্ণ’ ভোটব্যাঙ্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আরজেডি-র মতো ‘যাদব-মুসলিম’ সমর্থন-নির্ভর দলকে তাঁরা ভোট দেননি। পরিবর্তে বেছে নিয়েছেন ব্রাহ্মণ নেতা পিকে-কে। বিহারের ‘উচ্চবর্ণ’, ওবিসি এবং ইবিসিদের মধ্যে নীতীশই ছিলেন এনডিএ-র যোগসূত্র। তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরানোয় ক্ষত মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া, পিকে কখনও জাতপাত-নির্ভর রাজনীতি না করায় ওবিসি, দলিত এবং মুসলিম ভোটের একটি অংশও তাঁর দিকে গিয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান।