রাবণ-পুত্র মেঘনাদের (ইন্দ্রজিৎ) মতোই আড়ালে থেকে শত্রুর উপর প্রাণঘাতী আঘাত হানতে তারা দক্ষ। ভারতীয় নৌসেনার জন্য এমনই স্টেল্থ প্রযুক্তির আটটি ‘নেক্সট-জেনারেশন কর্ভেট’ (ছোট যুদ্ধজাহাজ) নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি। এর জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে দুই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা— কলকাতার ‘গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ (জিআরএসই) এবং ‘গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড’ (জিএসএল) আটটি স্টেল্থ যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করবে। কয়েক মাস আগেই নৌসেনার জন্য স্টেল্থ প্রযুক্তির ‘নতুন প্রজন্মের ডেস্ট্রয়ার গোত্রের রণতরী’ (‘নেক্সট জেনারেশন ডেস্ট্রয়ার’ বা এনজিডি) নির্মাণের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বরাত পেয়েছে মুম্বইয়ের মাজগাঁও জাহাজ নির্মাণ কারখানা। কর্ভেট গোত্রের যুদ্ধজাহাজ মূলত উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, নজরদারি এবং টহলের জন্য ব্যবহৃত হয়। এগুলি ফ্রিগেট এবং ডেস্ট্রয়ারের চেয়ে ছোট তবে বিভিন্ন ধরনের হালকা অস্ত্র এবং সেন্সরে (নজরদারি সরঞ্জাম) সজ্জিত।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে ভারতীয় নৌবাহিনীর ভাঁড়ারে অন্তত ২০০টি বিভিন্ন শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ মজুত করার লক্ষ্য নিয়েছে মোদী সরকার। নতুন যুদ্ধজাহাজগুলির বড় অংশই কোচি, মুম্বই, কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্ন ডক ইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে কলকাতার গার্ডেনরিচ, মুম্বইয়ের মাজগাঁওয়ের মতো জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলিতে ৫৫টি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণাধীন। এই কর্মসূচির আনুমানিক ব্যয় ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়াও, প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান অনুসরণ করে ৭৪টি দেশীয় প্রযুক্তিতে নতুন যুদ্ধজাহাজ এবং ডুবোজাহাজ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর জন্য আনুমানিক খরচ হবে আরও ২ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই তালিকায় রয়েছে ন’টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন, চারটি ১০ হাজার টনের পরবর্তী প্রজন্মের ডেস্ট্রয়ার এবং সাতটি পরবর্তী প্রজন্মের মাল্টি-রোল স্টেলথ্ ফ্রিগেট।
আরও পড়ুন:
স্টেল্থ প্রযুক্তির বিশেষত্ব কী
স্টেল্থ প্রযুক্তির সূচনা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যুদ্ধবিমান দিয়ে। পরবর্তী কালে যুদ্ধজাহাজ, ডুবোজাহাজ এমনকি সামরিক হেলিকপ্টারেও ব্যবহার হচ্ছে এই প্রযুক্তি। শত্রুর নজর এড়িয়ে হামলা চালানোর জন্য পরীক্ষামূলক ভাবে স্বচ্ছ ফাইবারের তৈরি যুদ্ধবিমান বানিয়েছিল হিটলারের জার্মানি। ঘটনাচক্রে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ চিহ্নিত করার জন্য রাডারের ব্যবহার শুরু হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয়, রাডার-নজরদারি ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তির সন্ধানও। এ ক্ষেত্রেও পথপ্রদর্শক ছিল জার্মানি।
ছ’দশক পরেও শত্রুপক্ষের বিমান, যুদ্ধজাহাজ বা ডুবোজাহাজ চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত রাডার (বা সোনার-এর) মূল প্রযুক্তি প্রায় একই রয়েছে। যে এলাকা থেকে জল বা আকাশপথে শত্রুসেনার আগ্রাসনের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট সময় অন্তর রেডিয়ো তরঙ্গ ছুড়ে দেয় রাডার। যুদ্ধবিমান বা জাহাজের ধাতব দেওয়ালে সেই নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ‘রেডিয়ো ওয়েভ’ ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলেই কেল্লা ফতে। নিমেষে হিসাব করে নেওয়া যায় সেই বিমান বা জাহাজের অবস্থান, আকার, অভিমুখ এবং গতিবেগ। অর্থাৎ রাডারের নজরদারি এড়াতে হলে বাঁচতে হয় সেই রেডিয়ো তরঙ্গ থেকে। রাডার প্রতিরোধী ‘স্টেলথ টেকনোলজি’র লক্ষ্য একটাই— বিমান বা জাহাজের গায়ে ধাক্কা খাওয়া রেডিয়ো তরঙ্গকে ঠিক ভাবে রাডারের কাছে ফিরতে না দেওয়া। সে জন্য রেডিয়ো তরঙ্গকে শুষে নেওয়া বা দিগ্ভ্রান্ত করার পদার্থ এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ ধাতুসংকর এবং কার্বন ফাইবারের তৈরি স্টেলথ যুদ্ধবিমান কিংবা ফ্রিগেট ও ডেস্ট্রয়ার জাতীয় স্টেলথ যুদ্ধজাহাজ সেই কাজ করতে পারে, যা সাধারণ ধাতুতে তৈরি যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজের পক্ষে সম্ভব নয়।