দাম ছিল ৪০ হাজার টাকা। হয়ে গেল ২,৭২০ টাকা! ৮০ হাজারের মহার্ঘ ওষুধ এখন মিলবে ৭ হাজার ১৫০ টাকায়! ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ১৩৭টি গোত্রের ৫৪৩টি ওষুধের দাম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমার কথা জানিয়ে তালিকা প্রকাশ করল ‘ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি’ (এনপিপিএ)। আগামী ৯ নভেম্বর থেকে সংশোধিত দাম কার্যকর হবে।
এক ধাক্কায় ক্যানসারের ওষুধের দাম কমার নেপথ্যে কি সুপ্রিম-দাওয়াই? জীবনদায়ী ওষুধ এমআরপি দামে বিক্রি করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা বিবেচনাধীন রয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর সেই মামলার শুনানিতে ক্যানসারের ওষুধের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিল বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি বিক্রম নাথের বেঞ্চ। মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি মেহতা জানান, ক্যানসারের এমন ওষুধ রয়েছে যা উৎপাদনকারী সংস্থা খুচরো বিক্রেতাকে ২,৭০০ টাকায় বিক্রি করছে। কিন্তু সেই ওষুধেরই সর্বাধিক বিক্রয় মূল্য (এমআরপি) লেখা রয়েছে ২৭ হাজার টাকা! ওই দিন বিচারপতি মেহতা তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, ‘‘এটা দিনে ডাকাতি ছাড়া আর কী! একজন রোগীর সঙ্গে এ ভাবে প্রতারণা করা যায়? উৎপাদনকারী সংস্থা যে ওষুধ ২,৭০০ টাকায় খুচরো বিক্রেতাকে দিচ্ছে, সেটাই ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে কী ভাবে? যাঁদের এ বিষয়ে পদক্ষেপ করা দরকার এ ক্ষেত্রে তাঁদের নীরবতা দুর্ভাগ্যজনক।’’
ঘটনাচক্রে, এর পরেই গত সপ্তাহে ১৩৭টি নন-শিডিউলড ক্যানসারের ওষুধে লাভের সীমা ৩০ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে এনপিপিএ। সেই ঘোষণার পরেও এনপিপিএ শীর্ষ আদালতের ভর্ৎসনা থেকে রেহাই পায়নি। একই মামলায় গত মঙ্গলবারের শুনানিতে বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি বিক্রম নাথের বেঞ্চের প্রশ্ন ছিল, ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির উপরে সরকারি নজরদারি নেই কেন? এনপিপিএ-র ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত। ঘটনাচক্রে, এর পরই প্রকাশিত হয় এনপিপিএ-র তালিকা।
আরও পড়ুন:
সংশোধিত তালিকায় স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একাধিক ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। ‘পালবোব্রো’ ব্র্যান্ডের ১২৫ মিলিগ্রামের প্যাকের দাম ৪০ হাজার ৪২১ টাকা থেকে কমে হয়েছে ২ হাজার ৭২০ টাকা। দাম কমেছে প্রায় ৯৩.৩ শতাংশ। একই ওষুধের ১০০ মিলিগ্রামের প্যাকের ক্ষেত্রে ‘আইসোজেন’এর দাম কমেছে ৯১.৬ শতাংশ। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যানাস্ট্রোজ়ল ‘ওয়োমাজ়লে’র দামও ৪৫৮ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ৩৯ টাকা ৫২ পয়সা। এনপিপিএ-র বক্তব্য, ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির দেওয়া তথ্যে ভিত্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুসারে এই তালিকা পরিমার্জন করা হবে।
এনপিপিএ-র পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে স্তন ক্যানসার চিকিৎসক দীপ্তেন্দ্র সরকার বলেন, ‘‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার সুফল যাতে সাধারণ মানুষ পান সেটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেটাই অগ্রগতি। গবেষণার হাত ধরে উঠে আসা জীবনদায়ী ওষুধের সুফল যদি মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়, তা হলে দিনের শেষে এ ধরনের গবেষণার কার্যকারিতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সংশোধিত তালিকায় যে ওষুধগুলির দাম কমেছে সেগুলি ক্যানসার রোগীদের আয়ু বাড়াতে সাহায্য করে। নিম্ন, মধ্যবিত্তদের কাছে মলিকিউলার টার্গেটেড থেরাপির সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই।’’
ইনস্টিটিউট অফ ব্রেস্ট ক্যানসারের কর্ণধার চিকিৎসক সৌমেন দাস বলেন, ‘‘ক্যানসারের ওষুধের দাম কমানো রোগীদের জন্য যে স্বস্তির, তা স্বীকার করতেই হবে। তবে সেটিই সাশ্রয়ী ক্যানসার চিকিৎসার পূর্ণ সমাধান নয়। এই দাম কমার সুবিধা বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসাধীন রোগীদের বিলেও যাতে প্রতিফলিত হয় সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্যানসারের অত্যন্ত দামি ওষুধগুলিও যাতে মানুষের হাতের নাগালে আসে তা-ও নিশ্চিত করা জরুরি।’’
চিকিৎসকদের এই পর্যবেক্ষণের একটি বড় কারণ ইমিউনোথেরাপির ওষুধ ‘কিট্রুডা’র (পেমব্রোলিজ়ুম্যাব গোত্রের ওষুধ) দামে কোনও হেরফের ঘটেনি। এই ওষুধের দাম এখনও ২ লক্ষ ১৬ হাজার ৫০০ টাকাই রয়েছে। ২১ ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করা যায় বলে জানাচ্ছেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞেরা। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ক্রিক্সানা’র (রিবোসিক্লিব) দামও রয়েছে একই , ২৪ হাজার ৪৩৫ টাকা। ‘ট্যাগ্রিসো’, ‘টেসেনট্রিক’, ‘ডারজ়ালেক্স’ এবং ‘ইমফিনজি’র মতো ওষুধের এমআরপিতেও কোনও পরিবর্তন হয়নি। বস্তুত, সংশোধিত তালিকায় বহুজাতিক সংস্থাগুলির বহু ওষুধের নাম নেই বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
অল ইন্ডিয়া ড্রাগ অ্যাকশন নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক মালিনী আইসোলার বক্তব্য, ‘‘রোগীদের কী পরিমাণ বেশি টাকা খরচ করে এই জীবনদায়ী ওষুধগুলি কিনতে হচ্ছিল তা এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট। শুধু বহুজাতিক সংস্থা নয়, ক্যানসারের জেনেরিক, বায়োসিমিলার ওষুধ তৈরি করা দেশীয় সংস্থাগুলিও একই দোষে দুষ্ট।’’ তবে পেটেন্ট- নির্ভর ওষুধের যে দাম কমেনি তা-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মালিনী। তাঁর মতে, ‘‘ক্যানসারের ওষুধ খুচরো বাজারে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে কয়েকজন সুনির্দিষ্ট মধ্যস্থতাকারী রয়েছেন। এর বাইরে সরাসরি হাসপাতালের ফার্মাসিতে ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য একবার কমিয়ে দিলেই কাজ শেষ হবে না। মুনাফার ঊর্ধ্বসীমা পাকাপাকি ভাবে বেঁধে দিতে হবে। এনপিপিএ নিজেই জানাচ্ছে সংস্থাগুলির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। প্রশ্ন হল, এনপিপিএ-র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই তথ্য কেন সংগ্রহ করা হবে না? তথ্যের জন্য সংস্থাগুলির উপরে নির্ভরশীল থাকতে হবে কেন? রোগীদের স্বার্থরক্ষার বদলে মূল্য নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কার্যত ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে!’’
এনপিপিএ-র ভূমিকা আরও ইতিবাচক হওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন প্রবীণ ক্যানসার চিকিৎসক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, ‘‘ওষুধ সংস্থাগুলির লাগামহীন মুনাফা রোধে একটা চেষ্টা করা হয়েছে। এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে পদক্ষেপ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না সে বিষয়ে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।’’
এনপিপিএ-র পদক্ষেপে পেশেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের (পিএপি) কী হবে সেই প্রশ্নও রয়েছে। এর অর্থ অনেক সময় ক্যানসারে আক্রান্তদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করে সংস্থাগুলি। যে সকল জেনেরিক, বায়োসিমিলার ক্যানসার ওষুধের দামে ৯০ শতাংশ দাম কমছে তারা কি আর পিএপি-তে আগ্রহী হবে? ক্যানসার চিকিৎসকদের বক্তব্য, ৯০ শতাংশ দাম কমার পরে পিএপি-র প্রয়োজনীয়তা হয়তো হবে না। একই সঙ্গে পেটেন্ট ওষুধের দাম না কমা নিয়ে ক্যানসার চিকিৎসার গবেষণার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক কৌশিক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বহুজাতিক সংস্থাগুলির গবেষণা, ওষুধ উন্নত করার কাজে যে পরিমাণ টাকা লগ্নি করা থাকে তার জন্যই বাজারজাত হওয়ার পর ওষুধের দাম অনেক বেশি হয়। আমার মনে হয়, পেটেন্ট থাকার জন্যই বহুজাতিক সংস্থার এমআরপি-তে হাত দেওয়া যায়নি। তবে যা হয়েছে সেটাও কম নয়। এমআরপি-র দামে ওষুধ বিক্রি করে সবথেকে বেশি লাভবান হয় হাসপাতালগুলো। এটা তাদের জন্য নিশ্চিত ভাবেই একটা বড় ধাক্কা!’’