আবার মতবিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হল কেন্দ্রীয় সরকার এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মধ্যে। সিজেপির বক্তব্য, শনিবার আলোচনার সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের যে আশ্বাস দিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের মঙ্গলবারের পর্যবেক্ষণ তার পরিপন্থী। প্রতিবাদে শামিল কাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হবে, কাদের বিরুদ্ধে হবে না, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে শর্ত দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সূত্র বলছে, অতীতে অপরাধের ইতিহাস রয়েছে, এমন কেউ আন্দোলন সংক্রান্ত হিংসায় জড়িত থাকলে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না-করার কোনও আশ্বাস দেওয়া হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলবার জানিয়েছে, অপরাধের ইতিহাস নেই, এমন নাবালক বিক্ষোভকারীদের আটক বা গ্রেফতার করে রাখা যাবে না। সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে তাঁরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কিন্তু তা বলে নিজেদের দাবি থেকে সরছেন না। তাঁর কথায়, ‘‘শীর্ষ আদালত যদি দেশের যুবসমাজের স্বার্থে পদক্ষেপ করে, তা হলে এই নির্দেশ বা পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানাই। তবে আমাদের দাবিও পূরণ করতে হবে। সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’’
সৌরভ জানান, যন্তর মন্তরে আন্দোলন প্রত্যাহারের অন্যতম শর্ত ছিল, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিট-কাণ্ডে প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর প্রত্যাহার। যাঁদের আটক করা হয়েছিল, তাঁদেরও মুক্তির দাবি জানানো হয়েছিল। তাঁদের তরফে কখনওই বলা হয়নি যে, কেবল নাবালক বলে বা অতীতে অপরাধে না জড়ালে মুক্তি দিতে হবে। তাঁদের দাবি ছিল, আন্দোলনস্থল থেকে আটক সকলের মুক্তি। শনিবার সাংবাদিক বৈঠকে সৌরভেরা যখন এই কথা বলছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডা। সিজেপি মুখপাত্রের কথায়, ‘‘সাংবাদিক বৈঠকে সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার সম্মান করা উচিত।’’
সিজেপির বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকার শনিবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের মিল নেই। সৌরভের বক্তব্য, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট এখন বলছে, যাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হবে না। সরকারের সঙ্গে আমাদের যে আলোচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। সুপ্রিম কোর্ট যে শর্ত দিয়েছে, তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’’ তাঁরা এ-ও জানিয়েছেন, তাঁদের দাবির পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ কার্যকর করা হোক। তবে তাঁদের দাবি সর্বপ্রথম পূরণ করতে হবে। তা না হলে দিল্লির পথে আবার নামবেন, সেই হুঁশিয়ারি সোমবারই দিয়ে রেখেছিলেন ককরোচেরা। সিজেপি এ-ও জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার এখনও সই করে চুক্তিপত্র ফেরত দেয়নি।
আরও পড়ুন:
কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সূত্রের দাবি, ‘শান্তিপূর্ণ ভাবে’ যাঁরা প্রতিবাদ করছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যাঁরা ‘সমাজবিরোধী’, তাঁদের নিয়ে কোনও আশ্বাস দেওয়া হয়নি। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকার এবং সিজেপির মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। তার পরে সিজেপি আন্দোলন প্রত্যাহার করে। শনিবার সাংবাদিক বৈঠক করে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। নড্ডাজি (স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডা) সুচারু ভাবে সরকারের আশ্বাস তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট বলেন, প্রতিবাদ করার জন্য প্রতিবাদী এবং আয়োজকদের বিরুদ্ধে মামলা হবে না। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা রয়েছে, যাঁরা হিংসায় জড়িয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে।’’ তাঁর দাবি, যে লিখিত আশ্বাস দেওয়ার পরে সমাজসৈনিক সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষ করেছিলেন, তাতেও এই একই কথা বলা হয়েছিল। সেই লিখিত আশ্বাসপত্রে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিয়েছিল, ‘শান্তিপূর্ণ ভাবে’ যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে না।
অন্য এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, সিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে লিখিত কোনও চুক্তিই ছিল না। উভয় পক্ষের বৈঠকে যা হয়েছিল, তা শনিবার নড্ডা সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছিলেন। সিজেপি একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছিল, যা সই করে মঙ্গলবারের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল কেন্দ্রের।
শনিবার নড্ডা সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন, ‘‘ওঁদের দাবি ছিল, কোনও এফআইআর রুজু হবে না (প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে)। হয়ে থাকলে তা প্রত্যাহার করতে হবে। সে দিল্লি হোক বা অন্য বিজেপিশাসিত রাজ্যে। আমরা ওদের এফআইআরের প্রতিলিপি দেব। এফআইআর প্রত্যাহারের পরে কোনও পদক্ষেপ করব না। (প্রতিবাদের জন্য) প্রতিবাদী, আয়োজকদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনও মামলা হবে না।’’ যদিও ওয়াংচুককে দেওয়া লিখিত প্রতিশ্রুতিতে জানানো হয়েছিল, ‘‘দিল্লির যন্তর মন্তরে এবং ২০ জুলাই সংসদ চলো কর্মসূচিতে যাঁরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা যাতে রুজু না হয়, তা নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ করা হবে।’’
বিহার এবং অসমের সরকার জানিয়েছে, ২৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার আগে আটক প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা হবে। কলকাতায় সিজেপি-র মিছিলে অশান্তির ঘটনায় ধৃত ১৬ জনের ৫০০ টাকার বন্ডে জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। সিজেপি যদিও অনড়, শর্ত নয়, আন্দোলনের সময় আটক কারও বিরুদ্ধেই কোনও আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের সূত্র বলছে, এই আশ্বাস দেওয়া হয়নি। তার পরেই নতুন করে শুরু টানাপড়েন।