ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে গণহারে ভোটারদের নাম বাদ এবং অনিয়মের অভিযোগে সরগরম গোটা দেশ। বিরোধীরা একযোগে সুর চড়িয়েছে শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে। অনিয়মের অভিযোগে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারই বিরোধীদের নিশানায়।
তাঁর পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার, গাঁধী জয়ন্তীতে দিল্লির রাজপথে নামে আম আদমি পার্টি (আপ)। শুধু আপ নয়, একই দাবিতে কংগ্রেস এবং বামেরাও দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সেই বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশ দিকে দিকে ব্যারিকেড দেয়। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি, কথা কাটাকাটিতে উত্তাল হয়ে ওঠে দিল্লির যন্তর মন্তর। হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে খবর। শুধু দিল্লি নয়, দেশের আরও দুই শহর— মুম্বই এবং কলকাতাতেও জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভের ছবি দেখা গিয়েছে। সকালে দিল্লিতে আপ-কংগ্রেস-বামেদের বিক্ষোভ তো, বিকেলে মুম্বইয়ে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ‘জেল ভরো’ আন্দোলন। অন্য দিকে, বেলায় কলকাতায় পথে নেমেছিল বামেরা। সব মিলিয়ে শুক্রবার দিনভর শিরোনামে থাকল জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি!
ফের উত্তপ্ত যন্তর মন্তর
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দিল্লির যন্তর মন্তর। দুপুর পর্যন্ত ৭০০-রও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। বিকেল গড়াতে সেই সংখ্যা আরও বাড়ে। হাজারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায় আটক হওয়া বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা। আটক করা হয় সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাট, আপ নেত্রী তথা দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আতিশী মারলেনা, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, আইসা নেত্রী নেহা বোরাকে। আপের রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিংহের দাবি, সংসদে যাওয়ার সময় তাঁকে আটক করে পুলিশ। তার পরেই পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান গিয়ে ধর্না অবস্থানে বসে পড়েন সঞ্জয়। যন্তর মন্তর থেকে বিক্ষোভকারীদের টেনেহিঁচড়ে প্রিজ়ন ভ্যানে তোলা হয় বলে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ দেখায় বাম ছাত্র-যুব সংগঠনগুলিও। স্লোগান ওঠে, ‘জ্ঞানেশ কুমার গদি ছাড়ো’। এসএফআই-ডিওয়াইএফআই কর্মীদের পাশাপাশি আটক করা হয় সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবিকেও। প্রিজ়ন ভ্যান থেকে তিনি বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার গণতন্ত্রের হত্যাকারী। অবৈধ কাজ করা মানুষদের গ্রেফতার না-করে আমাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।”
পুলিশি প্রহরা
শুক্রবার সকাল থেকেই দিল্লির একটা অংশ ঘিরে ফেলা হয় বাড়তি নিরাপত্তা বলয়ে। দিল্লির ট্রাফিক পুলিশের তরফে নির্দেশিকা জারি করে শুক্রবার কনট প্লেস, পটেল চক, তলস্তয় মার্গ এবং সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকাগুলি এড়িয়ে চলার ‘পরামর্শ’ দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিরাপত্তার কারণে বন্ধ রাখা হয় যন্তর মন্তরের আশপাশের মোট ১১টি মেট্রো স্টেশনও। দিল্লি পুলিশ প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে, এই কর্মসূচির অনুমতি নেই। জারি করা হয় ১৬৩ ধারাও। দিকে দিকে বসানো হয় ব্যারিকেডও। যদিও পুলিশের অনুমতি না-থাকলেও বিক্ষোভকারীরা পথে নামেন। ব্যারিকেড টপকে বা সরিয়ে যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় বিক্ষোভকারীদের।
আরও পড়ুন:
মুম্বইয়ে ককরোচেরা
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশকে ইস্তফা দিতে হবে, নইলে দেশ জুড়ে আবার আন্দোলনে নামবে তারা— গত সপ্তাহে এই ভাষাতেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল সিজেপি। এ-ও জানায়, যদি তাদের দাবি মানা না-হয়, তবে গাঁধী জয়ন্তীতে পথে নামবে তারা। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে জ্ঞানেশ ইস্তফা দেননি। আর তার পরেই ২ অক্টোবরের আন্দোলনের ঘোষণা করে সিজেপি। তারা জানায়, শুক্রবার মুম্বইয়ের শিবাজি পার্ক থেকে ‘জেল ভরো’ আন্দোলন হবে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শুক্রবার দুপুর থেকেই শিবাজি পার্কে জমায়েত শুরু হয়। যত সময় গড়ায়, আস্তে আস্তে পাল্টাতে থাকে শিবাজি পার্কের ছবি। নানা বয়সের মানুষের ভিড়ে ভরে যায় শিবাজি পার্ক। সিজেপি-র আন্দোলনকে সমর্থন জানালেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যুব সম্প্রদায় এবং পড়ুয়াদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পথে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: পিটিআই।
সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস-সহ নেতারা একে একে আসতে শুরু করেন শিবাজি পার্কে। শুধু সিজেপি সর্মথক বা সাধারণ মানুষ নয়, শুক্রবারের আন্দোলনে শামিল হতে দেখা যায় নসীরুদ্দীন শাহ, শবানা আজ়মির মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের। এসেছিলেন সঙ্গীত পরিচালক বিশাল দদলানীও। আন্দোলনের মঞ্চ থেকে ‘ভোটচুরির’ অভিযোগ নিয়ে সুর চড়ান শবানা। তিনি বলেন, ‘‘এটি আমাদের গণতন্ত্রের প্রশ্ন। এটি আমাদের অধিকারের প্রশ্ন। এটি আমাদের কণ্ঠস্বরের প্রশ্ন। ছোটবেলা থেকেই আমরা ভোট দিয়ে নিজেদের দাবিতে সরব হওয়ার কথা শিখেছি। কিন্তু যখন আমাদের এই মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় বা তাতে কারচুপি করা হয়, তখন এক জন দেশবাসী কী করবেন? স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিবাদের স্বর শোনা যাবে। জনগণের এই শক্তি এখন অপ্রতিরোধ্য।’’ এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন শবানা।
আন্দোনলের মঞ্চ থেকে দীপকে এই আন্দোলনকে আরও জোরদার করার বার্তা দেন। তাঁর কথায়, ‘‘সারা দেশ থেকে যখন মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দেবেন, তখন পুলিশের ব্যারিকেডও তাঁদের আটকানোর জন্য কম পড়বে।’’ একই সঙ্গে মুম্বই পুলিশের প্রশংসা করে দিল্লি পুলিশকে নিশানা করেছেন দীপকে।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পথে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: পিটিআই।
মুম্বই থেকে শুরু হওয়া ওই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে কলকাতা, বেঙ্গালুরু ও গোয়ায় পালিত হবে বলে জানিয়েছে সিজেপি। দীপকে জানিয়েছেন, চলতি মাসের শেষে তাঁরা ফের দিল্লিতে যন্তর মন্তরে আন্দোলনে নামবেন। জ্ঞানেশের ইস্তফা না-হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে, ঠিক যে ভাবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা না-হওয়া পর্যন্ত যন্তর মন্তর থেকে নিট-এর প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আন্দোলন চলেছিল।
কলকাতায় পথে বামেরা
দিল্লি ছাড়াও কলকাতাতেও জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে পথে নামে বামেরা। রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ থেকে গাঁধী মূর্তি পর্যন্ত মিছিল করে তারা। সেই মিছিল থেকে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী ‘জ্ঞানেশ হটাও, ভোটার ফেরাও’-এর ডাক দেন।