ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া সাহিল ওয়াকোডের মৃত্যুর পর দেওয়া বিবৃতির জন্য ক্ষমা চাইল আইআইটি বম্বে। শুধু তা-ই নয়, এই ঘটনায় যে অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ‘হেনস্থা’র অভিযোগ উঠেছিল, তাঁকে সাসপেন্ড (নিলম্বিত) করলেন কর্তৃপক্ষ।
সোমবার আইআইটি বম্বে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে তাদের পূর্ববর্তী বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। পোস্টে তারা লিখেছে, ‘‘সাহিলের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের পূর্ববর্তী বিবৃতিতে থাকা সব ধরনের মন্তব্যের জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’’ এ-ও জানিয়েছে, ‘‘সাহিলের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত চলছে। তাঁর মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, সেই ঘটনাবলির বিবরণ প্রকাশ করা উচিত হয়নি।’’
সাহিলের মৃত্যুর পর আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিলেন, শুক্রবার পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে ঢুকেছিলেন ওই ছাত্র। চ্যাটজিপিটি খুলে গোটা প্রশ্নপত্রটাই তাতে আপলোড করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে উত্তর সংগ্রহ করে লিখছিলেন। এই প্রক্রিয়ার সময় হলঘরে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপকের কাছে তিনি ধরা পড়ে যান। এর পর বিভাগীয় প্রধান তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু ওই ঘটনার কোনও প্রভাব ছাত্রের কেরিয়ারে পড়বে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন অধ্যাপকেরা, দাবি করেছিলেন কর্তৃপক্ষ। ঘটনাচক্রে, পরীক্ষার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হস্টেলের ঘর থেকে ওই পড়ুয়ার দেহ উদ্ধার করা হয়। তার পর থেকেই কর্তৃপক্ষের আচরণ এবং ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। ক্যাম্পাসে ধর্নায় বসেছেন বিক্ষোভকারীরা। লাগাতার প্রতিবাদের পর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হন কর্তৃপক্ষ।
সাহিলের মৃত্যুর পর ১৮ দফা দাবিকে সামনে রেখে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয় আইআইটি বম্বেতে। রবিবার এ নিয়ে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারা। বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়ার মধ্যে অন্যতম ছিল, প্রকাশ্যে সাহিলের ‘মানহানি’ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে ক্ষমা চাইতে হবে। সেই দাবি মেনে নিল আইআইটি বম্বে।
অন্য দিকে, পড়ুয়ামৃত্যুর ঘটনায় নাম জড়িয়েছে আইআইটি বম্বের অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার। ওই দিন পরীক্ষার হলে নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে জাত তুলে ছাত্রকে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। পড়ুয়াদের দাবির মধ্যে ছিল সূর্যনারায়ণের পদত্যাগ। সংবাদসংস্থা এএনআই-এ আইআইটি বম্বের ডিরেক্টর শিরীষ বি কেদারেকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, সূর্যনারায়ণকে সাসপেন্ড করা হচ্ছে। রবিবার রাতের বৈঠকেও ছিলেন শিরীষ। সেই বৈঠকেই পড়ুয়াদের দাবি সংবলিত সনদে সইও করেন তিনি।
পড়ুয়াদের আরও দাবি ছিল, সাহিলের মৃত্যুর একটা স্বাধীন তদন্ত করুন কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, এ মাসের শেষের মধ্যেই সেই তদন্তের অন্তর্বর্তী রিপোর্ট দিতে হবে। আর ১৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে চূড়ান্ত রিপোর্ট। আরও কয়েকটি দাবি রয়েছে পড়ুয়াদের। তার মধ্যে রয়েছে অধ্যাপকদের আচরণবিধি তৈরি, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, কাউন্সেলিং পদ্ধতির উন্নতি, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পড়ুয়াদের অধিকতর প্রতিনিধিত্ব-সহ আরও নানা বিষয়। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে পড়ুয়াদের। এই টাস্ক ফোর্সের কাজ হবে পড়ুয়াদের মানসিক যন্ত্রণা, অসুবিধা ইত্যাদি খতিয়ে দেখা। তার পরে সেগুলি কী ভাবে সমাধান করা যায়, তার জন্য সুপারিশ করা।
আরও পড়ুন:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাসপাতালে সারাদিনের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবিও তুলেছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের মতে, কোনও পড়ুয়া যদি কোনও মানসিক সমস্যায় ভোগেন বা এমন পরিস্থিতির তৈরি হয় যাতে কোনও পড়ুয়ার মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাঘাত ঘটে, তবে তিনি যেন তা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পান। পড়ুয়াদের দাবি, আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাবিগুলি পূরণের ব্যাপারে কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা লিখিত আকারে দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। শুধু তা-ই নয়, শান্তিপূর্ণ ভাবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে যাতে কোনও পদক্ষেপ করা না-হয়, তার আশ্বাসও দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের কথায়, এক মাসের মধ্যে যদি দাবিগুলি পূরণ করতে ব্যর্থ হন ডিরেক্টর, তবে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে জাতিবৈষম্যের অভিযোগে সরব হয়েছেন সাহিলের বাবা-মা। থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তফসিলি জাতি ও জনজাতি আইনে এফআইআর করেছে পুলিশ। বর্তমানে এই মামলার তদন্তভার মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখার হাতে।