নিঠারী হত্যাকাণ্ডে খালাস পাওয়া সুরেন্দ্র কোলির মৃত্যু নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠে গেল। আদৌ তিনি আত্মহত্যা করেছেন, না কি তাঁর মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও কারণ, জানতে চান তাঁর দাদা চন্দন কোলি। অভিযোগ দায়ের করে সুরেন্দ্রের মৃত্যুরহস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানালেন চন্দন। তাঁর বক্তব্য, সুরেন্দ্র আত্মহত্যা করেছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
গত শুক্রবার হরিদ্বারের এক চায়ের দোকান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় সুরেন্দ্রকে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, সুরেন্দ্র আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ। তার মধ্যেই এ বার হরিদ্বারের সপ্তর্ষি পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ দায়ের করলেন সুরেন্দ্রের দাদা। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে আত্মহত্যার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ জাগছে। তিনি বলেন, ‘‘শনিবার যখন আমরা সুরেন্দ্রকে দেখি, তখন তাঁর দেহ থেকে রক্ত বার হতে দেখেছিলাম। মুখে এবং নাকেও ছিল রক্তের দাগ।’’ হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চন্দন বলেন, ‘‘সব কিছু বিবেচনা করে আমাদের মনে হয়েছে ভাই হয়তো আত্মহত্যা করেনি।’’ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি করে তিনি জানান, সুরেন্দ্রের মৃত্যুতে কেউ দোষী হলে আইন মেনে যেন তাঁর কঠোর শাস্তি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই মৃত্যুর সঠিক কারণ স্পষ্ট হবে। সার্কেল অফিসার (নগর) শিশুপাল সিংহ নেগির কথায়, ‘‘প্রাথমিক তদন্ত চলছে। এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য আত্মহত্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে। আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। তদন্ত আরও এগোলে, তার পরই এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব।’’
তদন্তের প্রথম পর্যায়েই সপ্তর্ষি এলাকার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ঘটনাক্রম এবং সুরেন্দ্রের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা জানতে সেগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রায় দুই দশক কারাগারে কাটানোর পর গত বছরের নভেম্বরে জেল থেকে বার হন সুরেন্দ্র। জেলমুক্তির পর কখনও চেন্নাই, কখনও বেঙ্গালুরুতে গিয়েছেন তিনি। চলতি বছরের জুনে দিল্লিতেও যান। সেখানে কয়েক দিন দাদার সংসারে ছিলেন। তার পরে চলে যান উত্তরাখণ্ড। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রোশনাবাদে একটা থাকার জায়গার খোঁজ শুরু করেছিলেন সুরেন্দ্র। কিন্তু যেখানেই ঘরের জন্য খোঁজ করছিলেন, সেখানেই পরিচয়পত্র বা আধার কার্ড চাইতেন মালিকেরা। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ‘ভয়ে’ কখনওই নিজের আধার কার্ড কাউকে দেখাতে পারেননি সুরেন্দ্র। জেল থেকে বার হওয়ার পর থেকেই আর্থিক অনটনে ভুগতে থাকেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির খোঁজ করেছেন। রোশনাবাদেই দু’জায়গায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতেন। কিন্তু কোনও জায়গাতেই বেশি দিন টিকতে পারেননি। পরিচিত এবং পরিবারের দাবি, সব সময়ই পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় পেতেন সুরেন্দ্র। মৃত্যুর দিন তিনেক আগে হরিদ্বারে সপ্তর্ষি এলাকায় একটা চায়ের দোকান ভাড়া নেন। সেই দোকান থেকেই তাঁর দেহ উদ্ধার হয়েছে।
আরও পড়ুন:
২০০৫-২০০৬ সাল নাগাদ নিঠারিতে একের পর যুবতী, কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হতে শুরু করে। তার তদন্তেরই সূত্র ধরে ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিঠারির ব্যবসায়ী মণীন্দ্র সিংহ পান্ধেরের বাড়ির পিছনের এলাকা ও নালা থেকে উদ্ধার হয় ১৯টি কঙ্কাল এবং কিছু দেহাবশেষ। এই ঘটনায় গোটা দেশ জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও খুনের পর তাঁদের দেহের অংশ কেটে ফেলা হয়েছিল। কোলির কথিত স্বীকারোক্তিতে দেহের অংশ খাওয়ার দাবিও ছিল। তবে পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় ওই স্বীকারোক্তি প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। এই মামলায় পান্ধের এবং কোহলিকে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছিলেন সিবিআই আদালতের বিশেষ বিচারক পবন তিওয়ারি। এই ঘটনায় ১৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। তার মধ্যে ১৬টি মামলায় চার্জশিট দেয় সিবিআই। সুরেন্দ্র কোলির বিরুদ্ধে ১৩টি মামলায় বিচার চলেছিল। ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর এলাহাবাদ হাই কোর্ট ১২টি মামলায় তাঁকে খালাস করে। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টও ওই ১২টি মামলায় তাঁর খালাস বহাল রাখে।
একটি মামলায় তাঁর সাজা বহাল ছিল। সেটি ছিল রিম্পা হালদার হত্যা মামলা। ওই মামলায় ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছিল; পরে ২০১৫ সালে সেই মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। ২০২৫ সালে ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুরেন্দ্র কোলির দায়ের করা আবেদন গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকেও খালাস দেয়। ১১ নভেম্বর ২০২৫ তাঁকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রায় ১৯ বছর জেলে থাকার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে মুক্তি পান সুরেন্দ্র।