আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাল ভারতীয় নৌসেনা। গত সপ্তাহে একটি ইরানি ট্রলার অপহরণ করে নিয়েছিল জলদস্যুরা। বন্দি করা হয়েছিল জাহাজটির ২০ জন নাবিককে। জলদস্যুদের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘণ্টার এক অভিযানে বন্দি নাবিকদের সকলকেই উদ্ধার করেছে ভারতীয় নৌসেনা। অভিযানে সাহায্য করে ভারতীয় বায়ুসেনাও।
ইরানি মাছ ধরার ট্রলার ‘আজিনি’ হাইজ্যাক (অপহরণ) হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে গত রবিবার। সংবাদসংস্থা এপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব সোমালিয়ার দুই উপকূলীয় শহর বন্দর বায়লা ও হাফুনের মাঝামাঝি কোনও এলাকা থেকে ট্রলারটি অপহরণ করেছিল ১২ জন জলদস্যুর একটি দল। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছিল, ট্রলারটিতে মোট ২৩ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২১ জন ছিলেন ইরানি নাবিক এবং দু’জন সোমালিয়ার নিরাপত্তারক্ষী। তবে আরব সাগরের বুকে নৌসেনার অভিযানের পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ জানান, ট্রলারটিতে ২০ জন নাবিক ছিলেন এবং তাঁদের সকলকেই উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমালিয়া অঞ্চলে জলদস্যুদের পুনরুত্থানের মূল কারণ ইরান-ইজ়রায়েলের যুদ্ধ। এর আগে ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত জলদস্যুদের উৎপাতে সোমালিয়ার উপকূলবর্তী এলাকার জলপথে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছিল। কিন্তু সোমালিয়া সরকারের তৎপরতায় জলদস্যুদের দমন করা সম্ভব হয়েছিল। চলতি বছরে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে তারা। সম্প্রতি এডেন উপসাগর এবং সংলগ্ন আরব সাগর দিয়ে চলাচল করা একাধিক পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে জলদস্যুরা। মাছ ধরার এই ট্রলারটিও সেই উদ্দেশ্যেই তারা অপহরণ করেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
‘মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার ইন্ডিয়ান ওশান’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ট্রলারটি অপহরণের পর সেটি নিয়ে পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির সমুদ্রপথের দিকেই এগোচ্ছিল জলদস্যুরা। ওই ট্রলারটিকে ব্যবহার করে পণ্যবাহী জাহাজগুলিতে হামলার ছক কষেছিল তারা। সংবাদসংস্থা এপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ট্রলার ‘আজিনি’-কে একটি ‘ভাসমান ঘাঁটি’ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল জলদস্যুদের। এই মর্মে একটি সতর্কবার্তাও জারি করেছিল আন্তর্জাতিক জলপথ নজরদারি সংস্থা।
আরও পড়ুন:
অপহৃত ওই ট্রলারটি থেকে এ বার বন্দি নাবিকদের উদ্ধার করল ভারতীয় নৌসেনা। ৪৮ ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানের বিষয়ে বিশদ তথ্য প্রকাশ্যে না এলেও জলদস্যুদের বিরুদ্ধে সাফল্যের জন্য নৌসেনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ। সমাজমাধ্যমে ওই অভিযানের বেশ কিছু ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, সমুদ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা রাখার ক্ষেত্রে ভারত নিজ দায়িত্বে অবিচল। ট্রলারটিকে যে ভাবে দ্রুত চিহ্নিত করে সেটির পথ আটকানো হয়েছে এবং বন্দি নাবিকদের উদ্ধার করা হয়েছে, তারও প্রশংসা করেন মন্ত্রী।
উল্লেখ্য গত কয়েক মাসে এডেন উপসাগর এবং পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। গত এপ্রিল থেকে অগস্টের মধ্যে অন্তত ছ’টি বাণিজ্যিক জাহাজ জলদস্যুদের হাতে অপহৃত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে হামলা হয়েছে সোমালিয়ার উপকূল থেকে অনেকটা দূরে। যেমন ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা উপকূল থেকে মাত্র ২৫০ কিলোমিটার পূর্বে তেলবাহী একটি ট্যাঙ্কার জলদস্যুদের হামলার শিকার হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে পালাউ (পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র) পতাকাবাহী পেট্রোলিয়াম ট্যাঙ্কার এম টি অনার ২৫-এর পাঁচ নাবিককে হত্যা করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। নিহতদের মধ্যে কলকাতার বাসিন্দা মোহম্মদ তানভীর উজ জমানও ছিলেন।
তানভীরদের ওই জাহাজে তিনি ছাড়াও ১৬ জন ছিলেন। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে ১৮ হাজার ৫০০ ব্যারেল তেল পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। মাঝপথেই জলদস্যুদের আক্রমণ। হামলায় কলকাতার বাসিন্দা তানভীর-সহ মায়নমারের এক জন এবং পাকিস্তানের তিন জন নাগরিককে হত্যা করে জলদস্যুরা। জখম হন আরও এক ভারতীয় এবং তিন পাকিস্তানি।