গত দু’বছরে সম্পর্কের শৈত্য অনেকটাই কেটেছে। কিছু সমস্যা এখনও রয়েছে। রয়েছে মতপার্থক্যও। তবে ভারত-চিন উভয়েই চাইছে নিজেদের সেই মতপার্থক্য যেন কখনওই বিবাদে পরিণত না হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উভয়েই এ বিষয়ে একমত।
গলওয়ান সংঘাতের পরে এই প্রথম বার ভারত সফরে এসেছেন জিনপিং। দিল্লির ব্রিক্স সম্মেলনের পাশাপাশি এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের দিকেও নজর ছিল গোটা বিশ্বের। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে চিন যে ভাবে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বে আগ্রহ দেখিয়েছে, তাতে এই বৈঠকের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। শনিবারের বৈঠকেও ভারতের সঙ্গে ফের এক বার ‘বন্ধুত্বের’ বার্তা দিলেন শি।
চিনা প্রেসিডেন্ট চাইছেন, একে অপরের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করুক ভারত এবং চিন। প্রধানমন্ত্রীকে সেই প্রস্তাবই দিয়েছেন তিনি। ব্রিক্সের সার্বিক বিকাশের জন্যও দিল্লি এবং বেজিঙের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শি। দুই রাষ্ট্রনেতাই মনে করেন দিল্লি এবং বেজিঙের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা দরকার। তবে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভাল রাখতে গেলে যে সীমান্তে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, তা-ও এ দিন চিনা প্রেসিডেন্টকে বুঝিয়ে দেন মোদী।
গলওয়ান সংঘাতের পর থেকে এই নিয়ে তৃতীয় বার মুখোমুখি বসলেন মোদী-শি। ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজ়ানে, ২০২৫ সালে চিনের তিয়ানজিনে এবং এ বারে দিল্লিতে। গলওয়ান সংঘাতের জেরে দুই দেশের সম্পর্ক যে তলানিতে পৌঁছেছিল, গত তিনটি বৈঠকে তা উন্নত করার চেষ্টা দেখা গিয়েছে দু’দেশেরই। দু’বছর আগে কাজ়ানের বৈঠকেই মোদী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং সংবেদনশীলতা। এ দিনও শি-কে ফের তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। মোদী জানিয়েছেন, দু’দেশকেই পারস্পরিক স্বার্থ, শ্রদ্ধা এবং সংবেদনশীলতা— এই তিনটি বিষয়ের উপরে জোর দিতে হবে।
আমেরিকা-চিন শুল্ক-সংঘাতের সময় থেকে দিল্লির সঙ্গে কৌশলগত বন্ধুত্বে আরও বেশি করে আগ্রহ দেখিয়েছে বেজিং। বিভিন্ন সময়ে এশিয়ার দুই শক্তিধরের ক্ষমতার কথা বোঝাতে গিয়ে ‘হাতি’ এবং ‘ড্রাগন’-এর উপমা ব্যবহার করেছে তারা। বেজিং সাম্প্রতিক অতীতে বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে, ‘ড্রাগন’ এবং ‘হাতির’ মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি গত বছর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে পাঠানো চিঠিতেও ‘ড্রাগন-হাতি’ নাচের কথা উল্লেখ করেছিল চিন। বলেছিল, দু’দেশের মানুষের স্বার্থেই ‘হাতি’ এবং ‘ড্রাগনের’ একসঙ্গে নাচা দরকার।
এ বার মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও ফের একবার কৌশলগত সাফল্যের লক্ষ্যে যৌথ ভাবে কাজ করার আহ্বান জানালেন শি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন মোদীও। তবে সীমান্তে শান্তি থাকাটাও যে জরুরি, তা-ও বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন সংঘাত চলছে, তখন মোদী-শি বৈঠক দু’দেশের সম্পর্কে নতুন কোনও সমীকরণের দিশা দেখাতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
ব্রিক্সের ঘোষণাপত্র
১১ দেশের এই আন্তর্জাতিক জোটের বৈঠকে এ দিন সর্বসম্মতিক্রমে যৌথ ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। তাতে নাম না-করে নিন্দা জানানো হয় মার্কিন শুল্কনীতির। গত এক বছরে বিভিন্ন দেশের উপরে একতরফা ভাবে শুল্ক চাপায় আমেরিকা (পরে তা ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা করে আমেরিকারই সুপ্রিম কোর্ট)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওই শুল্কনীতি বার বার সমালোচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ব্রিক্সের ঘোষণাপত্র একতরফা শুল্কের প্রসঙ্গে কোনও দেশের নামোল্লেখ না করলেও নিশানায় যে মার্কিন শুল্কনীতিই, তা স্পষ্ট।
একটি দেশের উপরে অন্য দেশের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর বিরোধিতা করেছে ব্রিক্স। এ ক্ষেত্রেও ঘোষণাপত্র কোনও দেশের নামোল্লেখ করেনি ব্রিক্স। তবে নিশানায় ছিল আমেরিকাই। ইরানের (ব্রিক্সের অন্যতম সদস্য রাষ্ট্র) বিরুদ্ধে সম্প্রতি এমন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে আমেরিকা। এমনকি ইরানের সঙ্গে কেউ কোনও চুক্তি করলে তাদের উপরেও নিষেধাজ্ঞা চাপানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ট্রাম্পের প্রশাসন। ব্রিক্স ঘোষণাপত্রে জানিয়েছে, এই ধরনের পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়ন, খাদ্যসুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের উপরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা।
দিল্লির ব্রিক্স সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে যুদ্ধের বিরুদ্ধেও বার্তা দেওয়া হয়েছে। আলোচনা এবং কূটনৈতিক মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার কথা উল্লেখ থাকলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে আলাদা ভাবে কিছু উল্লেখ নেই। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে গত বছরের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলারও নিন্দা জানিয়েছে ব্রিক্স। ভারত শুরু থেকেই বলে আসছে, পাকিস্তান থেকে জঙ্গিরা এসে ওই হামলা করেছিল। আবার চিনের মিত্রশক্তি হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান। সে ক্ষেত্রে পহেলগাঁও হামলার নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণাপত্রে শি-র স্বাক্ষর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘোষণাপত্রে গাজ়া ভূখণ্ডের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগপ্রকাশ করেছে ব্রিক্স। রাষ্ট্রপুঞ্জে প্যালেস্টাইনের পূর্ণ সদস্যপদের দাবিকেও সমর্থন জানিয়েছে এই আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী।
মোদীর বার্তা
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হওয়ার লক্ষ্যে বহু বছর ধরে কূটনৈতিক স্তরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। দাবি তুলেছে সংস্কারেরও। এ বার দিল্লিতে ব্রিক্স সম্মেলন থেকে ফের এক বার তা স্পষ্ট করে নরেন্দ্র মোদী। নিরাপত্তা পরিষদে অবিলম্বে সংস্কারের ডাক দিলেন তিনি। মোদীর কথায়, “নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে আর দেরি করা চলবে না।”
প্রধানমন্ত্রীর মতে, গত দুই দশকে ‘ব্রিক্স’ যথেষ্ট সফল হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছে। এই আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী আগামী দিনে আরও বিকশিত হবে বলে মনে করেন মোদী। আন্তর্জাতিক এই গোষ্ঠীর অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি বলেন, “আজ ব্রিক্স আরও পরিণত হওয়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা কারও বিরুদ্ধে নই। বরং, আমরা সকলেকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।”
এ দিনের বক্তৃতায় দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিকেও বার্তা দেন মোদী। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি যাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়, তা নিয়ে সরব হন তিনি। এ প্রসঙ্গে মন্তব্যের সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চের নীতি নির্ধারণ কাঠামোকে একটি পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, এই পিরামিডের মাথায় যে দেশগুলি রয়েছে, শুধু তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। আর পিরামিডের নীচের দিকে থাকা দেশগুলি সেই সিদ্ধান্ত এবং নীতির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে সঙ্কট বেশি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দেশগুলি থেকে যায় পিছনের সারিতে।”