দু’বছর আগে জমি জবরদখলের অভিযোগে প্রাক্তন ক্রিকেটার ইউসুফ পঠানকে নোটিস পাঠিয়েছিল বডোদরা প্রশাসন। তখন তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার সাংসদ। দু’মাস আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের সঙ্গী হয়েছেন তিনি। নাম লিখিয়েছেন কুলগোত্রহীন দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে। কেন্দ্রের শাসক জোট এনডিএ-কে সমর্থন করার কথা বলেছেন ইউসুফ-সহ তৃণমূলত্যাগী ২০ সাংসদ। আর তার পরেই বডোদরায় ইউসুফের বাড়ি-লাগোয়া সেই বিতর্কিত জমি তাঁকে উপহার দেওয়ার কথা ঘোষণা করল গুজরাতের বিজেপি সরকার।
যে জমি নিয়ে বিতর্ক, তার মাপ ৯৭৮ বর্গমিটার। বডোদরা পুরসভার অভিযোগ, তাদের ওই জমিটি ইউসুফ পাঁচিল তুলে জবরদখল করেছেন। এ নিয়ে দু’পক্ষের চাপানউতর দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। ২০১২ সালে ইউসুফ পুরসভার কাছে আবেদন করেছিলেন, জমিটি নিলাম না-করে তাঁকে ৯৯ বছরের লিজে দেওয়া হোক। কারণ, তাঁদের পারিবারিক বাংলো লাগোয়া জমিটি অন্য কারও হাতে গেলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। ২০১২ সালের মার্চ মাসেই ভারতের হয়ে শেষ একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন ইউসুফ। তার পর ২০১৭ পর্যন্ত খেলেছেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে। ফলে তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্ন একটা ছিলই। সেই সময় বিজেপি পরিচালিত বডোদরা পুরসভা ইউসুফের প্রস্তাব মেনেও নেয়। ৫৭, ২৭০ টাকা প্রতি বর্গমিটার দরে মোট ৫ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা জমা দিতে বলা হয় ইউসুফকে।
কিন্তু নিলাম না করে এ ভাবে কোনও এক জনকে জমি দিতে গেলে রাজ্য সরকারের সম্মতির প্রয়োজন হয়। ২০১৪-র জুনে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর এই প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। এর পরেই পুরসভা অভিযোগ করে, ইউসুফ জমিটির চারপাশে পাঁচিল তুলে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।
২০২৪-এর মে মাসে বহরমপুরের পাঁচ বারের কংগ্রেস সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরীকে হারিয়ে লোকসভায় যান ইউসুফ পঠান। জুন মাসেই তাঁকে জমি খালি করতে বলে নোটিস ধরায় বডোদরা পুরসভা। গুজরাত হাই কোর্টে মামলা করেন ইউসুফ। ২০২৫-এর অগস্টে আদালত রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। ইউসুফ ডিভিশন বেঞ্চে যান। গত জুন মাসের ১৪ তারিখ লোকসভায় তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকেই হাওয়া অন্য দিকে ঘুরতে শুরু করে। ৩১ অগস্ট হাই কোর্ট থেকে মামলা প্রত্যাহার করে নেন ইউসুফ। মঙ্গলবার জানা গেল, মোট ৯৭৮ বর্গমিটার জমির মধ্যে ৫০০ বর্গমিটার জমি তাঁকে উপহার হিসেবে দিচ্ছে পুরসভা। বাকি ৪৭৮ বর্গমিটার জমির জন্য বাজারদরের ৫৫ শতাংশ টাকা দিলেই মালিকানা পেয়ে যাবেন ইউসুফ। বডোদরা পুরসভার কমিশনার অরুণ মহেশ বাবু জানিয়েছেন, ওই জমি চেয়ে ইউসুফ যে আবেদন করেছিলেন, রাজ্য সরকার তা মঞ্জুর করেছে। পুরসভার স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং সাধারণ সভার বৈঠকে আলোচনা করে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
সূত্রের খবর, ইউসুফের আবেদন মঞ্জুর করে সরকারি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে গত ১৩ অগস্ট। সে মাসেরই ২৯ তারিখ সেটি বডোদরা পুরসভায় পাঠানো হয়। সরকারি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নিলাম বহির্ভূত ভাবে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নজির হিসেবে গণ্য করা যাবে না। প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ ঘিরে রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় স্তরেও বিতর্ক রয়েছে। পুরসভা দখলদারি সরিয়ে জমির নিলাম করুক, এই দাবিতে অনেক দিন ধরেই সরব বিশ্বামিত্রি বঁচাও সমিতি। সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ইউসুফ গত ১৪ বছর ধরে জমিটি দখল করে আছেন। এই ধরনের জমির পুরসভা-নির্ধারিত ভাড়া প্রতিদিন ১৫ টাকা প্রতি বর্গমিটার। সেই হিসেবে ইউসুফের কাছে পুরসভার পাওনা প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে পুরসভার এক আধিকারিক বলেন, জমি ‘অবৈধ ভাবে’ দখল রাখার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করার নির্দেশ পুরসভায় আসেনি।