আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে সতর্ক নজর রাখছে নয়াদিল্লি। তবে আশার থেকে আশঙ্কাই বেশি ভারতের। নির্বাচনের পরে আমেরিকান কংগ্রেসের দু’কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকুক অথবা ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পাক (যার সম্ভাবনাই বেশি), ভারতের কাছে বিষয়টি ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘের’ সমান। কূটনৈতিক শিবিরের মতে, হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভস এবং সেনেটে কার নিয়ন্ত্রণ বাড়ল, সেটাই ভারতের একমাত্র চিন্তার কারণ— বিষয়টি এতটাই সরল নয়। বরং মোদী সরকারের চিন্তা অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরিবর্তনের পরে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এবং সিদ্ধান্তগুলি কী ভাবে এবং কোন পথে পরিচালিত হবে, তার উপর।
আমেরিকার কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনের কর, ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতি যেমন চলছে তেমনই চলবে। অন্য দিকে, ডেমোক্র্যাটরা কোনও একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের উপর নজরদারি বাড়তে পারে এবং নতুন আইন পাশ করা কঠিন হতে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই ট্রাম্পের শুল্কনীতি বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ এই মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্টের ভিটো দেওয়া এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবে না।
কূটনৈতিক শিবির বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত যা সমীক্ষা সামনে এসেছে, তাতে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের দু’টি কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার কথা। কিন্তু আশঙ্কা, দেশের ভিতরেই দুর্বল হয়ে যাওয়া ট্রাম্প বিদেশনীতির প্রশ্নে বেপরোয়া হতে পারেন। কংগ্রেসের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে গেলেও বিদেশনীতিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনও বাধা নেই। রাজনৈতিক ভাবে নিজের ইনিংসের শেষ দিকে এসে ট্রাম্পের কোনও পিছুটান আর থাকবে না। ২০২৯-এ প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে তাঁর ধারাবাহিক খামখেয়ালিপনা দেখিয়ে যাবেন, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে কূটনৈতিক শিবিরের মতে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লেও তা ভারতের জন্য খুব সুখের নয়। কারণ ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহ্যগত ভাবেই প্রবল রাশিয়া-বিরোধী। মস্কো থেকে অশোধিত তেল কেনার প্রশ্নে তারা নয়াদিল্লির পায়ে বেড়ি পরাতে চাইবে। মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, জো বাইডেনের জমানাতেই প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত এক মাত্র, রাশিয়া-বিরোধী চতুর্দেশীয় অক্ষ কোয়াডের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বৈঠক হয়েছিল। রাশিয়ার পরিবর্তে ভেনেজ়ুয়ালা থেকে অশোধিত তেল কেনার জন্য তাদের পক্ষ থেকে ভারতের উপর চাপ বাড়বে।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তি গত দু’বছর যে ভাবে ঝুলে রয়েছে, ট্রাম্পের শাসনকালের শেষ দু’বছরেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হবে বলে মনে হচ্ছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়। কিন্তু তার ভিত্তিতে এখনও কোনও চুক্তি হয়নি। গত কাল হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে ভারতকে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যসঙ্গী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঠিকই, একই সঙ্গে এ-ও বলা হয়েছে, শুল্ককে হাতিয়ার করে দর কষাকষির মাধ্যমেই সমঝোতা করেছে আমেরিকা।
ভারতের পক্ষ বাণিজ্যচুক্তির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি হল, এমন এক আমেরিকান নীতিব্যবস্থা, যেখানে শুল্কের অনিশ্চয়তা কমবে, সে দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় থাকবে এবং প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়বে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এর কোনওটিই নিশ্চিত হবে না, এমনটা মনে করছে না নয়াদিল্লি। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রকের সংসদীয় কমিটির তরফে সরকারকে দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমুদ্রপণ্যের প্রতিনিধি, মৎস্যজীবী, চর্মশিল্পের কর্তা ও প্রতিনিধি, সুতি ও পাট-সহ অন্য বস্ত্রশিল্প, গহনা, রত্ন, রসায়ন, ইস্পাত, পেট্রকেমিক্যাল, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা আমেরিকার সাম্প্রতিক শুল্ক প্রবণতায় শঙ্কিত। রিপোর্টে উল্লেখ, কমিটি প্রস্তাব করেছে, ভারতের স্বার্থ যাতে ন্যায্য ভাবে সুরক্ষিত থাকে তা নিশ্চিত করে তবেই সরকার প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তিতে অগ্রসর হোক। ডেমোক্র্যাটের দাপট বাড়ুক বা ট্রাম্প স্বমহিমায় থাকুন— চুক্তিকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অংশের উদ্বেগ কমবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।