বিরোধীরা ক্রমাগত অভিযোগ করছেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপিকে ‘ভোট চুরি’ করে জয়ের রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এর পাল্টা পথে নেমে বিজেপি নেতৃত্বের হাতিয়ার সেই ‘অনুপ্রবেশকারী’। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে সোমবার হায়দরাবাদে দাবি করেছিলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় দেশে প্রায় তিন কোটি বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর এই দাবির প্রেক্ষিতেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে এসআইআর প্রক্রিয়ায় (রাজ্য নির্বাচন কমিশনগুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী) মোট চিহ্নিত বিদেশির সংখ্যা ১৬৪০ এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশন যেখানে বিদেশি খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট ভাবে কিছু জানায়নি, সেখানে শাহ কিসের ভিত্তিতে তিন কোটি সংখ্যাটি পেলেন? একই সঙ্গে তাঁদের আরও দাবি, সেই অনুপ্রবেশকারীরা আদতে কোন দেশের বাসিন্দা, তা-ও প্রকাশ্যে আনা হোক।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করছে, কংগ্রেস, তৃণমূলের মতো দলগুলি সংখ্যালঘু তোষণ করে বাংলাদেশি ভোটারদের সাহায্য নিয়ে নির্বাচনে ফায়দা তুলছে। এসআইআর প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, সেই সময়ে বিহার-পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বিজেপি নেতৃত্ব বার বার অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং পরবর্তী ধাপে প্রতিবেশী দেশে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে দাবি করে এসেছেন। অমিত শাহের ভাষায়, ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট। এর মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ‘পুশব্যাক’ও করেছে কেন্দ্র। সেই সব ক্ষেত্রে আবার কয়েক জনকে আদালতের নির্দেশে ফিরিয়ে আনতেও হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, যাদের ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে, তাদের নাম এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে, এমনও স্পষ্ট নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বিরোধীদের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের মোকাবিলায় বিজেপি গত কাল হায়দরাবাদে যে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ মিছিল, সেখানে শাহ দাবি করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় মোট ১৩ কোটির ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে এখনও পর্যন্ত বাদ গিয়েছে। যাদের মধ্যে ৬.২৫ কোটি ভোটারের ঠিকানা বদল হয়েছে। মারা গিয়েছেন প্রায় ৩ কোটি ভোটার। একাধিক ভোটার কার্ড রয়েছে প্রায় ১ কোটি ভোটারের। বাকি প্রায় ৩ কোটি ভোটারের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই অস্তিত্বহীন ভোটারদের সবাইকে গত কাল বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেন অমিত শাহ। তাঁর অভিযোগ, ওই বাংলাদেশি ভোটারদের বাঁচাতেই কংগ্রেস এ ভাবে পথে নেমেছে।
কংগ্রেসের লোকসভা সাংসদ মণীশ তিওয়ারির পাল্টা প্রশ্ন, ওই ৩ কোটি ভোটার, যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাঁরা সকলেই বাংলাদেশি— এমন তথ্য কোথা থেকে পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! তাই যদি হয়, তবে ওই তিন কোটির নামের তালিকা ও তাঁরা কোন দেশ থেকে এসে ভারতে রয়েছেন, তা প্রকাশ্যে আনার দাবি করেছেন মণীশ। কংগ্রেসের বক্তব্য, এসআইআর করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণ। কিন্তু দেশের বড় অংশে এসআইআর হওয়া সত্ত্বেও, কত বিদেশি ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় পাওয়া গিয়েছে, তার কোনও তথ্য সরকারি ভাবে দেয়নি কমিশন। উপরন্তু সম্প্রতি ছ’টি রাজ্যের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে কর্নাটক, ঝাড়খণ্ড, কেরল, মেঘালয়, গোয়া, মিজ়োরামের মতো রাজ্যে কেবলমাত্র ১,৬৪০ জন বিদেশির নাম ভোটার তালিকায় চিহ্নিতকরা গিয়েছে।
ছ’টি রাজ্যের মধ্যে সব থেকে বেশি বিদেশি নাগরিক চিহ্নিত হয়েছে কর্নাটকে (৭১৬ জন)। যাঁদের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচশো জনই নেপালের বাসিন্দা। এ ছাড়া আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েক জন নাগরিক রয়েছেন। ঝাড়খণ্ডে গোটা সাঁওতাল পরগনা বাংলাদেশিতে ভরে গিয়েছে বলে বিজেপি অভিযোগ করলেও ওই রাজ্যে মাত্র তিন জন বিদেশি নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় পাওয়া গিয়েছে। ওই তিন জনই আফগানিস্তানের। মেঘালয়ে যে দু’জন বিদেশি নাগরিকের নাম তালিকায় ছিল, তারা দু’জনই নেপালের। কংগ্রেসের বক্তব্য, সব বিদেশি নাগরিক যে বাংলাদেশি নন, তা কমিশনের দেওয়া তথ্য থেকেই স্পষ্ট। তা হলে প্রশ্ন, তিন কোটির হিসেব শাহ কোথা থেকে পেলেন? মণীশের বক্তব্য, দেশে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। যদি ওই সংখ্যায়অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে, তা হলে সেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা।
পশ্চিমবঙ্গে এখন পর্যন্ত এসআইআর প্রক্রিয়ায় অন্তত ১২ লক্ষের ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি। শাহি-তত্ত্ব মানলে এরা সকলেই ‘বাংলাদেশি’। এ দিকে বহু ব্যক্তির আবেদন এখনও বিচারাধীন। তা সত্ত্বেও সমস্ত সন্দেহভাজনকে শাহ কী ভাবে বাংলাদেশি বলে দিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষের কটাক্ষ, ‘‘উল্টোপাল্টা সংখ্যা না বলে, কেন এই অনুপ্রবেশকারীদের এ দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হল, তার জবাব আগে দিন।’’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিয়ম বলছে, ভারতে কোনও ব্যক্তিকে বিদেশি হিসাবে ঘোষণা করার নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। সাধারণত এসআইআরের পরে যাঁদের বিদেশি বলে কমিশন সন্দেহ করছে, তাঁদের নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে থাকে কমিশন। এর পর প্রশাসন যদি মনে করেন ওই ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে বিষয়টি ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়।পরবর্তী ধাপে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল অভিযুক্তকে নোটিস জারি দেয়। শুনানির সময়ে নাগরিকত্বের পক্ষে প্রমাণ্য নথি জমা দিতে হয় সেই ব্যক্তিকে। যার ভিত্তিতে রায় দিয়ে থাকে ট্রাইবুনাল। রায় পক্ষে না গেলে হাই কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন কোনও ব্যক্তি।বিরোধীদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে শাহ তা হলে কী ভাবে এমন মন্তব্য করতে পারেন!