স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ভাষণে নতুন সংকল্পের বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বুঝিয়ে দিলেন, আগামী পাঁচ-সাত বছর দেশের প্রগতির জন্য, ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যপূরণের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। সেই লক্ষ্যপূরণের জন্য দেশের ‘যুবশক্তি’-কে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানালেন মোদী। ঘোষণা করলেন ‘শক্তির সপ্তধারার’ কথাও। প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাস, এই ‘সপ্তধারার’ উপর ভর করেই দেশ এগিয়ে যাবে ‘বিকশিত ভারতের’ পথে।
শনিবার লালকেল্লা থেকে প্রায় ৭৫ মিনিট ধরে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতা দিবসে তাঁর গত চার বছরের ভাষণে এটিই ছিল সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত। তবে এর মধ্যেও বার বার দেশের তরুণ প্রজন্মকে ছোঁয়ার চেষ্টা করলেন মোদী। বোঝালেন, মাওবাদ-মনোভাবাপন্নদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ‘শক্তির সপ্তধারার’ পথে বিকাশ, ডিজিটাল জনগণনা, কৃত্রিম মেধা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের তরুণদের উপরেই ভরসা রাখছেন তিনি। দিল্লিতে সাম্প্রতিক ছাত্রবিক্ষোভের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ দিন প্রথমে রাজঘাটে মহাত্মা গাঁধীর সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মোদী। তার পর লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই সময় পরিবেশিত হয় জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’। লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এই প্রথম গানটি পরিবেশিত হল। তার পর গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গীত। এ দিনের ভাষণে দেশের আগামীর রূপরেখারও আভাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “এই শতাব্দীর এক চতুর্থাংশ কেটে গিয়েছে। পরবর্তী এক চতুর্থাংশ আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন আমাদের আর থেমে থাকা যাবে না। আমাদের লক্ষ্য স্থির। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। তার জন্য আমাদের কর্মসংস্কৃতি, চিন্তাধারা এবং কাজের গতি বদলাতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “গত পাঁচ-সাত দশকে যে কাজ হয়নি, তা-ই আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে করতে হবে।” এই লক্ষ্যপূরণের জন্য দেশের যুবশক্তি, নারীশক্তি, কৃষক এবং শ্রমিক— সকলকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে চান তিনি। এই নতুন গতির কথা বলার সময়ে ‘শক্তির সপ্তধারার’ ঘোষণা করেন তিনি। এই সাত ধারায় সংস্কার হলেই দেশ উন্নতির পথে এগোবে বলে মনে করেন তিনি। এই ‘সপ্তধারার’ মধ্যে রয়েছে— উৎপাদন শক্তি, কৃষি, প্রযুক্তি, গতিশক্তি (উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা), আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব ও সমুদ্রবান্ধব অর্থনীতি (গ্রিন ইকোনমি ও ব্লু ইকোনমি) এবং দেশের মেধা ও কৃষ্টি শক্তি (সফ্ট পাওয়ার)।
মোদীর ‘সপ্তধারা’
প্রথম ধারা: দেশের উৎপাদন খাতে আরও গতি আনার ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, আগামী দিনে দেশের বিকাশে ‘চালিকাশক্তি’ হতে চলেছে এই উৎপাদন ক্ষেত্র। মোদী বলেন, “যন্ত্রাংশের পাশাপাশি আমাদের সম্পূর্ণ পণ্যও (তৈরি করা) প্রয়োজন।” দেশীয় পণ্য যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়েও জোর দিতে বলেন তিনি। দেশের উৎপাদন ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িতদের পণ্যের গুণমান, পরিমাণ এবং খরচের উপরে জোর দিতে বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্যাকেজিং যেন লোকজনের নজর কাড়ে। আমাদের নির্ভুল কাজ যেন আমাদের পরিচয় হয়ে ওঠে।”
দ্বিতীয় ধারা: কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণেও সংস্কারের বার্তা দেন মোদী। তিনি বলেন, “আমাদের কৃষকদের জন্য এখন গোটা বিশ্বের বাজার খোলা। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির জন্য আমরা একটি বিশাল বাজার পেয়ে গিয়েছি। সেই বাজার আমাদের ধরতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাদ্য, ফল, মশলা, সব্জিকে বিশ্বব্যাপী ‘ব্র্যান্ডে’ পরিণত করতে হবে।”
তৃতীয় ধারা: প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভাষণে এ দিন উঠে আসে প্রযুক্তি ক্ষেত্রের কথাও। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার, রোবোটিক্স এবং নতুন প্রযুক্তির উপরে জোর দেন তিনি। মোদীর কথায় বর্তমান যুগ হল ‘ডেটা সেন্টার, রোবোটিক্স এবং নতুন প্রযুক্তির যুগ’। মোদী বলেন, “আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যেন ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’-র ৬জি পরিষেবা সারা দেশে পৌঁছে যায়।” তাঁর লক্ষ্য, দেশ যেন আগামী দিনে টেলিযোগাযোগ-প্রযুক্তিতে লম্বা লাফ দেয়। সেই কারণে প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও ব্যাপক সংস্কার করতে হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থ ধারা: ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যপূরণের জন্য দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা দরকার বলে মনে করেন মোদী। দেশের বাণিজ্যে গতি আনতে নতুন সড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়ের উপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর মতে, রেল যোগাযোগ এবং বন্দর-কেন্দ্রিক উন্নয়নেও আরও জোর দেওয়া দরকার।
পঞ্চম ধারা: দেশকে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ‘আত্মনির্ভর’ করার চেষ্টা আগেই শুরু করেছে কেন্দ্র। সেই লক্ষ্যের কথা শনিবার লালকেল্লা থেকে ফের স্মরণ করিয়ে দেন মোদী। ড্রোন এবং কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তির উপরে বিশেষ ভাবে জোর দেন তিনি। মোদী বলেন, “প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের আত্মনির্ভর হতেই হবে। ভারত যেন বিশ্বের কাছে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একটি বাজার হয়ে না থাকে।”
আরও পড়ুন:
ষষ্ঠ ধারা: পরিবেশবান্ধব ও সমুদ্রবান্ধব অর্থনীতির উপরেও জোর দিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে ভারতের লক্ষ্যও ফের এক বার স্পষ্ট করেন তিনি। জানান, গ্রিন হাইড্রোজেন, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন এবং শক্তি সঞ্চয়ে ভারত যাতে গোটা বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, সমুদ্রবান্ধব অর্থনীতিও দেশে সামুদ্রিক প্রযুক্তি, উপকূলীয় পর্যটন এবং মৎস্যচাষে সুবিধা করে দেবে। মোদীর কথায়, “এগুলি দেশের অগ্রগতির জন্য নতুন দিশা দেখাবে।”
সপ্তম ধারা: দেশের ‘সফ্ট পাওয়ার’ (মেধা ও কৃষ্টি শক্তি)-এর গুরুত্ব আগেও বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরছেন প্রধানমন্ত্রী। এ দিন দেশের মেধা ও কৃষ্টি শক্তির উপরে জোর দেন তিনি। জোর দেন যোগব্যায়াম, হস্তশিল্প, চলচ্চিত্র, গেমিং, অ্যানিমেশন, ডিজিটাল কনটেন্ট-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপরে।
এই সাত দফা সংস্কারের পাশাপাশি মাওবাদ-প্রসঙ্গেও দেশবাসীকে সতর্ক করে দেন মোদী। বস্তুত, গত মার্চের মধ্যে দেশ থেকে মাওবাদ-নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল কেন্দ্র। সম্প্রতি সংসদে কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশে কোনও জেলায় এখন আর মাওবাদীদের উপদ্রব নেই। তবে একটি জেলা এখনও ‘উদ্বেগজনক’ রয়ে গিয়েছে। মাওবাদীরা যাতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না-পারে, তার জন্য আরও কিছু সময় নজরদারি চালিয়ে যাওয়া দরকার বলে মনে করছে সরকার। এ অবস্থায় শনিবার ফের মাওবাদী-ভাবধারার বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করে দিলেন মোদী।
নিশানায় ‘দিমাগি নকশাল’
দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনে লালকেল্লা থেকে মোদী বলেন, ‘‘মাওবাদ এই দেশকে রক্তাক্ত করেছে। ২০১৪ সালে আপনারা যখন আমাদের সুযোগ দিলেন, সেই দিন থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম দেশকে মাওবাদীমুক্ত করব। লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর স্বপ্নকে নষ্ট করেছে মাওবাদ, নকশালবাদ। কত মায়ের সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে তারা। চার দশক ধরে দেশের বেশির ভাগ অংশে বন্দুক নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মাওবাদীরা। সংবিধানকে লঙ্ঘন করেছেন। সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন।’’
প্রধানমন্ত্রী জানান, মাওবাদীরা এখন তাঁদের শেষ প্রহর গুনছেন। এ কথা বলার সময়ে মাওবাদ-মনোভাবাপন্নদের থেকে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে বলেন মোদী। এই মাওবাদ-মনোভাবাপন্নদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশে অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে চাইছেন এই মাওবাদী মনোভাবাপন্নেরা। সমাজকে টেনে নীচে নামানোর চেষ্টা করছেন। তাই তাঁদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মকে দেশের উন্নয়নের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।”
ভরসা তারুণ্যেই
শুধু মাওবাদী-মনোভাবাপন্নদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের তরুণ প্রজন্মের উপরে ভরসা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। গোটা ভাষণে বার বার উঠে আসে তরুণদের প্রসঙ্গ। মোদী জানান, দেশকে নিয়ে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা সত্যি করার জন্য তরুণ প্রজন্মের উপর ভরসা রাখা হয়েছে। তারাই ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ সম্ভব করে তুলতে পারে।
এ বারের লালকেল্লার অনুষ্ঠানে ‘যুবশক্তি’ এবং ২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে বিশেষ জোর দেন মোদী। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উপর আমার ভরসা আছে।’’ যুবসমাজের জন্য নতুন প্রকল্প ঘোষণা করতে গিয়ে মোদী জানান, বিশ্ব জুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝড়ের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে। তাই দেশের এক কোটি যুবক-যুবতীকে প্রতি বছর বিশেষ এআই প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছে সরকার। মোদী জানান, দেশ গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের শক্তি উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হবে। দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একমাত্র তরুণেরাই সফল করতে পারেন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে ‘খেই হারানোয়’ বিতর্ক
প্রায় ৭৫ মিনিট ধরে চলা এই ভাষণেও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক। এ দিন ভাষণের সময়ে একাধিক বার দৃশ্যত ‘খেই হারান’ প্রধানমন্ত্রী। একটি পর্যায়ে জৈবঅর্থনীতিতে দেশের উন্নয়ন বর্ণনা করছিলেন তিনি। ২০১৪ সালের আগে কী পরিস্থিতি ছিল এবং বর্তমানে কী পরিস্থিতি হয়েছে— সেই পরিসংখ্যান দিচ্ছিলেন। তখন দুই-এক সেকেন্ডের জন্য তাঁর বক্তৃতা থামে। নীচের দিকে তাকান তিনি। তার পরে আবার ভাষণ চালিয়ে যেতে থাকেন। পরে বৈদ্যুতিন গাড়ি বিক্রির পরিসংখ্যান তুলে ধরার সময়েও মোদী জানান, ২০০৯-১০ সালে মাত্র ২৫ লক্ষ বৈদ্যুতিন গাড়ি বিক্রি হয়েছিল এ দেশে। পরক্ষণেই পরিসংখ্যান সংশোধন করে জানান, দেড় লক্ষ বৈদ্যুতিন গাড়ি বিক্রি হয়েছে ওই সময়ে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ওই অংশগুলি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করতে শুরু করে বিরোধী দলগুলি। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা সমাজমাধ্যমে ওই ভি়ডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, “টেলিপ্রম্পটার ছাড়া মহামানব।” আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরীবালও বিঁধেছেন মোদীকে। তিনিও ওই ভিডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, “আত্মবিশ্বাসহীন, উদ্বিগ্ন এবং নড়বড়ে প্রধানমন্ত্রী।”
গোটা ভাষণে কৃত্রিম মেধা, সেমিকন্ডাক্টর, জনগণনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে দেশের আগামীর দিশার আভাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে সকলকে এগিয়ে আসার বার্তা দেন তিনি।
দেশবাসীর উদ্দেশে মোদী বলেন, “আসুন স্বপ্নকে সঙ্কল্পের রূপ দিই। একটি প্রদীপ থেকে হাজার প্রদীপ জ্বলুক। বিকশিত ভারত গড়ে তুলুন।”