কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডার সঙ্গে বৈঠকের পরেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। শুধু তা-ই নয়, সোনম ওয়াংচুকও জানিয়ে দেন, হাসপাতালে তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন। সিজেপি আরও জানিয়েছে, সরকারের কাছে তারা মূলত তিনটি দাবি জানিয়েছে। সেই দাবি পূরণ না-হওয়া পর্যন্ত তারা যে ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল, তেমনই চলবে।
সোমবার সিজেপির সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল রাজধানী। ‘ককরোচ’ দলের অভিযান আটকাতে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তায় ঢেকে ফেলা হয়েছিল দিল্লিকে। দিকে দিকে ব্যারিকেড, জারি করা হয় ১৬৩ ধারাও (সাবেক ১৪৪ ধারা)। অর্থাৎ, চার জনের বেশি মানুষের জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। মিছিল আটকাতে লাঠি, কাঁদানে গ্যাস নিয়ে তৈরি ছিল পুলিশ। তবে পুলিশের এত ‘বাধা’ কাটিয়ে সংসদ ভবনের বেশ কাছে পৌঁছে যান বিক্ষোভকারীরা। যদিও শেষপর্যন্ত সংসদ ভবন পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেননি তাঁরা। তার আগেই তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। অভিযোগ, জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করা হয়। ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাসও। ধরপাকড় করে পুলিশ। যদিও শেষপর্যন্ত ‘ককরোচ’ দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয় সরকার। আর এই পরিস্থিতির মধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দফতরে পৌঁছে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, প্রায় চার ঘণ্টা বৈঠক হয় শাহ-ধর্মেন্দ্রের।
অনশনে অনড় ওয়াংচুক
সংসদ ভবনে সাংসদদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না-দেওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাবেন ওয়াংচুক। সমাজসৈনিক তথা শিক্ষাবিদের হাতে লেখা চিঠি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে। সিজেপির সংসদ-অভিযানে পুলিশের ভূমিকার নিন্দা করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে শামিল যুবসম্প্রদায়ের সঙ্গে যে নৃশংস আচরণ করা হচ্ছে, তা দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, অনশন চালিয়ে যাব।’’ কত দিন অনশন চালাবেন ওয়াংচুক? তিনি জানান, যত দিন না পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংসদ ভবনে সাংসদদের দেখা করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, তত দিন অনশন চলবে। হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দেখা করতে দেওয়ার অনুমতিও চেয়েছেন ওয়াংচুক।
ওয়াংচুক আশাবাদী, কেন্দ্রীয় সরকার ‘শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি নিশ্চিত করবে’। তিনি এ-ও বলেন, ‘‘সংসদ অভিযানে অনেক উস্কানি ছিল, তা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা শান্তি বজায় রেখেছিলেন, তাতে আমি আপ্লুত এবং অভিভূত। আমি সরকার এবং পুলিশের কাছে আবেদন করছি, তারা যেন পড়ুয়াদের সংসদে তাঁদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ করে দেয়।’’
সংসদ অভিযানে ধুন্ধুমার
সোমবার থেকেই সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংসদ ভবনে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দলের সাংসদেরা। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী-সহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যেরাও। এই পরিস্থিতিতে সিজেপি-র সংসদ অভিযান নিয়ে আগে থেকেই সতর্ক ছিল দিল্লি পুলিশ। সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার পথে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে শ্রমশক্তি ভবনের কাছে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়া হয়। তার পরেও অবশ্য বিক্ষোভকারীদের একাংশ সংসদ ভবনের দিকে এগোতে থাকেন। বৃষ্টির মধ্যে বর্ষাতি পরেই মিছিলে শামিল হন অনেকে। তাঁদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা এবং ভারতের সংবিধান। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রায় ২০ হাজার মানুষ (যাঁদের অধিকাংশই ছাত্র-যুব) সোমবারের কর্মসূচিতে শামিল হয়েছিলেন। বেশ কয়েক জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের বাসে চাপিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দমনমূলক আচরণ করেছে পুলিশ।
আরও পড়ুন:
ভাঙচুর, আহত পুলিশ, দায়ের এফআইআর
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ‘ককরোচ’ দলের সংসদ অভিযান আটকাতে গেলে ‘মারমুখী’ হয়ে যান বিক্ষোভকারীরা। পুলিশের বাসে ভাঙচুর চালানো হয়। দু’টি বাস ভেঙেছেন বিক্ষোভকারীরা। সূত্র উদ্ধৃত করে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ জানিয়েছে, সংসদ অভিযানের সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধিকারিক-সহ কমপক্ষে ৫০ জন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত সাতজন আইপিএস অফিসার রয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
এখনও পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। অশান্তির সঙ্গে আর কারা জড়িত, তাঁদের খোঁজে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, পুলিশকর্মীদের মারধর, বেআইনি জমায়েত-সহ নানা অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ।
আরও পড়ুন:
নড্ডা-সাক্ষাৎ
সিজেপি-র সংসদ ভবন অভিযানের মধ্যেই সরকারের তরফে ‘ককরোচ’ দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জানানো হয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নড্ডা দেখা করতে চান তাদের সঙ্গে। সেই মতো নড্ডার সঙ্গে দেখা করেন সিজেপি-র প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা। সিজেপি-র তরফে কেন্দ্রের কাছে মূলত তিনটি দাবি জানানো হয়। সেগুলি হল, সোনম ওয়াংচুককে দ্রুত হাসপাতাল থেকে মুক্তি দিতে হবে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হবে এবং যে নিট পরীক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
অবস্থান তোলার অনুরোধ নড্ডার
সিজেপি-কে অবস্থান তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন নড্ডা। বৈঠকের পর তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। প্রথম বার এই প্রস্তাব আসে। সেই প্রস্তাব মেনে সকাল ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়। বিকেল ৪টে নাগাদ আমার কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা পড়ে।’’ তার পরেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘‘সকল বিক্ষোভকারীর কাছে অনুরোধ, যাতে তাঁরা অবস্থান তুলে নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সাহায্য করেন।’’
মঞ্চ ভাঙল পুলিশ
সংসদ অভিযান, নড্ডার সঙ্গে বৈঠকের মাঝেই যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান মঞ্চ ভেঙে দেয় পুলিশ। আগেই তারা জানিয়েছিল, যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ’ দলের অবস্থান বিক্ষোভ ‘বেআইনি’। অনুমতি ছাড়াই তারা সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ করে দিল্লি পুলিশ।
‘শান্তিপূর্ণ অবস্থান চলবে’
শান্তিপূর্ণ ভাবে অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন ‘ককরোচ’ দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে-সহ অন্যেরা। সংসদ অভিযানের পর আবার তাঁরা ফিরে আসেন যন্তর মন্তরে। তাদের অনশন মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হলে কেরল হাউসের সামনে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার কথাই ঘোষণা করেছে সিজেপি। দাবি পূরণ না-হওয়া পর্যন্ত অবস্থান তোলা হবে না, জানিয়েছে তারা।
শাহ-ধর্মেন্দ্র বৈঠক
প্রথম থেকেই সিজেপি-র নিশানায় রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র। তাঁর পদত্যাগের দাবিতেই চলছে তাদের বিক্ষোভ। সোমবার সেই দাবিকে সামনে রেখে সংসদ অভিযান কর্মসূচির আবহে ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করেন শাহ। এই সাক্ষাৎ সম্পর্কে অবগত সরকারি কর্তাদের সূত্র উল্লেখ করে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ জানিয়েছে, সংসদে ধর্মেন্দ্রর কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যদিও দু’জনের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
সোনমের স্ত্রীর মামলা
ওয়াংচুককে অন্য হাসাপাতালে স্থানান্তরিত করা নিয়ে সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। সোমবার সেই আবেদনের ভিত্তিতে শুনানি হয় দিল্লি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিকে উপাধ্যায়ের বেঞ্চে। মামলাকারীর আবেদন শোনার পর আদালত দিল্লির সফদরজং হাসপাতালের থেকে ওয়াংচুকের মেডিক্যাল রিপোর্ট চেয়েছে। সেই রিপোর্টে সোমবার তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা উল্লেখ করার নির্দেশও দেয় আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, ওয়াংচুককে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা যাবে কি না, সে ব্যাপারে মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
দিল্লি পুলিশকে প্রশ্ন আদালতের
যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ’ দলের অবস্থান বিক্ষোভের উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে দিল্লি হাই কোর্টে মামলা হয়েছিল। সোমবার সেই মামলার শুনানিতে দিল্লি পুলিশের কাছে আদালতের প্রশ্ন, ‘‘নজরদারি সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসরণ করা হচ্ছে কি না?’’ যদিও কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল দাবি করেন, অবস্থানে কোনও নজরদারি চালানো হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘যন্তর মন্তরে সব বিক্ষোভেরই ভিডিয়ো করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ। কোনও নজরদারি চালানো হয় না।’’ উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তাকে সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করে। সেই অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকারের উল্লেখ রয়েছে।