প্রশ্ন করতে ভয় পাওয়া বা প্রমাণ ছাড়া কোনও কিছু মেনে নেওয়া উচিত নয়। যদি অন্যথা হয় তবে সমাজকে স্বৈরাচারিতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে! এমনই মত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূয়ানের। শুধু তা-ই নয়, তিনি মনে করেন, সমাজের ঐতিহ্যকে প্রশ্নাতীত ভাবা ঠিক নয়। যদি মানুষের মনে কোনও প্রশ্ন না-থাকে তবে সমাজ দিনে দিনে ভুল তথ্যের কাছে অসহায় হয়ে পড়বে।
বিচারপতি ভূয়ান জোর দিয়েছেন যুক্তিগত চিন্তাভাবনার উপর। সেই বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন সংবিধানের ৫১ (এ) অনুচ্ছেদ। বিচারপতির কথায়, ‘‘সংবিধানের ৫১ (এ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা গড়ে তোলার বিষয়টি শুধুমাত্র গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পড়ুয়া এবং যুব সমাজকে যৌক্তিক ভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া উচিত।’’ সভ্য এবং রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হিসেবে পড়ুয়া এবং যুব সমাজের সেই ‘দায়িত্ব’ বোঝালেন বিচারপতি ভূয়ান। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের প্রয়োজন যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা। আপনি যা বলবেন বা ভাববেন, তা অবশ্যই যেন যুক্তির উপর ভিত্তি করে হয়।’’
বৈজ্ঞানিক মানসিকতা কী, তার ব্যাখ্যাও দেন বিচারপতি ভূয়ান। তাঁর মতে, প্রত্যেকের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু মনোভাব থাকা উচিত। তবে রাতারাতি এ ধরনের মনোভাব তৈরি হতে পারে না। শনিবার মেঘালয়ের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেওয়ার সময় বিচারপতি ভূয়ানের ভাষণে উঠে এসেছে যুক্তিবাদী মনোভাবের কথা। তিনি মনে করেন, ‘‘কোনও মানুষের অনুসন্ধিৎসু মনোভাবের অঙ্কুর বপন হয় বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই।’’
আরও পড়ুন:
নিটের প্রশ্নফাঁস থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে বিক্ষোভের ছবি দেখা যাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে বিচারপতি ভূয়ানের এই ধরনের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত অনেকের। বিচারপতি শুধু যৌক্তিকতার উপরই জোর দেননি, তিনি এ-ও মনে করেন, কোনও কিছু আবেগঘন হয়ে মেনে নেওয়া উচিত নয়। তাঁর কথায়, ‘‘জনপরিসরে কোনও আলোচনা আবেগ এবং যাচাইহীন দাবির উপর নির্ভর করে হয় তবে সমাজের উচিত গবেষণালব্ধ প্রমাণের দাবি করা। ভুল তথ্য নির্ধারণ করতে সকলের মন অনুসন্ধী হওয়া উচিত।’’ বিচারপতির মতে, কোনও বিষয়ে প্রথমেই যে ব্যাখ্যা আসে, তা মেনে না-নিয়ে কারণ খোঁজার প্রয়োজন। যুক্তি এবং অনুসন্ধানের পরই সেই ব্যাখ্যা মানা উচিত। কোনও কিছুই উপর উপর দেখে তা বিশ্বাসের পক্ষপাতী নন বিচারপতি ভূয়ান। তাঁর কথায়, ‘‘অনুসন্ধানী হওয়ার অর্থ বৈ়জ্ঞানিক মানসিকতার বিকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা মনকে কুসংস্কার থেকে রক্ষা করবে। স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতার উপর জোর দিতে শেখাবে।’’
আমরা-ওরা নীতি বা চিন্তাধারা থেকে সমাজের বেরিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন বিচারপতি ভূয়ান। তাঁর মতে, এই ‘দ্বৈত’ বিভাজন সমাজকে এক ‘মিথ্যা’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটা ধ্বংসাত্মক প্রবণতা হিসেবেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা শুরু হয়েছে ‘আমরা, ভারতের জনগণ...’ দিয়ে। তাই আমাদেরও উচিত আমরা-ওরা আখ্যানকে সরিয়ে রাখা।’’ বিচারপতির সংযোজন, ‘‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ধারণাই দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘আমরা’ শব্দের উপর।’’ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সমাজে কোনও ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার জন্য ‘আমরা’ সত্ত্বার উপর জোর দেওয়া উচিত।