আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ় বুধবার এক ডিজিটাল প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, ভারতে এসআইআর-অনিয়ম এবং ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে ফ্রান্সে সাম্প্রতিক হিংসাত্মক বিক্ষোভের যোগসূত্র রয়েছে! বৃহস্পতিবার থেকেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে শাসকদল বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের তরজা। রাজনৈতিক টানাপড়েনের এই আবহে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেন, ভারতে আগামী ৩০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না কংগ্রেস। পরাজয়ের অজুহাত হিসেবে তাই তারা ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলছে!
এসআইআর বাতিলের দাবিতে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ পথে নেমেছে। গত ১৩ অক্টোবর রাহুলের নেতৃত্বে দিল্লিতে মিছিলও হয়। একই সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপে রেখেছিল। কিন্তু উৎসবের মরসুম শুরু হওয়ায় আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী যদিও জানিয়েছিলেন, জ্ঞানেশ পদত্যাগ না-করা পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এই পরিস্থিতিতে কিছু দিন আগে বিজেপির তরফে বিমানের ভিতরের একটি ফুটেজ দেখিয়ে দাবি করা হয়, রাহুল চার দিনের ভিয়েতনাম সফরে যাচ্ছেন। সেই প্রসঙ্গ টেনেই বৃহস্পতিবার রাহুলকে নিশানা করেন শাহ।
কী দাবি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের
‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ফক্স নিউজ় তাদের সাম্প্রতিক এক ডিজিটাল প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ভারত, ফ্রান্স, ইটালি-সহ বিশ্বের ১৩টি দেশের ১০১টি সংগঠনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে তরুণ প্রজন্ম ও যুব সমাজের বিক্ষোভের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। ওই সংগঠনগুলি সমন্বয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগঠিত করছে বলেও দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
উদাহরণ হিসেবে ‘ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস’ (আইএপি) নামে একটি গ্রুপকে চিহ্নিত করেছে ফক্স নিউজ়। তাদের দাবি, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ও ভারতে জ্ঞানেশবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে সমন্বয় করছে ওই সংগঠনটি। পাশাপাশি, ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনে দাবি, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র-যুব সংগঠনের পাশাপাশি কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির তথাকথিত ‘রেড-গ্রিন নেটওয়ার্ক’ বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আঙুল তোলা হয়েছে, নিউ ইয়র্ক ও শাংহাই-ভিত্তিক ধনকুবের নেভিল রয় সিংহমের অর্থে পুষ্ট বামপন্থী নেটওয়ার্ক এবং ‘প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে সংগঠনের দিকে।
বিজেপির নিশানায় কংগ্রেস
ফক্স নিউজ়ের ওই প্রতিবেদনটিকে হাতিয়ার করে বিজেপি বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। তাদের দাবি, মার্কিন মিডিয়ার রিপোর্ট প্রমাণ করছে যে কংগ্রেস বিদেশি শক্তির সহায়তায় ভারতে অরাজকতা সৃষ্টি এবং সরকার পরিবর্তনের (রেজ়িম চেঞ্জ) ষড়যন্ত্র করছে। বিজেপির মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া এই প্রসঙ্গে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধীকে নিশানা করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘রাহুল গাঁধী গদ্দার (বিশ্বাসঘাতক), দেশদ্রোহী। উনি ভারতে অরাজকতার মডেল তৈরি করতে চাইছেন।’’ ‘ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস’ এবং ‘প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল’-এর সঙ্গে সনিয়া গাঁধী এবং রাহুলের যোগাযোগ রয়েছে!
আরও পড়ুন:
কী জবাব কংগ্রেসের
বিজেপির অভিযোগের জবাবে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের সরকার মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে জনগণের নজর ঘোরানোর চেষ্টা করছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভোটচুরি কোনও মনগড়া অভিযোগ নয়, প্রমাণিত সত্য। এর ফলে ১০ কোটিরও বেশি ভারতীয় নাগরিক সংবিধান প্রদত্ত ভোটাধিকার হারানোর মতো সঙ্কেটের মুখে পড়েছে।’’
জ্ঞানেশের কার্যকলাপে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি এবং বেআইনি ভাবে এসআইআর-এর ফর্ম ৬-এর বদল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রমেশ। প্রসঙ্গত, গত ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন একটি বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিল, সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষেই ফর্ম ৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের ঘোষণাপত্র দেওয়ার শর্ত জোড়া হয়েছিল। কিন্তু কমিশনের সেই বিবৃতি সরাসরি খারিজ করে গত ৬ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ জানিয়েছিল, ফর্ম ৬-এর পরিবর্তনের কোনও রকম অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট!
শাহের নিশানায় রাহুল
বৃহস্পতিবার নিজের ৬২তম জন্মদিনে দিল্লিতে যমুনা নদী পরিষ্কারের লক্ষ্যে ৮,৯৪১ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন করেন শাহ। সেখান থেকেই লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুলকে কটাক্ষ করেন তিনি। খোঁচা দিয়েছেন রাহুলের ঘন ঘন বিদেশ সফর নিয়েও। শাহের দাবি, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার দিতে চান রাহুলেরা। তাই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে তাঁদের এত আপত্তি।
মঙ্গলবার বিজেপির তরফে সমাজমাধ্যমে বিমানের আসনে বসা রাহুলের একটি ভিডিয়ো (যার সত্যতা আনন্দবাজার ডট কম যাচাই করেনি) প্রকাশ করা হয়েছিল। তলায় লেখা ছিল, ‘‘মিথ্যা ছড়াতে ছড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি… আমাকে দিনকয়েকের জন্য ভিয়েতনাম ঘুরে আসতে দাও… কে আর জানতে পারবে!’’ ওই ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছিল নীল টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি (বিজেপির দাবি তিনিই রাহুল) বিমানে বসে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিদেশ সফর প্রসঙ্গ তুলে রাহুলকে নিশানা করে শাহ বলেন, ‘‘আমি জানি, আমার কথা আপনি এখন শুনতে পাবেন না। কারণ আপনি বিদেশে কোথাও বসে আছেন। তার কোনও ব্যাখ্যাও কোনও দিন আপনি দেন না। সে সব ঠিক আছে। ওটা আপনার ব্যক্তিগত জীবন। কিন্তু দিল্লিতে নামার পর আমার কথা শুনে রাখুন। আগামী ৩০ বছরেও আপনি ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।’’
রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট এবং আরটিআই-তথ্য
বুধবার রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট এবং তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) প্রাপ্ত জবাবের মতো দু’টি বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিরোধী শিবির এবং নেটাগরিকদের একাংশের তরফে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে শাসকশিবিরের তরফে কোনও গুরুত্বপূর্ণ নেতার বক্তব্য সামনে আসেনি।
বিরোধী দলগুলি ‘ভোটচুরি’বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি দমনপীড়ন নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলেছে ইতিমধ্যেই। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েতের অধিকার’ বিষয়ক বিশেষ দূত জিনা রোমেরো চলতি মাসে ওই রিপোর্ট পেশ করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, ভারতে যুবসমাজ যখন লিঙ্গভিত্তিক সমতা, ন্যায়বিচারের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা বা প্রতিবাদ করে, তখন তারা রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্তরে প্রতিহিংসা, দমনপীড়ন ও কলঙ্কলেপনের মুখোমুখি হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনুজ স্বরূপ চলতি সপ্তাহেই সেই রিপোর্ট খারিজ করেছেন। বিরোধীদের প্রশ্ন, মোদী সরকার রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ মানতে অস্বীকৃত হলেও ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ’ হিসাবে পরিচিত ফক্স নিউজ়ের প্রতিবেদনের সত্যতা সম্পর্কে নিঃসংশয় কেন।
অন্য দিকে, বুধবার ইন্ডিয়া টুডে-তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আরটিআই-আবেদনের জবাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে এড়িয়েই দুই নির্বাচন কমিশনার, সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী চিঠি পাঠিয়েছিলেন ক্যাবিনেট সচিবকে। দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠিগুলি পাওয়ার পর ক্যাবিনেট সচিবালয় সেগুলির জবাব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশের দফতরে পাঠিয়ে দিয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে আরটিআই আইনে করা প্রশ্নের জবাবে।
দুই নির্বাচন কমিশনারের লেখা চিঠির পূর্ণাঙ্গ তথ্য আরটিআই-আবেদনে মেলেনি। তবে জানানো হয়েছে, একটি বিতর্কিত কাজের নির্দেশ এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে মতপার্থক্য নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার চলতি বছরের ২৬ জুলাই দু’টি পৃথক চিঠি লিখেছিলেন ক্যাবিনেট সচিবকে। এর ফলে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’র অভিযোগ আরও জোরালো হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। চিঠি দু’টি ক্যাবিনেট সচিবালয়ে পৌঁছোনোর পর ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে সেখানে আনুষ্ঠানিক ভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এর পর ৫ অগস্ট ক্যাবিনেট সচিবালয়ের পক্ষ থেকে চিঠি দু’টির উত্তর এবং এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনীতি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই কমিশনার, সঁধু এবং জোশীর অভিযোগ, তাঁদের অন্ধকারে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষা, বেআইনি ভাবে ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদল, এসআইআর-এর পর ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং যুক্ত করা সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে জ্ঞানেশের পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়েছেন সঁধু এবং জোশী। গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা। বিতর্কের মুখে কমিশনের ব্যাখ্যা, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশন এই ব্যাখ্যা দিলেও বিতর্ক থামেনি। উল্টে বিভিন্ন বিরোধী দল এবং ককরোচ জনতা পার্টির মতো সংগঠন কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে জ্ঞানেশের পদত্যাগ দাবি করেছে। এই পরিস্থিতিতে আরটিআই-তথ্য জ্ঞানেশ এবং শাসক শিবিরের অস্বস্তি বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে শনিবার কর্মসূচির ডাক দিয়েছে সিজেপি।
- সিজেপির কর্মসূচিকে মাথায় রেখে শুক্রবার রাত থেকেই ধরপাকড় শুরু করেছে পুলিশ।
-
শেষমুহূর্তে স্থগিত জ্ঞানেশের অপসারণে ‘নকল সংসদ’! নাম ও পদ্ধতি পাল্টেছিল আগেই, নেপথ্যে কোন কোন কারণ?
-
ছাড়া পেলেন আইসা নেত্রী নেহা, এখনও ‘অজানা’ জায়গায় আটক সিজেপি প্রধান দিপকে, দাবি সঙ্গীদের
-
তেরঙা যাত্রার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েই আটক দিপকে! যন্তর মন্তরের কাছ থেকে নেহাকেও আটক করল দিল্লি পুলিশ
-
‘তেরঙা যাত্রা বাতিল করুন!’ বাড়ি গিয়ে দিপকেকে নোটিস দিল পুলিশ, তবে নিষেধাজ্ঞা জারি করল না সুপ্রিম কোর্টও
-
বিরোধী ঐক্যের ডাক দিপকের! তেরঙা অভিযান নিয়ে হুঁশিয়ারি দিল্লি পুলিশের, মার্কিন নাগরিক ইমরানকে দেশ ছাড়ার নোটিস