স্বামী-স্ত্রীর ‘ধুন্ধুমার’ ঝগড়া। চোখা চোখা যুক্তি, বাক্যবাণে এক জন আর এক জনকে প্রায় কোণঠাসা করেই ফেলেছেন, ঠিক সেই সময়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষটি কিছুটা গম্ভীর আর ব্যস্তসমস্ত গলায় ঘোষণা করলেন— তাঁকে অবিলম্বে শৌচাগারে যেতে হবে! ‘প্রকৃতির আহ্বান’! সেই আহ্বানের আকর্ষণ এমনই যে, বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরেও তাঁর দেখা পাওয়া যায় না।
কখনও হয়েছে এমন অভিজ্ঞতা?
কিংবা হয়তো বাড়িতে মা কাজে ব্যস্ত। একটু সাহায্য পেতে তিনি হয়তো মোবাইল হাতে সোফায় গা এলিয়ে থাকা পুত্র বা কন্যাকে চা বানিয়ে দিতে বললেন। অমনি শুনতে হল, ‘‘আমার প্রবল জোরে... পেয়েছে। টয়লেটে যেতে হবে!’’ অদ্ভুত ভাবে সেই ‘প্রবল’ জরুরি প্রয়োজনটি মোটেই সঙ্গে সঙ্গে মিটল না। শৌচাগারের দরজা শেষমেশ যখন খুলল ততক্ষণে হয়তো চা বানিয়ে খাওয়াও হয়ে গিয়েছে!
সম্প্রতি ইন্টারনেটে এমন অভ্যাসের একটি নামকরণ হয়েছে— ‘ওয়েপনাইজ়ড পুপিং’। সোজা বাংলায়, ‘মলত্যাগকে অস্ত্র বানানো’!
মলত্যাগের অস্ত্র— শব্দ কয়েকটি পড়ে যে সব পাঠক নাক সিঁটকে মুখ বিকৃত করে ‘ভয়ঙ্কর’ রকমের ডায়ারিয়া বা প্রবল বেগে বিষ্ঠা ত্যাগের কথা ভাবছেন, তাঁরা সে সব ভাবনায় নিশ্চিন্তে লাগাম দিন। অস্ত্র মানেই মারকাটারি হতে হবে, তা কে বলেছে! এই অস্ত্রটি তুলনায় বরং অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত।
এখানে অস্ত্র আসলে মলত্যাগের জন্য চেয়ে নেওয়া ওই সময়ের ফাঁকটুকুই। যেখান দিয়ে পালানোর পথ নেই— এমন চক্রব্যূহ থেকেও ‘সুড়ুৎ’ করে গলে যাওয়া যায়। সহজেই এড়ানো যায় দায়িত্ববোধ, সাংসারিক কাজকর্মের ভার, কঠিন কোনও প্রশ্নবাণ বা কোণঠাসা হয়ে যাওয়া পরিস্থিতি। ‘টয়লেটে যেতে হবে’— এই তিনটি শব্দ পর পর উচ্চারণ করলেই যাবতীয় সমস্যা নিমেষে চলে যায় শৌচাগারের দরজার ও পারে। এ পারে বিরাজে শান্তি।
সত্যি সত্যিই প্রকৃতির আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন যদি থেকে থাকে, তবে তা নিয়ে কারও সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু শৌচাগারের দরজা বন্ধ হতেই হাতে উঠে আসে মোবাইল ফোন। একটি রিল কখন পাঁচটা রিল হয়ে যায় আর কখন যে ১০ মিনিটের কাজটি ৪০ মিনিটে গিয়ে দাঁড়ায়, তার খেয়াল থাকে না। তবু সেইটুকু হয়তো মেনে নেওয়া যেত। মুশকিল হয় শৌচাগারের ছোটার সময়টি একটু বেশিই কাকতালীয় হয়ে গেলে।
হয়তো স্ত্রী বললেন, খাওয়ার প্লেট গুলো ধুয়ে দিতে। ঠিক তখনই তিনি বললেন, ‘‘এক মিনিট দাও, আমায় একটু টয়লেটে যেতে হবে...’’। "মেয়েকে একটু খাইয়ে দেওয়া যাবে বা ছেলের স্কুলের টিফিনটা গুছিয়ে দেওয়া যাবে?" উত্তর হল, ‘উঁহু, এখনই টয়লেটে যেতে হবে’। পরিস্থিতি বুঝে শৌচাগারে যাওয়ার এই প্রয়োজন ব্যক্ত করাকেই বলা হচ্ছে ‘ওয়েপনাইজ়ড পুপিং’ বা মলত্যাগের অস্ত্র। কারণ, শৌচাগারের প্রয়োজন শুনলে কে-ই বা আপত্তি জানাবে!
‘ওয়েপনাইজ়ড পুপিং’ কথাটি যিনি প্রথম ব্যবহার করেছেন, তিনি একজন লেখিকা তথা বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত পরামর্শদাতা অলিভিয়া হাওয়েল। তার পর থেকেই ওই শব্দবন্ধটি জনপ্রিয় হয়েছে সমাজমাধ্যমে। অলিভিয়া অবশ্য মনে করেন, এই 'অস্ত্র' প্রয়োগ করা হয় মূলত মহিলাদের উপরেই। বিশেষ করে যাঁরা সন্তান পালন করছেন, সেই সব মায়েরা এর শিকার। উল্টোটা একেবারে ঘটে না, তা বলেননি তিনি। তবে বলেছেন, তার সংখ্যা তুলনায় অনেকটাই কম।
হাওয়েল তাঁর লেখায় স্পষ্ট ভাবে বলেছেন, ‘‘কোনও অজানা কারণে মায়েদের সদাপ্রস্তুত থাকতে হয়। সে তিনি খান, স্নান করুন, ঘুমোন বা কাজ করুন বা প্রকৃত প্রয়োজনে তাঁকে যেতে হোক শৌচাগারে, তাঁকে প্রয়োজন পড়লে ডাকা হবে এবং তাঁকে যে ভাবে হোক হাজির হতেই হবে। যদিও দুর্ভাগ্যের বিষয়, অধিকাংশ সময়েই বাবাদের ক্ষেত্রে এটা বলা যায় না।’’
হাওয়েলের ওই বক্তব্য এবং তাঁর বিশেষ অস্ত্রের নামকরণ প্রকাশ্যে আসা মাত্র ভাইরাল হয়ে পড়েছে। অনেকেই ওই অস্ত্রের কথা মেনে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন সমাজমাধ্যমে। এক মহিলা যেমন লিখেছেন, ‘‘আজ জানলাম, এটাও একটা অস্ত্র! যা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ মহিলাদের উপর বহু বছর ধরে প্রয়োগ করে আসছে।’’
আরও পড়ুন:
তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ আবার ‘সাফাই’ দিয়ে বলেছেন, তাঁদের অনেকেই শৌচাগারের বসে ভাল কাজ করতে পারেন। চিনামাটির ‘সিংহাসনে’ বসেই মনে শান্তি খুঁজে পান তাঁরা। যদিও এর সমালোচনা করে পাল্টা এক দল মন্তব্য করেছে, এতে অন্যদের অশান্তি হচ্ছে কি না তা ভেবে দেখা হয় কি?
তবে এই অভ্যাসের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দিকটিও ভেবে দেখার মতো। দীর্ঘক্ষণ কমোডে বসে থাকলে মলদ্বারের চারপাশে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। যা পরবর্তীকালে বর্জ্য ত্যাগের স্বাভাবিক অভ্যাসকে ব্যাহত করতে পারে। ঝুঁকি বাড়তে পারে অর্শ বা পাইলসের মতো সমস্যার। মলদ্বার বা পায়ুপথে রক্তনালি ফুলে যেতে পারে। তাই ভবিষ্যতে কাজের কথা শুনে শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই যান, কিন্তু তা থেকে 'শৌচ কেলেঙ্কারি' বাধিয়ে ফেলবেন না যেন!