বাবা-মায়ের সম্পর্ক
বদলে গেলে সন্তানের পৃথিবীটাও অনেকটা বদলে যায়। যে বাড়িতে একসঙ্গে দু’জনকে দেখার অভ্যাস ছিল, সেখানে হঠাৎ একজনের অনুপস্থিতি শিশুমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কখনও
অভিমান, কখনও রাগ, কখনও আবার নিজের অজান্তেই তৈরি হয়
অপরাধবোধ। বলিউড অভিনেত্রী সারা অলী খানের অভিজ্ঞতাও খানিক
তেমনই। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে একা মায়ের কাছে বড় হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন
তিনি।
সইফ অলী খান ও অমৃতা সিংয়ের কন্যা সারা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। এর আগে একাধিক সাক্ষাৎকারে সারা জানিয়েছেন, এক জন অভিভাবকের কাছে বেড়ে ওঠার ফলে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে অন্য ভাবে। ছোটবেলাতেই তিনি বুঝেছিলেন, জীবনে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিজের থেকেই নিতে হয়। সাহায্য পাওয়া গেলেও নিজের জীবনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিজেরই। আর সম্প্রতি তিনি তাঁর মায়ের কথা বললেন সাক্ষাৎকারে। অমৃতা একাধারে মা এবং বাবার ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছেন সারাজীবন। বকাঝকার পাশাপাশি আদরও করেছেন সন্তানদের। সারার মনে পড়ে, স্কুলে অভিভাবক এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মিটিংয়ে তাঁর মা উপস্থিত থাকতেন, বাবা না। কিন্তু প্রায় সব বন্ধুর মা-বাবা দু’জনেই উপস্থিত থাকতেন। যদিও তাঁর জীবনে বাবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কোনও কিছুর উপদেশের প্রয়োজন পড়লে বাবার শরণাপন্ন হতেন তিনি। অর্থাৎ সইফের সঙ্গে সন্তানদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করেননি অমৃতা। তার পরেও দু’জনের ভূমিকা একসঙ্গে পালন করে চলতেন তিনি। ছেলেমেয়েদের সব প্রশ্নের উত্তরও দিতেন তিনি।
তবে একক অভিভাবকের কাছে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা সব শিশুর ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কেউ দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, কেউ আবার দীর্ঘদিন ধরে বাবা বা মায়ের অনুপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। তাই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ সন্তানদের উপর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তানের বয়স, মানসিক পরিণতি এবং তার সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক, সব কিছুর উপরেই নির্ভর করে সন্তান বিষয়টিকে কী ভাবে গ্রহণ করবে। তাই প্রশ্ন ওঠে, বাবা-মা আলাদা থাকলে সন্তানের আবেগকে কী ভাবে সামলাবেন?
‘সিঙ্গল মাদার’ বা ‘সিঙ্গল ফাদার’ হলে সন্তানকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে খুবই সচেতন হতে হয়। দু’জনের সান্নিধ্যের বদলে একজনের সান্নিধ্যে বড় হয় তারা। অথবা দু’জনেই পালা করে সময় দিলেও সমস্যা কমে না। বরং কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ ভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন—
১. সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময়ে তার বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দরকার। বড়দের সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। বরং সহজ ভাষায় বোঝানো যেতে পারে, বাবা-মায়ের মধ্যে কিছু সমস্যা হয়েছে বলেই তাঁরা আলাদা থাকছেন। কিন্তু তার জন্য সন্তান দায়ী নয়।
২. সন্তান একই প্রশ্ন বার বার করতে পারে। বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ধরে উত্তর দিন। আজ যে বিষয়টি সে বুঝতে পারছে না, কয়েক মাস পরে সেটি নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠতে পারে। তাকে কথা বলার সুযোগ দিন। সে দুঃখ পেলে তাকে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার পরামর্শ না দিয়ে তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।
৩. সন্তানের সামনে অন্য অভিভাবককে অপমান করা বা তাকে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা থেকে বিরত থাকুন। বাবা-মায়ের মধ্যে বিরোধ থাকলেও সন্তানের সঙ্গে সেই বিরোধের বোঝা ভাগ করে নেওয়া উচিত নয়।
৪. শিশুরা সবসময়ে নিজেদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কেউ কথা বলে, কেউ ছবি আঁকে, কেউ খেলাধুলো করে, আবার কেউ চুপ করে থাকে। তাই সন্তানকে নিজের মতো করে অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
৫. প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসও শিশুকে মানসিক নিরাপত্তা দিতে পারে। একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, সারাদিনের অভিজ্ঞতা শোনা বা ঘুমোতে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় দেওয়া, এ সবের মাধ্যমে সন্তান বুঝতে পারে, তার কথা শোনার মতো কেউ রয়েছে।