Advertisement
E-Paper

শঙ্খনাদে যুদ্ধ, শঙ্খনাদেই পুজো! রণধ্বনি থেকে মঙ্গলধ্বনি— বিভিন্ন শাঁখের জানা-অজানা গল্প

এমন বহু ছোটখাটো সরঞ্জামের ব্যবহার হয় পুজোপাঠে, যা না থাকলে পুজো সম্পূর্ণই হত না। পুজোর জোগাড়যন্ত্র যাঁরা করেন, তাঁরা জানেন সেই সব উপচারের গুরুত্ব। আলোর মধ্যে থেকেও আলোচনার বাইরে থাকা তেমনই কিছু উপচারের গল্প নিয়ে এ বারের পুজো সিরিজ় ‘আচার উপচার’। সূচনা হল শঙ্খধ্বনি দিয়ে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৯
যুদ্ধ না কি শান্তি কিসের বার্তা দেয় শাঁখ?

যুদ্ধ না কি শান্তি কিসের বার্তা দেয় শাঁখ? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

"শঙ্খ বাজিয়ে তোমায় ঘরে এনেছি...।" তা মা দুর্গা তাঁর ঘরেই আসছেন। তা ও এক বছর পরে। তাঁকে আবাহন করতে তাই শাঁখ বাজানো শুরু হয় সেই মহলয়ার ভোর থেকে। আকাশে-আলো-না-ফোটা ৪টেয় চণ্ডীপাঠ শুরুর আগে রেডিয়োর চ্যানেলে চ্যানেলে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি। তার পরে শুরু হয় মালকোষ রাগে ‘ইয়া চণ্ডী মধুকৈটভাদি...’।

শাঁখ ছাড়া এ দেশে পুজো হয় না। শুভ অনুষ্ঠান মানে তার সূচনা করতে শাঁখ বাজাতেই হবে। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, ভাইফোঁটা, এমনকি জন্মদিনে সন্তানসন্ততিকে ধানদুব্বো পায়েস নিয়ে আশীর্বাদ করতে বসেও শাঁখ বাজান মায়েরা। কারণ, পুজোপার্বণে শাঁখের ব্যবহার যাঁরা করেন, তাঁরা মনে করেন, শঙ্খনাদে দূরে থাকে ‘অশুভ’ শক্তি। আর শুভ কাজে অশুভকে দূরে রাখাই তো কাম্য।

এমন বিশ্বাস অবশ্য আপনা থেকেই হয়নি। এর নেপথ্যে রয়েছে শাঁখের সঙ্গে জুড়ে থাকা নানা কাহিনি। পুরাণে, শাস্ত্রে, মহাকাব্যে বর্ণিত বহু ঘটনার সঙ্গে জুড়ে আছে শাঁখ। অবাক করা বিষয় হল, সে সব ঘটনায় যে সব সময় শাঁখ বাজিয়ে শুভকাজেরই সূচনা হয়েছে, তা কিন্তু নয়। মহাভারতে ভ্রাতৃঘাতী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধও শুরু হত শাঁখ বাজিয়ে!

কুরুক্ষেত্রে শাঁখ বাজিয়েছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণও। সেই শাঁখের নাম পাঞ্চজন্য। মহাভারতের বর্ণনা বলছে, এক এক দিন এক এক জন মহারথী শাঁখ বাজিয়ে যুদ্ধ শুরু করতেন। তবে কৃষ্ণ যখন পাঞ্চজন্য বাজাতেন, তখন তার বজ্রগম্ভীর নাদে কৌরব সেনাদের বুক কেঁপে উঠত। অর্জুনের শাঁখের ধ্বনিতে আবার মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ত শত্রুপক্ষ। অন্তত তেমনই উল্লেখ করা হয়েছে মহাকাব্যে। সেই সব কাহিনির বিচার করলে বলতে হয়, মহাকাব্যে শাঁখ যেন এক ধরনের অস্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে একা কৃষ্ণ বা অর্জুনই শাঁখের ব্যবহার করে বিপক্ষকে পর্যদুস্ত করেননি। পুরাণে বর্ণিত কাহিনি বলছে, দেবী দুর্গাও সেই একই কাজ করেছিলেন। দশভুজার দশ প্রহরণের একটি হল শঙ্খ। যা তাঁকে দিয়েছিলেন সমুদ্রের দেবতা বরুণ দেব। সে শাঁখের নাম ছিল ‘মহাতূর্য’। পুরাণ অনুপ্রাণিত কাহিনি বলছে, মহিষাসুরের সঙ্গে দুর্গার যুদ্ধে মহাতূর্যের আওয়াজে ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল অসুর সেনারা।

আসলে শব্দকে ‘ব্রহ্ম’ মনে করে হিন্দু শাস্ত্র। ব্রহ্ম হলেন পরমসত্তা। কিন্তু শব্দ আর ব্রহ্ম মিলে যে ‘শব্দব্রহ্ম’ তৈরি হয়, তার ব্যাখ্যা আবার 'মৈ্ত্রায়ণীয় উপনিষদ'-এ করা হয়েছে ‘অতিন্দ্রীয় ধ্বনি বা কম্পন’ হিসাবে। শাঁখের আওয়াজকে মনে করা হয় সেই অতীন্দ্রিয় ধ্বনির জাগতিক প্রকাশ। ব্রহ্মার শঙ্খ ‘কালিক’-এর গল্পে সেই ভাবনার প্রতিফলনও মেলে।

পুরাণে বলা হয়েছে, মহাবিশ্বের আদিসৃষ্টির ধ্বনি নির্গত হয়েছিল কালিক শাঁখ থেকেই। শিবের রূদ্ররূপের সঙ্গী ‘ত্রিলোক বিজয়’ শাঁখের মহাশব্দ আবার তিন ভুবন— স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল কাঁপিয়ে দিতে পারে। ইন্দ্রের শাঁখ ‘শ্রুতিধারা’র শব্দ আবার মেঘের স্বরে দেবতাদের যুদ্ধজয়ের উদ্দীপনার জোগান দিত।

হয়তো সেই কারণেই রামায়ণ-মহাভারত—দুই মহাকাব্যেরই মূল নায়কদের প্রত্যেকের নিজস্ব শাঁখ রয়েছে। শাঁখ আছে প্রতিপক্ষেরও। ভীষ্মের শাঁখের নাম ছিল গঙ্গানাভ। অর্জুন বাজাতেন দেবদত্ত। কর্ণের শাঁখের নাম হিরণ্যগর্ভ। দুর্যোধনের বিদারক। ভীমের পৌন্ড্র। যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেবেরও নিজ নিজ শাঁখ ছিল। অন্য দিকে, রামায়ণে যুদ্ধক্ষেত্রে শঙ্খ ব্যবহার না হলেও রামের নিজস্ব শাঁখ ছিল। যার নাম ‘মহাপদ্ম’। শোনা যায়, সেই শাঁখ বাজিয়েই রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক হয়। লক্ষ্ণণ, ভরত, শত্রুঘ্নের শাঁখের নাম ছিল যথাক্রমে শঙ্খচূড়, অহোরাত্র এবং শঙ্খসেন।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়— সে যুগে শাঁখের ব্যবহার মূলত করতেন পুরুষেরাই। আর পুরাণে, মহাকাব্যে শঙ্খধ্বনির ব্যবহার এক রকম হত রণধ্বণি হিসাবেই। কিন্তু এ যুগে শাঁখ বাজান মূলত মহিলারা। আর শাঁখের আওয়াজকে মঙ্গলধ্বনি হিসাবেই দেখা হয়। পুরাণের শাঁখ আর বাস্তবের সেই সব শাঁখের যদিও আকাশ-পাতাল তফাত। তবে গুরুত্বে তারা কোনও অংশে কম নয়।

এ দেশে সবচেয়ে বেশি যে শাঁখের ব্যবহার হয় তা হল বামাবর্ত শঙ্খ। একে 'তিলা শঙ্খ'ও বলা হয়। এই শাঁখের বিশেষত্ব হল এর ভিতরের প্যাঁচানো অংশটি বাম দিকে ঘোরে। শুভকাজের সূচনা করা হয় এই শাঁখ বাজিয়েই। প্রচলিত বিশ্বাসে এই শঙ্খকে বিষ্ণুর বামহাতের প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়। অন্য দিকে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খের ধরন ঠিক এর উল্টো। এটি বিরল প্রজাতির শাঁখ। এক লক্ষ বামাবর্ত শাঁখে হয়তো একটি দক্ষিণাবর্ত শাঁখ পাওয়া যায়। তবে এই শাঁখ বাজানো হয় না। বামাবর্ত যদি বিষ্ণুর বাম হাত হয় তবে দক্ষিণাবর্তকে হিন্দুরা পুজো করেন দেবী লক্ষ্মী জ্ঞানে।

বাজানো হয় না এমন আরও একটি শাঁখ হল জলশঙ্খ। এই ধরনের শাঁখ সাধারণত ছোট হয়, বামাবর্ত হয় এবং এর মুখ কাটা থাকে না অর্থাৎ অক্ষত হয়। এই শাঁখ পুজোপার্বণে ব্যবহার করা হয় প্রতিমার অভিষেক স্নানের জন্য।

এ ছাড়া বাজানোর শাঁখ হিসাবে রয়েছে পঞ্চমুখী শঙ্খ, মোতিশঙ্খ, গোমুখী শঙ্খ। পঞ্চমুখী শাঁখের বিশেষত্ব এর গায়ে লেগে থাকা কাঁটা কাঁটা অংশ। এই ধরনের শাঁখের আওয়াজ হয় গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ। বিশ্বাসীদের অনেকে এই শাঁখকে শিবের পঞ্চানন রূপের সঙ্গে তুলনা করেন। মোতি শঙ্খের আওয়াজ নরম। তবে এই শাঁখ দেখতে সুন্দর। এক বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শাঁখের উপরের অংশটি তুলে দেওয়া হয় বলে এই শাঁখ মুক্তোর মতো উজ্জ্বল সাদা হয় আর এর আলো পরলে এর থেকে রামধনু রং ঠিকরে বেরোয়। গোমুখী শাঁখের সামনে অংশটি গরুর মুখের মতো দেখতে হয় বলে একে গোমাতা বা গৌরী হিসাবে পুজো করেন অনেকে।

সোজা কথায়, পুরাণে-মহাকাব্যে রণধ্বণি হিসাবে ব্যবহৃত শাঁখের আওয়াজ আর এ যুগে দুর্গতিনাশিনীর আবাহনের শাঁখের আওয়াজের উদ্দেশ্যের তফাত নেই বিশেষ। বজ্রনাদে হোক বা মধুর ধ্বনিতে উভয় ক্ষেত্রেই শাঁখ দুষ্টের দমনের আর শিষ্টের পালনেরই শুভবার্তা দিয়ে এসেছে এবং আসছেও।


সংক্ষেপে
  • লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
  • উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
  • সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্‌সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
Conch shell blowing Puja Special

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy