উত্তমকুমার— এই নামটি শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়। মৃত্যুর এত বছর পরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যত বাঙালি রয়েছেন, তাঁদের কাছে উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র ও তাঁর ছবির গান, আবেগ, প্রেম ও নস্টালজিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়েও উত্তমকুমার অভিনীত গানগুলির আবেদন একটুও কমেনি। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মহানায়কের অমলিন স্মৃতি, কালজয়ী সুর এবং জাদুময় মুহূর্তগুলি উদ্যাপন করতে নব রবিকিরণ ও নব নালন্দা সঙ্গীত শিক্ষায়তন যৌথ ভাবে উত্তম মঞ্চে নিবেদন করল এক অভিনব সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল— এক শো-এ উত্তম।
গান, নৃত্য এবং কুশলী অভিনয়ের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে মঞ্চে তৈরি করা হয়েছিল সম্পূর্ণ সিনেম্যাটিক দৃশ্যপট ও আবহ। নব নালন্দার শিক্ষার্থী এবং বিশিষ্ট শিল্পীদের পরিবেশনায় উত্তম যুগের সেই স্বর্ণালী দিনগুলি মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠল। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও পরিচালনার জন্য অরিজিৎ মিত্র ও সুব্রতবাবু মুখোপাধ্যায়ের সাধুবাদ প্রাপ্য।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্ক্রিনে ফুটে উঠল ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছায়াছবির সেই বিখ্যাত অংশ, ধ্বনিত হল ‘কা তব কান্তা’। এই অপূর্ব প্রয়োগ অনুষ্ঠানটিকে এক বিশেষ মাত্রায় পৌঁছ দিল প্রথমেই। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছায়াছবির গান ‘আমার এ যৌবন’-এর উপস্থাপনায় চমক ছিল, কিন্তু গানটির আরও মহড়ার প্রয়োজন ছিল। ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র জনপ্রিয় গান ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ চমৎকার ভাবে পরিবেশন করলেন তৃষা পাড়ুই। শমীক পালের কণ্ঠে ‘ঝড় উঠেছে, বাউল বাতাস’ দর্শককে নিয়ে গেল পুরনো দিনে। সুন্দর পরিবেশনা। সৈকত শেখরেশ্বর ও অঙ্কিতা শোনালেন ‘সাগরিকা’ ছায়াছবির গান ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’ এবং সিসপিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় শোনালেন ‘হারানো সুর’-এর গান ‘তুমি যে আমার’। দু’টি গানই সুগীত। ‘সূর্য ডোবার পালা’ গানটির পরিবেশনে শমীক পাল ও অরিঘ্নি মিত্রের রসায়নটি বেশ আকর্ষক হয়ে উঠেছিল। ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’র লিড পুরুষকণ্ঠে হলে গানটির প্রতি সুবিচার করা হত। ‘এই মায়াবী তিথি’ (‘সোনার হরিণ’) তৃষা পাড়ুইয়ের কণ্ঠে শুনতে ভাল লাগে।
গানের মাঝে ‘সপ্তপদী’ ছায়াছবির ওথেলোর অভিনয়াংশটি আকর্ষক উপস্থাপনা। ওথেলোর ভূমিকায় সৌম্য সামন্তের অভিনয় বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। ডেসডিমোনার চরিত্রে কৃত্তিকা চৌধুরী যথাযথ। শোভন গঙ্গোপাধ্যায় ও শুভম পালের কণ্ঠে ‘দুই ভাই’ ছায়াছবির গান ‘তারে বলে দিও’ শ্রুতিমধুর উপস্থাপনা। এই গানে তবলায় সুভাষ পাল অনবদ্য। সৈকত শেখর শোনালেন, ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’ (দেয়া নেয়া)। গানটি সুগীত। ‘জীবনমৃত্যু’ ছায়াছবি থেকে নাট্যাংশটি জমল না। ‘ছোটি সি মুলাকাত পেয়ার বন গয়ি’ গানটি আরফান ও সিসপিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় নৃত্য সহযোগে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করলেন। এই অনুষ্ঠানের গ্রন্থনায় ছিলেন সাম্য কার্ফা ও শ্রবণা শীল। তাঁদের সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত বাচন অনুষ্ঠানে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল।
দ্বিতীয়ার্ধে সুব্রতবাবু মুখোপাধ্যায়ের গানের মাধ্যমে প্রস্তাবনা বিশেষ আবহের সৃষ্টি করেছিল। অরিত্র দাশগুপ্ত অ্যান্টনি কবিয়ালের সাজে চমৎকার অভিনয় ও গান উপহার দিলেন। বিশেষ উল্লেখ্য, ‘তুই আমায় দয়া করবি কিনা বল’। যোগেশ্বরী ও ভোলা ময়রার সঙ্গে অ্যান্টনি কবিয়ালের গানের লড়াই চমৎকার ভাবে পরিবেশিত হল। দোহারের দলের পরিকল্পনাটি অভিনব। যোগেশ্বরীর গানে কৃত্তিকা রায়চৌধুরী ও ভোলা ময়রার গানে দেবাদৃত চট্টোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য। এই পুরো উপস্থাপনাটির একটি নতুনত্ব ছিল, যা মনে দাগ কেটে যায়। ‘লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে’ গানটির সঙ্গে নেপথ্যে পুরুষকণ্ঠের আওয়াজ বেমানান লেগেছে। কচিকাঁচারা গাইলেই ভাল হত। ‘আমাদের ছুটি ছুটি’ (‘জয়জয়ন্তী’) আশানুরূপ হয়নি। মঞ্চে ফুটবল সহযোগে ‘ধন্যি মেয়ে’ ছায়াছবির গান ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ একটি অভিনব উপস্থাপনা। আরফিন রানা ও ঋক বসু ফুটবলে শট মারতে মারতে গানটি সুন্দর গেয়েছেন। ‘ছদ্মবেশী’ ছায়াছবির গান ‘আমি কোন পথে যে চলি’ গানের এন্ট্রি খুবই চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছিল। গৌরব সরকার গানটি সুন্দর গেয়েছেন। শমীক পালের কণ্ঠে ‘যা রে যা উড়ে রাজার কুমার’ (‘সোনার খাঁচা’) গানটি ভাল লাগলেও, গানের সঙ্গে নাচটি বেমানান লেগেছে। গৌরব সরকার শোনালেন ‘সন্ন্যাসী রাজা’র গান ‘ভালবাসার আগুন জ্বালাও’। গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনাও যথাযথ। সুজয় ভৌমিকের কণ্ঠে ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’, দীপাবলি রুদ্র দত্তের কণ্ঠে ‘বিশ্বপিতা তুমি হে প্রভু’ এবং তাঁদের দ্বৈতকণ্ঠে ‘পৃথিবী বদলে গেছে’ সুখশ্রাব্য উপস্থাপনা। অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছায়াছবির গান ‘শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত’ গানটির ভূমিকাতে যে অংশটি অভিনীত হল,তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ‘অগ্নীশ্বর’ ছায়াছবিতে ব্যবহৃত সংলাপের সঙ্গে ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ একটি সার্থক প্রয়োগ।
সামগ্রিক ভাবে একটি মনে রাখার মতো অনুষ্ঠান। এর জন্য সুব্রতবাবু মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ ভূমিকা প্রশংসনীয়। বেশির ভাগ শিল্পী কোনও কাগজের সাহায্য ছাড়াই অনুষ্ঠানটি মঞ্চস্থ করলেন— যা প্রমাণ করে মহড়ার নিষ্ঠা ও গাওয়ার আনন্দ। যাঁরা যন্ত্রসঙ্গীতে সহযোগিতা করেছিলেন, তাঁরা হলেন শুভেন্দু দাস (সিন্থেসাইজ়ার), মনোমিত রায় (অক্টোপ্যাড), শুভ্র রায় (বেস গিটার), দিব্যজ্যোতি মুখোপাধ্যায় (গিটার) এবং সুভাষ পাল (তবলা)। সুভাষ পালের তবলাবাদন অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।
উত্তমকুমারের গান বাঙালির প্রেম, বিরহ, আনন্দের দলিল। যত দিন বাংলা সিনেমা ও বাংলা গান থাকবে, মহানায়কের লিপে এই সুরের জাদু বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেই!