ভিলাই থেকে দুবাইয়ে ভিলা, ফলের রস বিক্রি থেকে ধনকুবের! ২০০ কোটির বিয়েই কাল হল মহাদেব বেটিংকাণ্ডের মাথার
ছত্তীসগঢ়ের ভিলাইয়ের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান সৌরভ। তাঁর বাবা ভিলাই পুরসভায় কাজ করতেন। মা ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। স্থানীয় সূত্রে খবর, সৌরভ খুব অল্প বয়সেই উপার্জন শুরু করেন।
এক সময় ছিলেন সাধারণ ফলের রস বিক্রেতা। সেখান থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক। বিয়ে করেন দুবাইয়ে। সেই বিয়েতে খরচ করেন ২০০ কোটি টাকা! মহাদেব অ্যাপ জালিয়াতি মামলার মূল চক্রী সৌরভ চন্দ্রকারের উত্থান এবং পতন সত্যিই নজরকাড়া।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। সৌরভ ছিলেন ছত্তীসগঢ়ের ভিলাইয়ের এক সাধারণ তরুণ। একটি ফলের রসের দোকান ছিল তাঁর। মাসে আয় করতেন মেরেকেট ১৫ হাজার টাকা। সেখান থেকে কয়েক বছরের মধ্যে ভিলাই ছেড়ে দুবাইয়ের বিলাসবহুল ভিলায় বসবাস শুরু করেন তিনি। যাতায়াত করতে শুরু করেন ব্যক্তিগত বিমানে। এমন ধুমধাম করে বিয়ে করেন, যার খরচ তদন্তকারীদের অনুমান অনুযায়ী প্রায় ২০০ কোটি টাকা!
আর সৌরভের এই দুই ভিন্ন জীবনযাবনের মাঝেই লুকিয়ে ‘মহাদেব অনলাইন বুক’ অর্থাৎ, মহাদেব অ্যাপ জালিয়াতির কাহিনি। ছত্তীসগঢ়ে গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক বেটিং সাম্রাজ্যটি বর্তমানে ভারতের অন্যতম বড় আর্থিক তছরুপ সংক্রান্ত তদন্তের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। মহাদেব অ্যাপ জালিয়াতির অন্যতম মূল চক্রী সৌরভকে এক সময় ভারতীয় তদন্তকারীদের নাগালের বাইরে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু তাঁকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওমান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে রবিবার।
সৌরভের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ভিলাইয়েরই বাসিন্দা রবি উপ্পল-সহ আরও কয়েক জনের সঙ্গে মিলে একটি অবৈধ বেটিং সিন্ডিকেট চালাতেন। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের দু’টি মামলা এবং ইডির একটি আর্থিক তছরুপের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় তাঁকে রায়পুরের একটি সিবিআই আদালতে হাজির করানো হয়েছিল। সৌরভের ফিরে আসা তাঁর জীবনের এই নাটকীয় পরিবর্তনের দিকে নতুন করে সবার নজর কেড়েছে। সেই সঙ্গে রয়ে গিয়েছে এক অমোঘ প্রশ্ন। কী ভাবে একটি শিল্পনগরীর সাধারণ ব্যবসা আন্তর্জাতিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ লেনদেনকারী এক নেটওয়ার্কে পরিণত হল?
ভিলাইয়ের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান সৌরভ। তাঁর বাবা ভিলাই পুরসভায় কাজ করতেন। মা ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। স্থানীয় সূত্রে খবর, সৌরভ খুব অল্প বয়সেই উপার্জন শুরু করেন। ২০১৪-১৫ সাল নাগাদ ভিলাইয়ের একটি পোশাকের দোকানে কাজ করার পর তিনি ফলের রসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। সৌরভের পরিবার নেহরু নগরে ‘জুস ফ্যাক্টরি’ নামে একটি দোকান চালাতেন। ইডির তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যবসা থেকে মাসে প্রায় ১৫,০০০ টাকা আয় করতেন সৌরভ।
আরও পড়ুন:
এর মধ্যেই ভিলাইয়ের বাসিন্দা রবি উপ্পলের সঙ্গে পরিচয় হয় সৌরভের। রবি আগে থেকেই বেটিং সংক্রান্ত অবৈধ কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী কালে সৌরভের সঙ্গে রবির বন্ধুত্ব অন্য মাত্রায় পৌঁছোয়। একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন তাঁরা। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই দু’জনে মিলে এমন একটি বেটিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা ছত্তীসগঢ়ের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অবৈধ ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় দুবাইকে।
তবে ব্যবসার রমরমা বাড়ে কোভিড অতিমারির সময়। কারণ, ওই সময় অনলাইনে গেমিং এবং বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলির বাড়বাড়ন্ত লক্ষ করা গিয়েছিল। ফলে প্রাথমিক ভাবে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সৌরভদের বেটিং ব্যবসা ধীরে ধীরে এজেন্ট, ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি অপারেটর এবং মধ্যস্থতাকারীদের এক বিশাল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।
ইডি এবং সিবিআইয়ের তদন্তকারীরা মনে করছেন, সৌরভ এবং রবি ছিলেন ‘মহাদেব অনলাইন বুক’-এর প্রধান মাথা। অভিযোগ, ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, তাস খেলা-সহ বিভিন্ন ইভেন্টে অবৈধ বাজি ধরার কাজে এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহৃত হত। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, দুবাইয়ে ছিল মহাদেব বেটিং অ্যাপের প্রধান কার্যালয়। সেখান থেকেই পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হত। ভারতেও সংস্থাটির হাজার হাজার ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি এবং শাখা সক্রিয় ছিল।
স্থানীয় অপারেটরদের কাছে অ্যাপে প্রবেশের প্রয়োজনীয় তথ্য থাকত। গ্রাহকদের সেই অ্যাপে যুক্ত করা, অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা এবং টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল তাঁদের উপরেই। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে এবং যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হোয়াট্সঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ইডি জানিয়েছে, সিন্ডিকেটটি মুনাফা ভাগাভাগির ভিত্তিতে চলত। সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ চলে যেত সৌরভ এবং রবিদের কাছে। প্ল্যাটফর্মটি যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাঁরাও মোটা টাকা পেতেন। তদন্তে ‘রেড্ডি অণ্ণা’, ‘ফেয়ারপ্লে’, ‘স্কাইএক্সচেঞ্জ’ এবং ‘লোটাস৩৬৫’-এর মতো অন্যান্য বেটিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেও এদের যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, আর্থিক লেনদেনের জন্য অসংখ্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হত। এর মধ্যে কিছু অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল সন্দেহজনক নথিপত্র ব্যবহার করে। আবার কিছু অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতেন মধ্যস্থতাকারীরা। এর পর বিভিন্ন লেনদেনের মাধ্যমে এই অর্থ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জটিল প্রক্রিয়ায় (লেয়ারিং) ‘হাওয়ালা’ চ্যানেলে বিদেশে পাচার করা হত। তদন্তকারী সংস্থাগুলির আরও অভিযোগ, নিজেদের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই সিন্ডিকেট সরকারি কর্মকর্তাদের ‘প্রোটেকশন মানি’ বা ঘুষ দিত।
সৌরভের আর্থিক উত্থান জনসমক্ষে সে ভাবে না এলেও, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাস আল-খাইমাহতে আয়োজিত তাঁর বিয়ে তাঁকে সবার নজরে নিয়ে আসে। ‘মহাদেব’ সংক্রান্ত তদন্তের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয় সেই বিয়ের অনুষ্ঠান।
ইডি সূত্রে খবর, এই বিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। ভারত থেকে অতিথি এবং শিল্পীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য চার্টার্ড বিমানের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। বিলাসবহুল হোটেল, জমকালো সাজসজ্জা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান এবং ব্যয়বহুল ভ্রমণের আয়োজন ছিল এই উৎসবের অংশ।
ইডি-র অভিযোগ, এ সব খরচের অর্থ নগদ এবং হাওয়ালার মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল ১১২ কোটি টাকা। প্রায় ৪২ কোটি টাকার হোটেল বুকিংও করা হয়েছিল। এর পরেই সৌরভের অর্থের উৎস এবং গতিপথ খুঁজে বার করতে সৌরভের উপর নজরদারি শুরু করেন তদন্তকারীরা। সৌরভের বিয়ে তদন্তকারীদের কাছে বেটিং সিন্ডিকেটের আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশদে জানার একটি সুযোগ করে দেয়।
২০২৬ সালের মার্চে মহাদেব মামলায় ইডি প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের বিভিন্ন সম্পত্তি সাময়িক ভাবে বাজেয়াপ্ত করে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ১৮টি এবং নয়াদিল্লিতে ২টি সম্পত্তি ছিল। এর পর তদন্তকারীরা দেখেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর পাসপোর্ট সংগ্রহ করে রেখেছেন সৌরভ।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌরভ ২০২২ সালের মে মাসে ভানুয়াতুর পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। অথচ সেই সময়ে তাঁর কাছে একটি ভারতীয় পাসপোর্টও ছিল। সৌরভের এই বিদেশি নাগরিকত্ব এবং বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের বিষয়টি তাঁকে খুঁজে বার করা এবং ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্য দিকে বেটিংকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শেষ পর্যন্ত ছত্তীসগঢ়ের রাজনৈতিক আঙিনা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ইডির অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ‘প্রোটেকশন মানি’ হিসেবে দেওয়া হত। এ ছাড়া রাজনৈতিক ভাবে সুবিধাভোগীদের নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলি ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণার সময় বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়।
সবচেয়ে বিতর্কিত অভিযোগগুলির একটি ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বঘেলের সঙ্গে ৫০৮ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ। যদিও বঘেল সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন। বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। এর পর ছত্তীসগঢ়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে রাজ্যটির ‘ইকোনমিক অফেন্সেস উইং’ (অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা) একটি এফআইআর দায়ের করে, যেখানে বঘেল, সৌরভ, রবি, শুভম সোনি-সহ বেশ কয়েকজনকে মহাদেব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।
পরে রাজ্য সরকার বেটিং-সংক্রান্ত মামলাগুলি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়। নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ভারত ছেড়েছিলেন সৌরভ। ভারতীয় সংস্থাগুলি যখন তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি দেশের বাইরেই ছিলেন। পরে জানা যায়, সৌরভ রয়েছেন ওমানে। সেখানে ইন্টারপোলের ‘রেড কর্নার নোটিস’-এর ভিত্তিতে স্থানীয় পুলিশ তাঁকে আটক করে। সিবিআই এবং ইডি তাদের তদন্তে সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ জানায়। ভারত এবং ওমানের কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের পর রবিবার ভারতে ফিরিয়ে আনা হয় সৌরভকে।