হাসিনার ‘ঘর ওয়াপসির’ মুখে ফের অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ! ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্রে পদ্মাপারের ‘মৌলবাদী’রা?
ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ঘর ওয়াপসি’র মুখে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। অন্য দিকে, নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে চক্রান্তের সলতে পাকাচ্ছেন সে দেশের কট্টরপন্থীরা।
দু’বছর তিন মাসের মাথায় ফের অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। বিক্ষোভের আগুনে বিশেষ করে পুড়ছে ঢাকা ও গাজিপুর। আন্দোলনকারী ও পুলিশের খণ্ডযু্দ্ধে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে পদ্মাপার। সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ভারতবিরোধী স্লোগানও। ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা ‘বঙ্গবন্ধু’ মুজিবর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনার। ঠিক তার আগে অশান্তি মাথাচাড়া দেওয়ায় চিন্তা বাড়ছে নয়াদিল্লিরও।
চলতি বছরের ১ নভেম্বর পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে মাথাচাড়া দেয় অশান্তি। ওই দিন বেতনবৃদ্ধির দাবিতে পথে নামেন কয়েক হাজার বস্ত্রকর্মী। আন্দোলনকারীদের দাবি, ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০,০০০ টাকা করতে হবে। ভারতীয় মুদ্রায় সেটা ২৩,০০০ রুপি। পুলিশ তাঁদের বাধা দিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। চলে দেদার ইটবৃষ্টি ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ।
এর পর পরিস্থিতি সামাল দিতে তড়িঘড়ি আধা সেনা নামায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। তাতেও অবশ্য বিক্ষোভকারীদের দমানো যায়নি। ঢাকার মিরপুরে বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা। পাল্টা লাঠিচার্জ করে পুলিশও। ফাটায় কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড-গ্রেনেড। এ ছাড়া, উর্দিধারীদের জলকামানের মুখেও পড়তে হয়েছে পোশাকশ্রমিকদের।
১ তারিখ পুলিশের গাড়ি ও পিকআপ ভ্যানে আন্দোলনকারীরা আগুন দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ওই দিনই অশান্তি পাকানোর অভিযোগে বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করে তারেক সরকার। কিন্তু, তাতেও পোশাকশ্রমিকদের দমানো যায়নি। ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার সকাল থেকে ফের দানা বাঁধে বিক্ষোভ। এ বার মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় কাঠের আসবাব জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান তাঁরা।
বাংলাদেশি পোশাকশ্রমিকদের ক্ষোভের নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই খুব কম বেতনে কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। ভারতীয় মুদ্রায় প্রতি মাসে মেরেকেটে ৯,৬০০ রুপির বেশি পান না তাঁরা। অন্য দিকে, জটিল ভূ-রাজনীতির কারণে বিশ্ব বাজারে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে খনিজ তেলের দাম। সেই আঁচে হু-হু করে বাড়ছে ঢাকার মূল্যবৃদ্ধির সূচক।
আরও পড়ুন:
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, মূদ্রাস্ফীতির কাঁটায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় দামের ছ্যাঁকায় পকেট পুড়ছে তাঁদের। অন্য দিকে, বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন না-বাড়ায় সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছেন তাঁরা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ঢাকার বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে পোশাকশিল্প। পদ্মাপারের দেশটিতে প্রায় ৪,০০০ নথিভুক্ত বস্ত্র কারখানা রয়েছে।
পোশাক রফতানিকারী দেশ হিসাবে চিনের পরেই দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ। গত আর্থিক বছরে (পড়ুন, ২০২৫-২৬) সেখান থেকে ৩,৮৭০ কোটি ডলার আয় করেছে ঢাকা। পদ্মাপারের দেশটি থেকে বিশ্বের আনুমানিক ১৫০টি দেশে সরবরাহ হয় পোশাক। রেডিমেড ও কাপড়, দু’ধরনের বস্ত্রই বিদেশে পাঠায় তারা। সেখানকার কারখানা ও মিলে কাজ করেন ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক।
বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের ব্যাপক চাহিদার অন্যতম বড় কারণ হল দাম। শ্রমিক সস্তা হওয়ার কারণে ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলির তুলনায় অনেকটাই কম মূল্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে সেগুলি বিক্রি করে থাকে ঢাকা। তারেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এতে ছ’শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। এ বছরের জুলাই-অক্টোবরে বস্ত্র রফতানিতে ১,৭০০ কোটি ডলার রোজগার করেছে তারা।
এই পরিস্থিতিতে পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে তৎপর হয়েছে তারেক সরকার। আন্দোলন শুরুর প্রথম দিনেই ছ’সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সেই সঙ্গে পদ্মাপারে তুঙ্গে উঠেছে রাজনৈতিক তরজা। অশান্তির জন্য হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায় তুলেছে ক্ষমতাসীন ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি’ (বিএনপি)।
আরও পড়ুন:
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাঁর দাবি, অশান্তিতে উস্কানি দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত পোশাকশিল্প সংস্থার মালিকদের একাংশ। একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে তারেকের উপদেষ্টা মাহদি আমিনকেও। নাম না করে ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের’ যোগসূত্রকে এই অস্থিরতার জন্য দায়ী করেছেন তিনি।
অন্য দিকে, চুপ করে বসে নেই আওয়ামী লীগও। পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে লম্বা পোস্ট করেছেন হাসিনা-পুত্র সাজেব ওয়াজ়েদ জয়। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমাদের পোশাকশ্রমিকদের বেতনের বড় অংশই তো ভাড়া দিতে খরচ হয়ে যায়। কী ভাবে চাল-ডাল-তেল-নুন কিনবে? আজ তাই তাঁরা ক্ষুধার্ত।’’
ভারতের পূর্বের প্রতিবেশীর ঘরে আগুন জ্বলার জন্য শুধুমাত্র পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষকে দায়ী করা অবশ্য ভুল হবে। এর নেপথ্যে আরও কয়েকটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। গত ২৬-২৯ অক্টোবর জাপানে সফর করেন বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী তারেক। তার পরই ঢাকার এক লাখ শ্রমিকের জন্য টোকিয়ো দরজা খুলতে চলেছে বলে সমাজমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজমাধ্যমের পোস্টে আরও বলা হয়, দেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত কমতে থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে পাঁচ বছরের ‘শ্রমিক সমঝোতা’ করেছে জাপান। এই গুজবে কান দিয়ে তাকাইচি সরকারের তুলধোনা করেন দ্বীপরাষ্ট্রের আমজনতা। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইউরোপের উদাহরণ টেনে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন চরম আতঙ্কগ্রস্ত সেখানকার নাগরিকদের একাংশ।
এই অবস্থায় আমজনতার ক্ষোভ প্রশমনে আসরে নামে জাপান সরকার। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে এক্স হ্যান্ডলে তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন টোকিয়োর বিদেশ মন্ত্রকের প্রেস সচিব কিতামুরা তোশিহিরো। তাঁর দাবি, ‘‘প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও রহমানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই ধরনের কোনও আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশের লক্ষাধিক শ্রমিক আসার খবর সর্বৈব মিথ্যা।’’
তোশিহিরোর এই পোস্টে পদ্মাপারের পোশাকশ্রমিকদের স্বপ্নে যে জল পড়েছে, তা বলাই বাহুল্য। তবে, বাংলাদেশের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করতে আগ্রহী টোকিয়ো। সূত্রের খবর, এ ব্যাপারে তারেক সরকারের সামনে একটি শর্ত রেখেছে জাপান। সেটা হল, ওই বন্দরকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্বের ভারতের রাজ্যগুলিতে পণ্য দেওয়া-নেওয়া করতে দিতে হবে তাদের।
কিন্তু, এ ব্যাপারে কট্টর দিল্লিবিরোধী হিসাবে পরিচিত ‘ন্যাশনাল সিটিজ়েন পার্টি’ বা এনসিপির প্রবল আপত্তি রয়েছে। উল্টে গঙ্গা জলচুক্তিকে সামনে এনে সুর চড়িয়েছে তারা। সম্প্রতি ঢাকায় বিশাল জনসভা করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সেখানেই নতুন করে ‘দিল্লি না ঢাকা?’ স্লোগান তোলেন তিনি। সমাবেশে যোগ দেওয়া এনসিপি সমর্থকদের চিৎকার করে ‘ঢাকা, ঢাকা’ বলতে শোনা গিয়েছে।
১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের মেয়াদে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তি করে বাংলাদেশ। এ বছরের ১২ ডিসেম্বর শেষ হবে ওই সমঝোতা। নাহিদের বক্তব্য, ‘‘ঢাকাকে নদীর প্রাপ্য জল দিতে বাধ্য দিল্লি। আমরা ন্যায্য অধিকার এক ইঞ্চিও ছেড়ে দেব না।’’ এ দেশের গঙ্গা পূর্বের প্রতিবেশীতে পদ্মা নামে পরিচিত। এর উপর সেখানকার এক তৃতীয়াংশ বাসিন্দার জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান শেখ হাসিনা। ফলে, দেশে ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি। সেই আন্দোলনের অন্যতম বড় মুখ ছিলেন নাহিদ। তাঁর দলের সাংসদ হাসনাত আবদুল্লাহকেও বহুবার এ দেশের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিকে বিচ্ছিন্ন করার কথা বলতে শোনা গিয়েছে। ঢাকায় এনসিপির সাম্প্রতিক সভায় হাজির ছিলেন তিনিও।
এ বছরের ডিসেম্বরে ঘরে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন হাসিনা। মুজিব-কন্যা ঢাকায় নামলে পদ্মাপারে আরও তীব্র হবে অশান্তি? চাপে পড়বে তারেক রহমান সরকার? জটিল পরিস্থিতিতে গঙ্গা চুক্তি নিয়েই বা কী সিদ্ধান্ত নেবে নয়াদিল্লি? এ সব কিছুরই উত্তর দেবে সময়।