‘হালাল’ হাতিয়ার হাতে পেতে চার ইয়ারি কথা! ‘সিঁদুর’-এর শোধ তুলতে অস্ত্রে স্বনির্ভরতা বাড়াতে পারবে পাকিস্তান?
চলতি বছরের ২১ অক্টোবর প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারককে সই করে চারটি মুসলিম রাষ্ট্র। এর উপর ভিত্তি করে ঘরের মাটিতেই একের পর এক অত্যাধুনিক হাতিয়ার তৈরি করতে পারবে ইসলামাবাদ?
সামরিক প্রশ্নে এককাট্টা চার মুসলিম রাষ্ট্র। যৌথ ভাবে ‘হালাল’ হাতিয়ার তৈরির ‘শপথ’ নিয়েছে তারা। এর জেরে আগামী দিনে একসঙ্গে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও লড়াকু জেট উৎপাদনে ঝাঁপাতে পারে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া। ভারতের জন্য সেটি কতটা বিপজ্জনক? এতে কি শক্তি বাড়িয়ে নয়াদিল্লির উপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে ইসলামাবাদ? আশঙ্কায় ভরা বদর সমঝোতা ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা।
চলতি বছরের ২১ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় একটি স্মারক সমঝোতা বা মউ (মেমরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষর করে চারটি মুসলিম রাষ্ট্র, যার পোশাকি নাম ‘বদর’। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কথায়, এর মাধ্যমে একটি ইসলামীয় সামরিক শিল্প তালুক গড়ে তুলতে চাইছে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া। যাতে আগামী দিনে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অস্ত্রের ব্যাপারে তাদের কোনও চিন্তা করতে না হয়।
বদর মউ এই চার দেশের মধ্যে সই হওয়া প্রথম কোনও প্রতিরক্ষা সমঝোতা নয়। গত কয়েক বছর ধরেই যৌথ ভাবে বেশ কিছু হাতিয়ার তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও কাতার। এ ব্যাপারে পৃথক পৃথক কর্মসূচিও নিতে দেখা গিয়েছে তাদের। তবে, সেগুলির সঙ্গে বদর-এর নীতিগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করেছেন নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নীথান।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, বদর সমঝোতায় দু’টি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলি হল, যৌথ ভাবে ‘হালাল’ মানের হাতিয়ার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণ এবং অস্ত্রের ব্যাপারে বিদেশি নির্ভরশীলতা হ্রাস। সন্দীপ জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে ইসলামাবাদ, আঙ্কারা, দোহা ও জাকার্তার আলাদা আলাদা শক্তি ও দুর্বলতা রয়েছে। তবে, তাদের পক্ষে ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের অস্ত্র আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা বেশ কঠিন।
আরবি শব্দ ‘হালাল’-এর অর্থ হল বৈধ বা উপযোগী। সন্দীপ মনে করেন, বদর সমঝোতাকে সামনে রেখে প্রতিরক্ষা শিল্পকে একীভূত করতে চাইছে এই চার মুসলিম রাষ্ট্র, যেখানে বিপুল পরিমাণে উৎকৃষ্ট মানের হাতিয়ার উৎপাদন করতে পারবে তারা। সেই লক্ষ্যেই ধর্মীয় জিগির তুলে ‘হালাল’ অস্ত্র নির্মাণের কথা বলতে শোনা যাচ্ছে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়াকে।
আরও পড়ুন:
উল্লেখ্য, বদর মউ-তে সই করা চারটি দেশেরই নিজস্ব শক্তিশালী ফৌজ রয়েছে। তবে, তারা প্রত্যেকেই বিদেশি হাতিয়ারের উপর মারাত্মক রকম নির্ভরশীল। উদাহরণ হিসেবে, পাক বিমানবাহিনীর কথা বলা যেতে পারে। কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনা লড়াকু জেট দিয়েই গঠিত হয়েছে তাদের বায়ুসেনার বহর। ইসলামাবাদের হাতে রয়েছে ওয়াশিংটনের এফ-১৬, সি-১৩০ হারকিউলিস এবং বেজিঙের জে ১০সি-র মতো যুদ্ধবিমান।
বর্তমানে চিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ৪.৫ প্রজন্মের জেএফ-১৭ থান্ডার লড়াকু জেট উৎপাদনে জোর দিয়েছেন পাক সেনাসর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটির ইঞ্জিন ও অন্যান্য সরঞ্জামের পুরোটাই বেজিং থেকে আমদানি করছে ইসলামাবাদ। কারণ, ঘরের মাটিতে সেগুলি তৈরি, এমনকি এ নিয়ে গবেষণার পরিকাঠামোও নেই তাদের।
একই ছবি ইন্দোনেশিয়ারও। বিমানবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতে বিভিন্ন দেশ থেকে লাগাতার লড়াকু জেট আমদানি করে যাচ্ছে জাকার্তা। সেই তালিকায় রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬, রাশিয়ার সু-২৭, সু-৩০, দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে-র (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) টি-৫০ গোল্ডেন ঈগল এবং ফ্রান্সের রাফাল। এ ছাড়া, চিনা জেট জে-১০সি কেনার কথাও ভাবছে মলাক্কা প্রণালী সংলগ্ন ওই দ্বীপরাষ্ট্র।
হাতিয়ারের ব্যাপারে কাতার আবার যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের উপর নির্ভরশীল। বদর মউ-তে সই করা চারটি মুসলিম দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থা অবশ্য কিছুটা ভাল। ‘বের্যাক্টার টিবি-২’র মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ‘খেলা ঘোরানো’ সামরিক ড্রোন ঘরের মাটিতেই উৎপাদন করে থাকে আঙ্কারা। তবে, অস্ত্রের প্রশ্নে তারাও পুরোপুরি স্বনির্ভর নয়।
আরও পড়ুন:
পাইলটবিহীন যান উৎপাদনে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছোলেও, লড়াকু জেটের ব্যাপারে ঢে়র পিছিয়ে আছে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’। তাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এফ-১৬’ এবং ব্রিটেন-জার্মানি-ইটালি-স্পেনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ইউরোফাইটার টাইফুনে’ বিমানবাহিনীর বহর সাজাতে বাধ্য হয়েছেন সেখানকার প্রেসিডেন্ট রেজ়েপ তাইয়িপ এরদোয়ান।
সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরশীলতার বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এতে যে কোনও মুহূর্তে সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে আমদানিকারী দেশ। ২০১৯ সালে রাশিয়ার থেকে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমদানি করে তুরস্ক। সঙ্গে সঙ্গে আঙ্কারাকে পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তির ‘এফ-৩৫ লাইটনিং টু’ লড়াকু জেট রফতানি থেকে সরে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৯৯-২০০৫ সালের মধ্যে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে ইন্দোনেশিয়া। ওই পর্বে জাকার্তায় এফ-১৬ লড়াকু জেটের যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ রাখে ওয়াশিংটন। ফলে, অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায় ওই যুদ্ধবিমানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এই জটিলতা কাটিয়ে উঠতেই বদর সমঝোতায় সই করেছে চারটি মুসলিম রাষ্ট্র।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যৌথ উদ্যোগে বর্তমানে কিছু হাতিয়ার তৈরি করছে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া। তার মধ্যে কাপলান বা হারিমাউ শ্রেণির মাঝারি ওজনের মূল যুদ্ধট্যাঙ্কের কথা বলা যেতে পারে। একসঙ্গে যেটি নির্মাণ করেছে আঙ্কারা ও জাকার্তা। তালিকায় আছে পাক নৌবাহিনীর বাবর শ্রেণির চারটি করভেট যুদ্ধজাহাজ। তুর্কি নকশায় যার দু’টিকে করাচিতে তৈরি করিয়েছে ইসলামাবাদ।
সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের মধ্যে হাতিয়ারের লেনদেন বাড়িয়েছে বদর সমঝোতায় থাকা এই চারটি মুসলিম রাষ্ট্র। গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন বিপুল সংখ্যায় ‘বের্যাক্টর টিবি-২’ সামরিক ড্রোন পাকিস্তানকে সরবরাহ করে তুরস্ক। অন্য দিকে, আঙ্কারার থেকে ৪০০টি ‘এজ়দের ইয়ালচিন’ সাঁজোয়া যান এবং ‘আতমাকা’ জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কাতার ও ইন্দোনেশিয়াকে কিনতে দেখা গিয়েছে।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের দাবি, বদর সমঝোতায় লাভবান হতে পারে চার পক্ষই। কারণ, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটো-র সদস্যপদ রয়েছে তুরস্কের। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির গবেষণা ও উৎপাদনে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তারা। অন্য দিকে, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধি কাতারের টাকার অভাব নেই।
এর পাশাপাশি, ইন্দোনেশিয়ার বাজার ও পাকিস্তানের সস্তা শ্রমিক হাতে পাচ্ছে বদর মউ-তে সই করা চারটি দেশ। ফলে, আগামী দিনে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পতালুক গড়ে তুলতে পারে তারা, যেখানে লড়াকু জেট, ট্যাঙ্ক, কামান, রেডার ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্রের গবেষণা এবং উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া।
এ ব্যাপারে তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির কান লড়াকু জেটের প্রসঙ্গ তুলেছেন সন্দীপ। তাঁর কথায়, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরে এই যুদ্ধবিমান তৈরির মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আঙ্কারা। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগেই ৪৮টি জেটের বরাত দিয়ে রেখেছে ইন্দোনেশিয়া। কান-এর ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে পাকিস্তানেরও। এর গবেষণা শেষ করতে কাতারের পুঁজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’’
তবে, এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। এই ধরনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। ফলে, শেষ পর্যন্ত কোন হাতিয়ারের ক্ষেত্রে কে কতটা রাজি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন বিস্তর। গত শতাব্দীর ৫০ ও ৬০-এর দশকে এই ধরনের পদক্ষেপ করেন কিংবদন্তি মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের। ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু, সেই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি।