আকারে ভ্যাটিক্যানের চেয়ে সামান্য বড়, ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ আস্ত দেশ গড়ে তাক লাগালেন ২১ বছরের তরুণ
ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যবর্তী দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত এক টুকরো বিতর্কিত জমি। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ড্যানিয়েল ও তাঁর বন্ধুদের সৌজন্যে সেই জমিই আজ সংবাদ শিরোনামে।
পৃথিবীর বুকে থাকা ১৯৫টি রাষ্ট্রের সঙ্গে কি জুড়তে পারে আরও একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নাম? সেই ‘স্বষোষিত রাষ্ট্র’ আসলে ‘মালিকানাহীন’ ক্ষুদ্র এক খণ্ড জমি। সেই জমিকেই একটি ‘স্বাধীন প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ২১ বছর বয়সি এক তরুণ। সেই ভূখণ্ডের আয়তন মাত্র ১২১ একর।
তরুণ নিজেই ইউরোপীয় ওই ভূখণ্ডে তৈরি করেছেন আস্ত এক দেশ! শুধু তাই নয়, নিজেকেই সেই দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন।
স্বীকৃতি আদায়ের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ওই তরুণ। ভবিষ্যতে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেলে, আয়তনের নিরিখে এটি হবে বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ।
ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যবর্তী দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত এক টুকরো বিতর্কিত জমি। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধের জেরে জমিটি দীর্ঘ দিন ধরে দাবিহীন বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই জমিকে ‘টেরা নলিয়াস’ বলা হয়। সোজা বাংলায় তা হল, এমন এক ভূখণ্ড, যার উপর কোনও রাষ্ট্রের স্বীকৃত দাবি নেই।
এই জমিটি নিয়ে কোনও দেশই এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভাবে মালিকানা দাবি করেনি। আর, এই জমিতেই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ড্যানিয়েল জ্যাকসন ও তাঁর একদল সমর্থক ‘ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্দিস’ নামে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন।
আরও পড়ুন:
ভূগোলের প্রতি প্রবল আগ্রহী ড্যানিয়েল মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার সীমান্তে দানিউব নদীর তীরে এক খণ্ড এই জমিরটির সন্ধান পান। যার উপর কোনও দেশই আনুষ্ঠানিক ভাবে তাদের অধিকার দেখাতে পারেনি। এই আবিষ্কারই পরবর্তী কালে সেখানে ‘ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্দিস’ নামের একটি স্বঘোষিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে তোলার ভাবনার জন্ম দেয়।
২০১৯ সালের ৩০ মে তিনি এই ভূখণ্ডের একটি অংশকে, যা মানচিত্রে আনুষ্ঠানিক ভাবে পকেট-৩ নামে পরিচিত, সেটিকেই ‘ভার্দিসের মুক্ত প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। চার বছর পর, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ড্যানিয়েল তাঁর একদল বন্ধু তথা সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে ওই জমিতে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কথা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের পরিকল্পিত এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের আয়তন ভ্যাটিকান সিটির চেয়ে সামান্য বেশি। তাঁরা এই স্বঘোষিত রাষ্ট্রের নাম দেন ‘ভার্দিস’।
ভার্দিস নামটি এসেছে লাটিন শব্দ থেকে, যার অর্থ সবুজ। এই নামের মধ্যে যেমন দাবিহীন অঞ্চলটির অসংখ্য গাছপালা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতিফলন রয়েছে, তেমনই ফুটে উঠেছে প্রতিষ্ঠাতাদের পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন।
এই উদ্যোগের স্বীকৃতি মিলেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের সদর দফতরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সেখানে ড্যানিয়েলকে পুরস্কৃত করা হয়। ‘ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি রিসার্চ’-এর তরফে তাঁকে এই সম্মান প্রদান করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
পুরস্কার হাতে নিয়ে ড্যানিয়েল জানান, এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। উচ্চপদস্থ আধিকারিক থেকে বিশিষ্টজনেদের উপস্থিতির মাঝে পড়ে বেশ কিছুটা ঘাবড়েও গিয়েছিলেন তিনি। নিজেই এ কথা অকপটে স্বীকার করে নেন ২১ বছর বয়সি এই তরুণ। এমন অনুষ্ঠানে ডাক পাওয়া, তাবড় ব্যক্তিদের মাঝে উপস্থিত হওয়ার উত্তেজনার মধ্যেই ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।
গত ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ‘যুব সংহতি’ পর্বে বক্তৃতা পেশ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় ড্যানিয়েলকে। সেখানে ভার্দিসের মানবিক সহযোগিতা বিভাগের ‘মন্ত্রী’ জেফ্রি লি বক্তৃতা পেশ করেন। নিজেরা কী ধরনের কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতে তাঁদের কী পরিকল্পনা রয়েছে, সেই বিষয়গুলি তুলে ধরেন তিনি।
একটি পৃথক রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজটি ড্যানিয়েল ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের পক্ষে সহজ ছিল না। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা একটি ‘সরকারি কাঠামো’ গড়ে তোলেন। একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করেন এবং একটি অনলাইন কমিউনিটি গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন।
এই স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্রটিতে কয়েকশো মানুষকে ‘নাগরিকত্ব’ দেওয়ার কাজও সমাপ্ত। সারা বিশ্বের মানুষই এই দেশটির সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ও অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। তবে, রাষ্ট্রপুঞ্জ বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়নি ভার্দিস।
এই ক্ষুদ্র ‘প্রজাতন্ত্র’টি গড়ে তোলার জন্য নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে ড্যানিয়েলকে। ভার্দিসের মুক্ত প্রজাতন্ত্রে বসবাসের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৩ সালে, ক্রোয়েশীয় পুলিশ ড্যানিয়েল-সহ বেশ কয়েক জন বসতি স্থাপনকারীকে আটক করে সেখান থেকে বহিষ্কার করে। এমনকি, ক্রোয়েশিয়ায় প্রবেশের উপর আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা বসেছে ড্যানিয়েলের উপরে।
উপকূল বরাবর ক্রোয়েশিয়া ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এমনকি, সার্বিয়া দিয়েও সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁরা নির্বাসনে থেকেই ‘সরকার চালাচ্ছেন’ বলেও দাবি করেছেন ভার্দিসের ‘প্রেসিডেন্ট’ ড্যানিয়েল।