জমি দখল করে তৈরি হয় স্বতন্ত্র শহর, নেই আইনের মারপ্যাঁচ! এখানে থাকতে গেলে মানতে হয় অদ্ভুত সব নিয়ম
খাস ইউরোপের বুকেই রয়েছে এমন এক শহর। সেখানকার বাসিন্দারা সরকারের কথা কানে তোলেন না। নিজেদের মতো করে জীবন কাটান। সরকার নির্ধারিত আইনের পথেও হাঁটেন না তাঁরা।
আইনের মারপ্যাঁচ নেই। না রয়েছে কোনও সরকার। নিজেরা যেটা ঠিক মনে করেন, সেটাই করেন। এমন জায়গা যে বাস্তবে রয়েছে, তা অনেকের কাছেই কল্পনাতীত। কিন্তু, অবাস্তব ঠেকলেও এই পৃথিবীর বুকেই রয়েছে এমনই আইনহীন এক শহর!
খাস ইউরোপের বুকেই রয়েছে এমন এক শহর। সেখানকার বাসিন্দারা সরকারের কথা কানে তোলেন না। নিজেদের মতো করে জীবন কাটান। সরকার নির্ধারিত আইনের পথেও হাঁটেন না তাঁরা, নিজেরাই নিজেদের আইন তৈরি করে নেন।
শুনে মনে হতেই পারে যে যে ইউরোপের কোনও প্রত্যন্ত জায়গায় এই স্থান অবস্থিত। কিন্তু এ ধারণার পুরোটাই ভুল। ইউরোপের ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনেই রয়েছে এই আইনহীন জায়গা। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা সেখানে ঘুরতেও যান। জায়গাটির নাম ফ্রিটাউন ক্রিস্টিয়ানিয়া।
স্বশাসিত এই শহরের জন্ম হয় ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সেই সময় কোপেনহেগেনে আবাসন সম্পর্কিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তার জেরে বহু ডেনমার্কবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। সরকারের উপর ক্ষোভ থেকে আন্দোলন শুরু করেন তাঁরা। দাবি রাখা হয় থাকার জায়গার।
সেই সময় একদল আন্দোলনকারী, যাযাবর এবং শিল্পীরা কোপেনহেগেনের ক্রিশ্চিয়ানভ্যাশন এলাকায় অবস্থিত পরিত্যক্ত সামরিক ব্যারাকের দখল নেন। সেখানে জোরপূর্বক ঢুকে পড়েন তাঁরা। সামরিক ব্যারাকগুলিকে নিজেদের বাসস্থান বানিয়ে সেখানেই থাকা শুরু করেন।
আরও পড়ুন:
প্রায় ৩৪ হেক্টর মাপের জমি জোর করে দখল করে নেন তাঁরা। সেই জায়গার নাম দেওয়া হয় ফ্রিটাউন ক্রিস্টানিয়া। এ দলের মাথা ছিলেন যাঁরা, তাঁরা ঠিক করেন সরকারের তৈরি আইন সেখানকার বাসিন্দারা কেউ মানবেন না। সকলে নিজের ছন্দে জীবন কাটাবেন, নিজেরাই নিজেদের আইন তৈরি করে নেবেন।
১৯৭২ সালে সরকার এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। শুরু হয় আইনি ঝামেলা। শেষে সেখানকার বাসিন্দাদের নির্দিষ্ট অঞ্চলের জমি অর্থের বিনিময়ে কিনে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। স্বশাসিত শহর হিসেবে পাকাপাকি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রিটাউন ক্রিস্টানিয়া।
মোট ১৪টি এলাকা নিয়ে ফ্রিটাউন গঠিত। সেখানকার বাড়িঘরগুলিও অন্য অঞ্চলগুলির থেকে আলাদা। বেশির ভাগ বাড়িই যা হোক করে তৈরি। নির্মাণকার্যের নিয়ম না মেনেই এখানে বাড়ি তৈরি করে ফেলা যায়। কেউ আটকাতেও আসেন না।
ফ্রিটাউনে ঢুকলে মনে হয় যেন কোনও রঙিন শহরে ঢুকে পড়া হয়েছে। এখানকার রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দেওয়াল প্রভৃতি জুড়ে আঁকা রয়েছে নানা রকমের রঙিন চিত্র। বেশির ভাগ বাড়িই তৈরি করা হয়েছে পুর্নব্যবহারযোগ্য জিনিস দিয়ে। তবে কোনও বিশিষ্ট স্থপতি বা রাজমিস্ত্রি ডেকে এ সমস্ত বাড়ি তৈরি করা হয় না। সেখানকার বাসিন্দারা নিজেদের হাতে সে সমস্ত ঘরবাড়ি তৈরি করেন।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন উঠতেই পারে, এখানকার বসবাসকারীদের মধ্যে যদি কোনও ঝামেলা বাধে, তার মীমাংসা করেন কে? সেই সমস্যার সুরাহাও এখানকার বাসিন্দাদের কাছেই রয়েছে। সকলের সম্মতিক্রমে নির্মিত হয়েছে বিশেষ দল। সেই দলের সদস্যরা প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝামেলা থেকে শুরু করে যে কোনও সমস্যার সমাধানে হাজির হন। এ ক্ষেত্রে অবশ্য বাকি লোকজন বিচারে সম্মতি জানাচ্ছেন কি না, সে দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।
অন্য দিকে, ফ্রিটাউনে থাকতে গেলে কী কী নিয়ম মেনে চলতে হবে, সেগুলিও উক্ত দলের মাথারা নির্ধারণ করেন। এই নিয়মের মধ্যে রয়েছে মাদকের ব্যবহারে রাশ টানা। আগে ফ্রিটাউন পুশার স্ট্রিটের জন্য কুখ্যাত ছিল। সেখানে গাঁজা থেকে শুরু করে হেরোইন, কোকেন প্রভৃতি বিক্রি করা হত। বৃদ্ধি পেয়েছিল অপরাধের ঘটনাও।
মূলত পুশার স্ট্রিটের মাদক ব্যবসা ঘিরেই তৈরি হয়েছিল অপরাধচক্র। ২০২৪ সালে ফ্রিটাউনের বিশেষ দলের মাথারা ডেনিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সেই চক্রে ইতি টানেন।
এখানে থাকার জন্য মাদকে না বলার পাশাপাশি আরও একটি নিয়ম মেনে চলতে হয়। সেটি হল ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার আকাঙ্ক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখানো। ফ্রিটাউনে থাকতে গেলে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা যাবে না। কিনলেও সেটিকে নিয়ে শহরের ভিতরে ঢোকা যাবে না। এখানকার বাসিন্দারা যাতায়াতের জন্য প্রধানত হাঁটা, কার্গো বাইক এবং গণপরিবহণের উপরই নির্ভর করে থাকেন।
এখানকার বাসিন্দারা কেউ ব্যক্তিগত জমি বা বাড়ি কিনতে পারেন না। সকলকেই সেখানে থাকার জন্য ভাড়া দিতে হয়। সেই ভাড়া নেওয়া হয় ‘কমিউনিটি বাক্সে’।
কত একর জমির উপর বাড়ি তৈরি করা হয়েছে সেটির উপর নির্ভর করে বরাদ্দ হয় বাড়িভাড়া। মাসের শুরুতে বাক্সের মধ্যে সেই পরিমাণ অর্থ ফেলে দেওয়া হয়। সেই অর্থ দিয়ে শহর পরিচর্যার কার্যকলাপ সম্পন্ন করা হয়।
শহরের পরিচর্যা করার জন্য সেখানকার বাসিন্দাদেরই নিযুক্ত করা হয়। প্রধানত ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের এ কাজে নিযুক্ত করা হয়। আবর্জনা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে শহর পরিচর্যার সমস্ত কাজ তাঁরাই করে থাকেন। কমিউনিটি বাক্সে পড়া টাকা থেকে তাঁদেরকে মাসিক বেতন দেওয়া হয়। সকলের ক্ষেত্রে একই মূল্যের বেতন নির্ধারিত থাকে। কাউকে বেশি দেওয়া হয় না, কমও দেওয়া হয় না।
এ ছাড়া এই শহরে কিছু স্বতন্ত্র ব্যবসাও গ়়ড়ে উঠেছে। এখানকার তরুণ সমাজের অনেকেই এই শহরের মধ্যে নিজেদের ক্যাফে খুলেছেন। পাশাপাশি রয়েছে আর্ট গ্যালারি, সঙ্গীতের জায়গা প্রভৃতি। শহরের অর্থনীতির প্রায় ৩০ শতাংশ আসে এ সকল স্বতন্ত্র ব্যাবসাগুলি থেকে।
এখানে অবস্থিত ‘ক্রিস্টিনা বাইকস ওয়ার্কশপ’-ও বিশ্বের দরবারে বিখ্যাত। দেশের বহু প্রান্ত থেকে মানুষজন স্বতন্ত্র এই শহরের বাসিন্দাদের জীবনধারা দেখার জন্য আসেন। সরকারের থেকে আলাদা হয়ে, নিজেদের নিয়মকানুন তৈরি করে এ ভাবেই জীবন কাটাচ্ছেন এখানকার মানুষেরা।