কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর, সমকামী পুরুষ থেকে মুসলিম সেনেটর! আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ছক ভাঙলেন যে প্রার্থীরা
আমেরিকার এ বারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বহু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে রয়েছেন রো খন্না, অমি বেরা, প্রমিলা জয়পাল, সুহাস সুব্রহ্মণ্যম প্রমুখ।
আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম ইলেকশন) প্রত্যাখ্যাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভোটগণনা শুরুর লগ্ন থেকেই এগিয়ে আমেরিকার বিরোধী শিবির ডেমোক্র্যাটরা। যত সময় গড়িয়েছে, জয়ের ব্যবধান বাড়িয়েছে তারা। মূলত ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনগুলিতে ‘চাপ’ বাড়িয়েছে ডেমোক্র্যাটরা!
এখনও পর্যন্ত নির্বাচনের যা ফলাফল, তা থেকে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষই (সেনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস) ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। সেনেটের দখল পুরোপুরি নিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন ছুঁয়ে ফেলেছে। যদিও পুরো ফলাফল প্রকাশ হতে বুধবার সন্ধ্যা (স্থানীয় সময়) গড়িয়ে যেতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই চার বছর অন্তর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের ১০০টির মধ্যে ৩৫টি এবং নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের ৪৩৫টি সাধারণ আসনের সব ক’টিতেই ভোটগ্রহণ হয়েছে। সেই সঙ্গে, ভোটগ্রহণ হয়েছে হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টিটিভসের ‘ভোটদানের ক্ষমতাহীন’ ৬টি আসনের মধ্যে ৫টি এবং ৩৬টি প্রদেশ (স্টেট) আর ৩টি টেরিটরির গভর্নর পদে।
বর্তমানে হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে রিপাবলিকানদের হাতে ২১৮ এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন রয়েছে। অন্য দিকে, সেনেটে ডেমোক্র্যাট শিবিরের ৪৭টি এবং রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন রয়েছে। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে গেলে হাউসে ডেমোক্র্যাট শিবিরকে চারটি আসন বাড়াতে হবে। আর সেনেটের জন্য প্রয়োজন ৩টি আসন। এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবির কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তা হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার তাদের সমর্থন ছাড়া ওই কক্ষে কোনও আইন পাস করতে পারবে না। আগামী দু’বছর চাপের মধ্যে সরকার চালাতে হবে ট্রাম্পকে। ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হবে, তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে তদন্ত শুরু করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। বিভিন্ন নথিপত্র ও সাক্ষীদের তলব করতে পারবে। এমনকি, শুরু করতে পারবে তৃতীয় বার ট্রাম্পকে বরখাস্ত (ইমপিচ) করার সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও!
আরও পড়ুন:
এ দিকে, আমেরিকার এ বারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উঠে এসেছে একগুচ্ছ এমন নাম, যেগুলি সকলের নজর কেড়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী অনেক প্রার্থীই ইতিহাস গড়তে চলেছেন। ছক ভেঙেছেন তাঁরা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘প্রথম’-হওয়ার স্বীকৃতি লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর থেকে শুরু করে প্রথম প্রকাশ্যে নিজেকে সমকামী বলে পরিচয় দেওয়া পুরুষ মার্কিন সেনেটর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে পদার্পণ করার আগে উভয় রাজনৈতিক দলই প্রদেশ এবং জাতীয় পর্যায়ে নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের এই বৈচিত্র্যময় দলকে স্বাগত জানাবে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই সব প্রার্থীদের, যাঁরা প্রথম বারের মতো কোনও বিশেষ পরিচয়ের অধিকারী হতে চলেছেন।
কিশা ল্যান্স বটমস। বটমস জর্জিয়ার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর, জর্জিয়ার প্রথম মহিলা গভর্নর এবং আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর হতে চলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আটলান্টার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বটমস সেই মহিলাদের মধ্যে একজন, যাঁদের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২০ সালের নির্বাচনে তাঁর রানিং মেট (সহ-প্রার্থী) হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাইডেন প্রশাসনে যোগ দেন। ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করে জয়ী হওয়া বটমস তাঁর নির্বাচনী প্রচারে ‘মেডিকএড (সরকারি স্বাস্থ্য বিমা)’ সুবিধার সম্প্রসারণ, বাড়ির মালিকদের জন্য কর ছাড় এবং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে মূল এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। নেভাডার অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যারন ফোর্ডও সংশ্লিষ্ট প্রদেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে চলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক বার মামলা করেছিলেন। শুল্ক-সহ আরও নানা বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের করা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় নিজের এই ভূমিকা বিশেষ ভাবে তুলে ধরেছিলেন ফোর্ড।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের মার্কিন সেনেট নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে ক্রিস পাপাস আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম সমকামী পুরুষ সেনেটর হতে চলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর এই জয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। নিউ হ্যাম্পশায়ারের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জয়ের বড় সুযোগ দেখছিল। কিন্তু, সেই সুযোগ ছিনিয়ে নিয়েছেন ক্রিস। দক্ষিণ-পূর্ব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে চার মেয়াদে কংগ্রেস সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ফ্লরিডার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে চলেছেন বায়রন ডোনাল্ডস। তিনি কর সংস্কার, ডেটা সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাম্পের এজেন্ডাকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঝোড়ো প্রচার চালিয়েছেন। বায়রনের জয়ে ফ্লরিডায় নিজেদের জমি আরও শক্ত করেছে রিপাবলিকানরা। নির্বাচনের শুরুতেই ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন বায়রনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
আরও পড়ুন:
অ্যানি অ্যান্ড্রুস সাউথ ক্যারোলিনা থেকে প্রথম নির্বাচিত মহিলা মার্কিন সেনেটর হতে চলেছেন। তিনি হারিয়েছেন বর্তমান সেনেটর ডার্লিন গ্রাহামকে। রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একটি আসন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন তিনি। ওই আসন বিগত প্রায় তিন দশক ধরে রিপাবলিকানদের হাতেই ছিল। জুলাই মাসে সাউথ ক্যারোলিনার প্রাক্তন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুর পর আসনটি খালি হয়ে যায়। ট্রাম্পের উদ্যোগেই সেখানে বসানো হয় তাঁর ভাই ডার্লিন গ্রাহামকে। আমেরিকার রাজনীতির আঙিনায় ‘অপিরিচিত’ মুখ ছিলেন ডার্লিন। ফলে, তাঁর সেনেটর পদে বসা এবং তাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি রিপাবলিকান-অধ্যুষিত সাউথ ক্যারোলিনায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
উল্লেখ্য, সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনে ডার্লিন নিজেকে তাঁর দাদার চেয়েও বেশি রক্ষণশীল হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি তাঁর দাদার কিছু অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে ট্রাম্পের পক্ষ নেন। তবে, তাঁকে হারিয়ে জয়ী হচ্ছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুস। বরাবর নিজেকে এক জন স্বাধীনচেতা ও মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন অ্যানি। নির্বাচনী প্রচারের সময় সাউথ ক্যারোলিনায় জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান এবং দুর্নীতির মতো বিষয়গুলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
টেক্সাসের প্রথম হিস্পানিক (হিস্পানিক শব্দটি স্পেন, স্প্যানিশ ভাষা বা বৃহত্তর অর্থে ‘হিস্পানিদাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষ, সংস্কৃতি বা দেশগুলিকে নির্দেশ করে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ‘হিস্পানিক’শব্দটি একটি জাতিগত বা অতি-জাতিগত পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়) গভর্নর হতে চলেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। তিনি রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন, যিনি প্রায় ১২ বছর ধরে এই পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় এই দুই প্রার্থী গর্ভপাত-সহ বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরের বিপরীত অবস্থানে ছিলেন। ৫২ বছর বয়সি আইনপ্রণেতা তথা আইনজীবী হিনোজোসা ১৯৯০ সালে অ্যান রিচার্ডসের পর প্রথম ডেমোক্র্যাট হিসেবে গভর্নর নির্বাচিত হতে চলেছেন।
কলোরাডোর প্রথম ডিস্ট্রিক্টে জয়লাভের মাধ্যমে মেলাত কিরোস সংশ্লিষ্ট প্রদেশ থেকে কংগ্রেসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা সদস্য হতে চলেছেন। ২৯ বছর বয়সি এই ডেমোক্র্যাট তথা আইনজীবী কিরোস, মার্কিন কংগ্রেসে নব্য তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেবেন এবং তিনি হবেন প্রতিনিধি পরিষদের অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য। উইসকনসিনের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে চলেছেন ডেভিড ক্রাউলি। ২০২৪ সালে ট্রাম্প উইসকনসিনে ০.৯ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, যা সেই নির্বাচনী চক্রে যে কোনও প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যবধান। ডেমোক্র্যাট গভর্নর টনি এভার্স, যিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রাইমারি নির্বাচনের আগেই ক্রাউলিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসেবে জয় পেয়েছেন আব্দুল এল-সায়েদ। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেনেটর হতে চলেছেন তিনি। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রাক্তন এই কর্মকর্তা মিশিগানে জয় এনে দিয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। অন্য দিকে, নিউ জার্সির ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয়লাভের পর অ্যাডাম হামাওয়ি ওই প্রদেশ থেকে কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সদস্য হতে চলেছেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত শল্যচিকিৎসক এবং ইজ়রায়েলের কঠোর সমালোচক হামাওয়ি ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রগতিশীল অংশের প্রতিনিধি। তিনি সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসা ও শিক্ষার্থীদের ঋণের বোঝা মকুবের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
ক্লেয়ার ভালদেজ় নিউ ইয়র্কের প্রথম ভূমিকন্যা (মহিলা নেটিভ আমেরিকান), যিনি কংগ্রেসের সদস্য হতে চলেছেন। এক মেয়াদে নিউ ইয়র্কের আইনসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভালদেজ় প্রদেশের সপ্তম কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হতে চলেছেন। ভালদেজ়ের এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের জন্য আরও একটি সাফল্য। এই অংশের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পিছনে নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জ়োহরান মামদানির জনপ্রিয়তার ভূমিকা রয়েছে, যিনি ভালদেজ়কে জোরালো সমর্থন জুগিয়েছিলেন।
মিশিগানের ১১তম কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্টে জয়ের মাধ্যমে জেরেমি মস ওই প্রদেশ থেকে প্রথম এমন কংগ্রেস সদস্য হতে চলেছেন, যিনি প্রকাশ্যে নিজেকে সমকামী বলে দাবি করেন। জয়ের আগে তিনি স্টেট সেনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেনসের ছেড়ে দেওয়া আসনে বসতে চলেছেন তিনি। স্টিভেনস মার্কিন সেনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নিজের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে, প্রাথমিক নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।
অ্যামি অ্যাক্টন ওহাইয়োর গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হতে চলেছেন। ২০০৬ সালের পর তিনিই প্রথম ডেমোক্র্যাট, যিনি এই পদে জয়ী হচ্ছেন এবং ওহাইয়োর ইতিহাসে প্রথম মহিলা হিসেবে তিনি ওই দায়িত্ব পেতে চলেছেন। পেশায় চিকিৎসক অ্যাক্টন রিপাবলিকান বিবেক রামাস্বামীকে পরাজিত করেছেন। এই নির্বাচনী লড়াইটি একটি বিতর্কিত আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপনের কারণে জাতীয় পর্যায়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। প্রচারের সময় অ্যাক্টন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উপর জোর দেন। তিনি মধ্যবিত্ত এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ওহাইয়োবাসীর জন্য সম্পত্তি কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ ছাড়া, ডেটা সেন্টারগুলির ক্ষেত্রে তিনি এমন একটি নীতি গ্রহণের কথা বলেন, যেখানে তাদের নিজস্ব খরচ তাদেরকেই বহন করতে হবে। অন্যথায় কার্যক্রম চালানো যাবে না।
জেভিয়ার বেসেরা ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম লাটিনো (লাটিনো বলতে এমন এক জন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি লাটিন আমেরিকা থেকে এসেছেন অথবা যাঁর পরিবারের শিকড় সেখানে) গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হতে চলেছেন। এর মাধ্যমে আমেরিকার সবচেয়ে বড় এই প্রদেশে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখল ডেমোক্র্যাটরা। মার্কিন কংগ্রেসের প্রাক্তন সদস্য, প্রদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বাইডেন প্রশাসনের স্বাস্থ্য এবং মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বেসেরা। ক্যালিফোর্নিয়ার উদারপন্থী ভোটারদের সমর্থন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে বেসেরা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান স্টিভ হিলটনকে হারিয়েছেন। তিনি হিলটনের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন এবং ডেমোক্র্যাট ভোটারদের আহ্বান জানান, যাতে তাঁরা বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের বিরোধিতার বার্তা পৌঁছে দেন।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অনেক প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকার আইনপ্রণেতাদের মধ্যে রো খন্না, অমি বেরা, প্রমিলা জয়পাল এবং সুহাস সুব্রহ্মণ্যম মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য লড়ছেন। অন্য দিকে, ডেমোক্র্যাটিক দলের পিয়া ডান্ডিয়া এবং অমিশ শাহ প্রথম বারের মতো কংগ্রেস সদস্য হওয়ার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
তালিকায় নাম রয়েছে বিবেক রামাস্বামীর। কেরলম থেকে আমেরিকায় যাওয়া দম্পতির সন্তান তথা রিপাবলিকান দলের সদস্য রামাস্বামী ওহাইয়ো প্রদেশ থেকে গভর্নর নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি পরাজিত হয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া এবং মে মাসে রিপাবলিকান প্রাইমারিতে জয়ী হওয়া রামাস্বামী ২ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছেন অ্যামি অ্যাকটনের কাছে। চিকিৎসক অ্যামির এই জয় ২০০৬ সালের পর এই প্রথম ওহাইয়োতে কোনও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত করল। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুহাস সুব্রহ্মণ্যম মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ৪০ বছর বয়সি সুব্রহ্মণ্যম ভার্জিনিয়ার ১০তম কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন। তিনি মোট ভোটের ৬১ শতাংশেরও বেশি পেয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ডেভ বেকউইথ পেয়েছেন ৩৬ শতাংশ ভোট। হিউস্টনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম সুব্রহ্মণ্যমের। পড়াশোনা নিউ অরলিন্সের টুলেন ইউনিভার্সিটিতে। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে আইন নিয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর ওবামার প্রযুক্তি নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
হাই স্কুলের প্রাক্তন অধ্যক্ষ পিয়া ডান্ডিয়া ফ্লরিডার ২২তম কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্ট থেকে মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের সদস্য হিসেবে জয়ী হয়েছেন। ডেমোক্র্যাট দলের এই প্রার্থী রিপাবলিকান প্রার্থী ক্যাসি আস্কারের বিরুদ্ধে ৫১.৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। পিয়ার জন্ম ফ্লরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে। ৩৯ বছর বয়সি ডান্ডিয়া তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন শিক্ষিকা হিসেবে এবং তিনি হার্লেমে একটি হাই স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ১৭তম কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান রো খান্না। তিনি হারিয়েছেন অন্য এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন উদ্যোগপতি রিতেশ ট্যান্ডনকে। হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে আরও একটি মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা খান্না ৪২,০০০-এরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ওয়াশিংটনের ৭তম কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্টে প্রমিলা জয়পাল পরাজিত করেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী নীরব শেঠকে। এঁদের মধ্যে প্রমিলার পারিবারিক শিকড় কেরলমে এবং নীরবের শিক়়ড় গুজরাটে। নীরব আগে কর্মরত ছিলেন মার্কিন নৌসেনায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার ৩ নম্বর কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা অমি বেরা রিপাবলিকান প্রার্থী রব টাকারকে পরাজিত করে হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। চিকিৎসক থেকে রাজনীতিতে আসা ৬১ বছর বয়সি অমি তাঁর অষ্টম মেয়াদে জয়ী হলেন। ২০১৩ সালে প্রথম বারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছিলেন অমি। পাশাপাশি, টেক্সাস হাউস ডিস্ট্রিক্ট ৪৭-এর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন পূজা শেঠি। পেশায় আইনজীবী পূজা এর আগে টেক্সাস আইনসভায় ‘চিফ অফ স্টাফ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী সন্দীপ শ্রীবাস্তব টেক্সাস হাউস ডিস্ট্রিক্ট ৬৬ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি এক জন ব্যবসায়ী এবং সমাজসৈনিক, যিনি বেশ কয়েক বছর ধরে প্ল্যানো-ফ্রিসকো এলাকায় বসবাস করছেন। শেষ পাওয়া খবর অনুসারে, তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী ম্যাট শাহিনের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। ম্যাট ওই নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন টানা পাঁচ মেয়াদে।
অ্যারিজোনার ১ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী, চিকিৎসক এবং প্রাক্তন রিপ্রেজেন্টেটিভ অমিশ শাহ এখনও পর্যন্ত এগিয়ে আছেন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান প্রার্থী জে ফিলির বিরুদ্ধে। ফিলি ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) প্রাক্তন খেলোয়াড়। শাহ এর আগে অ্যারিজোনা হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট গভর্নর ওয়েস মুর রিপাবলিকান ড্যান কক্সকে পরাজিত করার পর, অরুণা মিলার মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৬৪ সালে হায়দরাবাদে জন্ম নেওয়া মিলার সাত বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় চলে যান। তিনি মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৮৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং নগর পরিকল্পনাবিদ নিত্য রমন, লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে তাঁর দলেরই আরেক সদস্য কারেন ব্যাসের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছেন।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন মুখ বা ‘প্রথম’ মুখ তো অনেকেই আছেন। তবে, এই নির্বাচনের প্রধান মুখ হিসেবে যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথা বলতে হবে, তেমনই বলতে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাট ওবামার চালানো ট্রাম্প-বিরোধী ঝোড়ো প্রচারই মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপদে ফেলেছে রিপাবলিকানদের। ডেমোক্র্যাটদের জন্য উদ্যাপনের বার্তায় ওবামা দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জানিয়েছেন, যেন তাঁরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফলকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। একইসঙ্গে তিনি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হতে এখনও দু’বছর বাকি রয়েছে। এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওবামা উল্লেখ করেন, ‘‘ডেমোক্র্যাটরা যখন হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ নিতে চলেছে, তখন এই নির্বাচনের ফলাফল একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। আর সেই বার্তা হল, আমেরিকার বাসিন্দারা এমন রাজনীতি চান, যা মানুষকে বিভক্ত করার পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ করবে। তাঁরা এমন নেতৃত্ব চান, যাঁরা তাঁদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলির সুনির্দিষ্ট সমাধান করতে পারবেন।’’