ভাড়ায় মিলছে সন্তান থেকে বন্ধু! প্রবীণদের নিঃসঙ্গতাকে হাতিয়ার করে প্রতিবেশী দেশে গড়ে উঠছে ‘একাকিত্ব শিল্প’
প্রবীণদের একাকিত্বের জন্য দায়ী করা হচ্ছে চিনের সামাজিক কাঠামোকে। কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পরই সেখানকার তরুণেরা চাকরির খোঁজে পাড়ি দিচ্ছেন অন্যত্র। অনেকেই বাড়ি ছেড়ে থাকছেন কর্মক্ষেত্রে।
ডিজিটাল মাধ্যমের যুগে বন্ধুত্ব পাতানো কোনও কঠিন বিষয় নয়। সঙ্গী খোঁজার জন্যও রয়েছে বহু নির্ধারিত অ্যাপলিকেশন। সে সব জায়গায় সময় কাটালেই খুঁজে পাওয়া যায় ভার্চুয়াল বন্ধু, প্রেম করার মানুষও। তা সত্ত্বেও চিনের বহু মানুষ পয়সা খরচ করে ভাড়া করছেন বন্ধু, সঙ্গী। এমনকি, গাঁটের কড়ি খসিয়ে ভাড়া করা হচ্ছে নকল পরিবারের সদস্যদেরও। সেই তালিকায় পাতানো সন্তান পর্যন্ত রয়েছে।
এমন বন্দোবস্তের কথা জেনে মনে হতেই পারে, কেবল যুব সমাজই ‘টাকা দিয়ে বন্ধু কেনা’র পথ বেছে নিচ্ছে। তবে, এই ধারণা সঠিক নয়। এমনকি, তা ভুল বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। কারণ, নবীনদের তুলনায় প্রবীণদের মধ্যেই বন্ধু ভাড়া নেওয়ার ঝোঁক বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে একাকিত্বকে।
চিনে লাগাতার কমছে জন্মহার। সে দেশের ন্যাশনাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জন্মহার প্রতি ১,০০০ জনের নিরিখে ৫.৬৩ জনে নেমে এসেছে! ১৯৪৯-এর পর থেকে এই হার সর্বনিম্ন। অন্য দিকে, বৃদ্ধি পেয়েছে মৃত্যুহার। বস্তুত, চার বছর ধরে দেশটিতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হচ্ছে।
একই সঙ্গে, চিনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিয়ে করার ইচ্ছাও হ্রাস পাচ্ছে। ২০২২ সালে চিনে বিয়ে করেছিলেন ৬৮ লক্ষ ৩০ হাজার যুগল, যা ১৯৮৬ সালের পর সর্বনিম্ন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে চিনে বিয়ে করেছেন প্রায় ৬৭ লক্ষ যুগল। যা নেহাতই কম। চিনে বিয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ২০১৩ সালে। সে বছর ১ কোটি ৩০ লক্ষ যুগল বিয়ে করেছিলেন। তার পর থেকেই বিয়ের নথিভুক্তি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
চিনে যাঁরা বিয়ে করছেন, তাঁদের মধ্যেও আবার অধিক বয়সে সংসার পাতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের বিয়ের প্রতি অনীহা এবং জন্মহার ক্রমশ কমতে থাকায় চিনে বার্ধক্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ ভাবে জনগণের মধ্যে বয়স্ক নাগরিকদের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বয়সের এই ভারসাম্যহীনতা সমস্যায় ফেলছে সরকারকে। পাশাপাশি, প্রবীণ নাগরিকেরাও নিঃসঙ্গতার শিকার হচ্ছেন।
আরও পড়ুন:
প্রবীণ নাগরিকদের একাকিত্বের জন্য দায়ী করা হচ্ছে চিনের সামাজিক কাঠামোকেও। কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর সেখানকার তরুণেরা চাকরির খোঁজে পাড়ি দিচ্ছেন অন্যত্র। তাঁদের অনেকেই বাড়ি ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে থাকা শুরু করছেন। এমনই নানাবিধ কারণে সেখানকার বয়স্ক মানুষেরা নিঃসঙ্গতার সাগরে ডুবে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে চিনের প্রবীণ নাগরিকদের একাকিত্বের উপর ভর করেই শি জিনপিঙের দেশে গড়ে উঠেছে এক নতুন ধরনের অর্থনীতি। সেটিকে বলা হচ্ছে ‘একাকিত্বের অর্থনীতি’। প্রবীণ নাগরিকেরা মোটা টাকার বিনিময়ে ভাড়া করছেন ‘নকল সন্তান’। নিঃসঙ্গ জীবনে শুধুমাত্র এক জন কথা বলার মানুষের সন্ধানেই তাঁরা এই পথ বেছে নিচ্ছেন।
চিনের বেজিঙের বাসিন্দা ইয়াং। বয়স ৯১। সম্প্রতি তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন। এর পর থেকে তিনি এতটাই একা হয়ে পড়েন যে, ছেলের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবদার করে বসেন। গ্লুকোমায় আক্রান্ত হওয়ায় ইয়াঙের দৃষ্টিও দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে ইয়াং জানান, ঘরের নিঃস্তব্ধতা তাঁকে যেন গিলে খেত। কথা বলার জন্য কাউকে না পেয়ে, মাঝেমধ্যে টিভি-র সঙ্গেই কথা বলতেন তিনি।
ইয়াঙের ছেলে তাঁর সঙ্গে থাকেন না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যত্র বাস করেন। মাঝেমধ্যে মাকে দেখতে আসেন। সেই কারণে ইয়াঙের নিঃসঙ্গতা ক্রমে আরও গাঢ় হচ্ছিল। ইয়াংকে সঙ্গী পেতে সাহায্য করেছে চিনের নতুন অর্থনীতি। অর্থের বিনিময়ে সন্তান ‘ভাড়া’ করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
কেবল ইয়াং নন। চিনে ইয়াঙের মতো এমন হাজারও প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন, যাঁরা এই একই সমস্যার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অথবা, বলা যেতে পারে কাটাচ্ছিলেন। বর্তমানে চিনের অধিকাংশ নিঃসঙ্গ নাগরিকই ‘অস্থায়ী’ বা ‘নকল’ সন্তান ভাড়া করার পথ বেছে নিচ্ছেন। চিনে সে সংক্রান্ত বহু সংস্থাও গজিয়ে উঠেছে।
এ সমস্ত ‘অস্থায়ী’ সন্তানেরা প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে কেবল কথা বলেই সময় কাটান না। এক জন সন্তানের মা-বাবার প্রতি যে সমস্ত দায়িত্ব থাকে, সেগুলির সবই পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পালন করেন। বদলে পান মোটা টাকা। স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শেখানো, শৌচাগারের কল সারাই করা থেকে শুরু করে মুদির দোকানের কেটাকাটা বা বাজার করে দেওয়া, রান্না করা - সবই করেন তাঁরা।
প্রত্যেক বার পরিষেবা দেওয়ার জন্য এই ধরনের সংস্থাগুলির কর্মীরা ২৯ থেকে ৮৮ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় করেন। তবে, চিনের অর্থনীতিতে এই সংস্থগুলির ভূমিকা ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়টি এখনই স্পষ্ট নয়। তার জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
অন্য দিকে, সন্তানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই সংস্থাগুলির কর্মীরা বন্ধু হিসেবেও পাশে দাঁড়াচ্ছেন। ব্যস্ততার কারণে চিনের নাগরিকেরা বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে পারছেন না বলে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি, নতুন বন্ধু পাতানোর সুযোগও পাচ্ছেন না তাঁরা। একাকিত্ব কাটাতে তাই অর্থের বিনিময়ে বন্ধু ভাড়া করছেন। রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া থেকে শুরু করে হাইকিং বা ট্রেকিংয়ে যাওয়া, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া - প্রভৃতি ক্ষেত্রে পাশে পাওয়া যাবে তাঁদের।
সন্তান ভাড়া করতে যা খরচ পড়ে, তার তুলনায় বন্ধু ভাড়ার খরচ নেহাতই কম। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক বার পরিষেবা দেওয়ার জন্য ১৫ থেকে ২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।
চিনের তরুণ সমাজের মধ্যে এ ধরনের কাজে নিযুক্ত হওয়ার ঝোঁকও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুসারে, চিনের বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সি লিউ ইয়ানইয়ান এই ‘একাকিত্ব শিল্প’কেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অসুস্থ প্রবীণ নাগরিকদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, তাঁদের রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট সংগ্রহ করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজ করে দিন গুজরান করেন তিনি।
কেবল ইয়ানইয়ান নন, তাঁর মতোই চিনের বহু তরুণ নাগরিক পেশা হিসেবে এ সমস্ত কাজকেই বেছে নিচ্ছেন। প্রবীণ নাগরিকদের একাকিত্ব তাঁদেরকে পেশাজীবনে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। অন্য দিকে, নিঃসঙ্গ জীবনে দু’দণ্ড সুখের সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন বয়স্করা।