ল্যুভরকে পিছনে ফেলল পড়শি রাজ্যের জাদুঘর! কোন ‘জাদু’তে মোনালিসার ঘরকে টেক্কা দিল বিহারের নবীন সংগ্রহশালা?
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় জায়গা আরও পোক্ত করল এক জাদুঘর। সম্প্রতি সেই জাদুঘর ‘ওয়র্থ এ জার্নি’-র ২০২৬ সালের বিশ্বের সেরা ১০০টি জাদুঘরের তালিকায় প্রথম ১০-এ জায়গা করে নিয়েছে।
অন্যান্য দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশের মধ্যেই ভারতের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি সম্বন্ধে আগ্রহের শেষ নেই। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু পর্যটক ভারতে আসেন। তাঁদের আগমনের প্রধান উদ্দেশ্যই হল, এ দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা। তাঁরা আমাদের ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করেন। পরিচিত হন আমাদের দেশের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে।
সেই সব বিদেশি পর্যটক হন, কিংবা কোনও ভারতীয় ভ্রমণার্থী, তাঁদের সকলের জন্যই দেশের দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় জায়গা আরও পোক্ত করল একটি জাদুঘর। সম্প্রতি সেই জাদুঘর ‘ওয়র্থ আ জার্নি’-র ২০২৬ সালের বিশ্বের সেরা ১০০টি জাদুঘরের তালিকায় প্রথম ১০-এ জায়গা করে নিয়েছে। পিছনে ফেলেছে প্যারিসের ‘ল্যুভর’ এবং নিউ ইয়র্কের ‘মেট্রোপলিটন মিউজ়িয়াম অফ আর্ট’কে।
কথা হচ্ছে, বিহারের রাজধানী পটনায় অবস্থিত বিহার জাদুঘর নিয়ে। চলতি বছরে, এশিয়ার মধ্যে বিহার জাদুঘরটি প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ‘ওয়র্থ আ জার্নি’-র প্রকাশ করা সেরা ১০০টি জাদুঘরের তালিকায় প্যারিসের ‘ল্যুভর’ ৩১ নম্বর স্থান অর্জন করেছে। সেখানে বিহার জাদুঘর রয়েছে নয় (৯) নম্বরে! কেবল বিহারের বাসিন্দাদের কাছেই নয়, প্রত্যেক ভারতীয়ের কাছেই যা গর্বের বিষয়।
বিহারের পটনায় আগে থেকেই একটি জাদুঘর ছিল। কিন্তু, সেই জাদুঘরটি সুসজ্জিত ছিল না। ফলত, সেটিকে পুনরায় নির্মাণ করা হয়। আয়তনেও বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালে জাদুঘরটি নতুন রূপে উদ্বোধন করা হয়। ২০১৭ সালে তা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। জাদুঘরে আগে থেকেই থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি যাতে সাধারণ মানুষের সামনে যথাযথ ভাবে প্রদর্শন করা যায়, সেই ভাবনাতেই জাদুঘরটিকে পুনর্নির্মিত করা হয়।
বিহার জাদুঘরটি ১৩ একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। জাপানের প্রিৎসকার পুরষ্কার বিজয়ী বিখ্যাত স্থপতি ফুমিহিকো মাকি মুম্বইয়ের এক বেসরকারি স্থাপত্য সংস্থার সঙ্গে মিলে জাদুঘরটির নকশা তৈরি করেছেন। দিয়েছেন নজরকাড়া রূপ।
আরও পড়ুন:
জাদুঘরটিতে প্রাচীন সময় থেকে শুরু করে সাল ১৭৬৪ পর্যন্ত সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রাখা রয়েছে। বিহারের ইতিহাসকে সুস্পষ্ট ভাবে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরে এই জাদুঘর। জাদুঘরের গ্যালারিগুলি মৌর্য যুগ থেকে শুরু করে মুঘল এবং সুর রাজবংশ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়কাল অনুসারে সাজানো হয়েছে। অর্থাৎ, জাদুঘরের ভিন্ন ভিন্ন গ্যালারি পরিদর্শনে পাওয়া যাবে ভিন্ন সময়কালের স্বাদ। জানা যাবে পুরনো দিনের ইতিহাস। ৩০ হাজারেরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দিয়ে সাজানো হয়েছে এই জাদুঘর।
এই জাদুঘরে খুদে পর্যটকদের জন্যও একটি গ্যালারি তৈরি করা হয়েছে। সেই কক্ষে রয়েছে পশু, লোকশিল্প, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞান বিষয়ক প্রদর্শনী। ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও বিহারের উপস্থিতি তুলে ধরার জন্য একটি আলাদা গ্যালারি বানানো হয়েছে। সেটির নাম দেওয়া হয়েছে ডায়াসপোরা গ্যালারি।
বিশ্বতালিকায় প্রথম ১০-এর মধ্যে জায়গা করে নেওয়া এই জাদুঘরের সংগ্রহগুলির মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া জিনিসটি হল, মৌর্য যুগের দিদারগঞ্জ যক্ষী। বিশিষ্টজনেরা এটিকে প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন বলে দাবি করেন। এটি ১৯১৭ সালে পটনার কাছে পাওয়া গিয়েছিল।
অধিকাংশ পর্যটকের কাছেই ঘুরতে যাওয়া মানে বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করাও বটে। সেই কথা মাথায় রেখে জাদুঘর চত্বরের মধ্যেই তৈরি করা হয়েছে রেস্তরাঁ। সেই রেস্তরাঁয় বিহারের বিভিন্ন পদ পরিবেশন করা হয়। অর্থাৎ, বিহারের ইতিহাস জানার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার খাবারের স্বাদও চেখে দেখা যাবে এই জাদুঘরে।
আরও পড়ুন:
তবে, সপ্তাহের যে কোনও দিন গেলেই এই জাদুঘরে ঘোরা যাবে না। প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার থেকে রবিবার পর্যন্ত এই জাদুঘর খোলা থাকে। ভারতের অধিকাংশ জাদুঘরের মতোই সোমবার বিহার জাদুঘর বন্ধ থাকে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য খোলা থাকে জাদুঘরটি।
সুন্দর এই জাদুঘরের ভিতরে রয়েছে স্যুভেনির দোকান। মন চাইলে কাছের মানুষদের জন্য সেখান থেকে স্মরণিকা কেনা যেতে পারে। স্যুভেনির দোকান-সহ জাদুঘরের ভিতরে অবস্থিত রেস্তরাঁ এবং আরও কিছু স্থান বিকেল ৫টার পরও খোলা থাকে বলে জানা গিয়েছে।
ভারতীয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই জাদুঘরে প্রবেশ করার টিকিটমূল্য ১০০ টাকা। নাবালকদের জন্য দিতে হবে ৫০ টাকা। তবে, আর্ন্তজাতিক পর্যটকদের জন্য টিকিলমূল্যে তফাত রয়েছে। বিদেশ থেকে ঘুরতে আসা প্রাপ্তবয়স্কদের এই জাদুঘর ঘুরে দেখার জন্য মাথা পিছু খরচ করতে হবে ৫০০ টাকা। নাবালকদের এক এক জনের জন্য লাগবে ২৫০ টাকা।
বিশ্বতালিকায় প্রথম ১০-এ স্থান অধিকার করার পর বিহার জাদুঘর নিয়ে আলোচনা বৃদ্ধি পেলেও, এটির জনপ্রিয়তা কিন্তু আগে থেকেই ছিল। জাদুঘরটি প্রশংসা কুড়িয়েছে অভিনেতা মনজ বাজপেয়ী এবং কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের। কয়েক মাস আগেই ভারতে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ডাক্তার ফিলিপ অ্যাকারম্যান এটির স্থাপত্যের প্রশংসা করেছেন।