বড়লোক হতে ইন্টারনেটে চুরি শিখে একের পর এক বাড়িতে লুট, কীর্তি ফাঁস হতেই শ্রীঘরে স্বদেশি ‘লেডি থিফ’
হায়দরাবাদের ওই তরুণী ঠিক করেন, যে ভাবেই হোক না কেন, তাঁকে বিত্তশালী জীবনযাপন করতেই হবে। সোজা পথে না হলে, বাঁকা পথেই!
বৈভবে জীবন কাটানোর স্বপ্ন অনেকেই দেখেন। কিন্তু, সকলে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন না। বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থের অভাব। বহু মানুষের ক্ষেত্রেই উপার্জনের একটি বড় অংশ বেরিয়ে যায় কেবলমাত্র সংসারের দায়িত্ব পালন করতে। ফলত, বিভিন্ন শখ পূরণের আর উপায় থাকে না। কিন্তু, হায়দরাবাদের এক তরুণী ঠিক করেন, যে ভাবেই হোক তিনি বিত্তশালী জীবনযাপন করবেন। তবে, তিনি এ-ও বুঝে যান, সোজা পথে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ঢের সময় লেগে যাবে। তাই, তরুণী বেছে নেন চৌর্যবৃত্তি!
তথ্য অনুসারে, চৌর্যবৃত্তিকে ‘আপন’ করে নেওয়া ওই তরুণীর নাম পাগা জয়া। বয়স মাত্র ২৫। অক্টোবরের শেষে হায়দরাবাদ পুলিশের হাতে তিনি ধরা পড়েন। এর জেরেই সামনে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা গিয়েছে, তরুণী বিবাহিতা। পুলিশের দাবি, তাঁর স্বামী স্ত্রীয়ের এই ‘কীর্তি’ জানতেন না। স্বামীর অজান্তেই তরুণী হায়দরাবাদ শহরের বিভিন্ন বাড়ি থেকে নানা ধরনের সামগ্রী চুরি করতেন। সবটাই করতেন কেবলমাত্র বিত্তশালী জীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষায়।
অভাবের কারণে মাঝপথে বিটেক-এর পড়া ছাড়তে হয়েছিল জয়াকে। তিনি কোঠাগুদেমের একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী ছিলেন। ২০২৩ সালে জয়া হায়দরাবাদে চলে আসেন। এর পর ২০২৪ সালে তিনি গোগুলথু শিবকুমার নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। স্বামীর সঙ্গে হায়দরাবাদের উপ্পালের নিউ ভারত নগর কলোনিতে সংসার পাতেন জয়া। জানা যায়, জয়ার শৈশবজীবন কেটেছে ভদ্রাদি কোঠাগুদেমের পালভঞ্চে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, তরুণী হায়দরাবাদের মোট পাঁচটি বাড়ি থেকে চুরি করেছেন বলে অভিযোগ। পরিবারের লোকজন অনুপস্থিত রয়েছেন, এমন বাড়িগুলিকেই নিশানা করতেন জয়া। মনে করা হচ্ছে, যে কোনও চুরির অনেকটা আগে থেকেই সেই বাড়ির উপর, বাড়ির লোকজনের গতিবিধির উপর নজর রাখতেন জয়া। কোন বাড়ি, কখন ফাঁকা থাকছে, সে সবও তাঁর আগে থেকেই জানা থাকত। এর পর সুযোগ বুঝে লুটপাট চালাতেন তরুণী।
আরও পড়ুন:
লুটপাটে তরুণী ছিলেন একাই একশো! এ ‘কাজে’ অন্য কারও সাহায্য নিতেন না তিনি। তবে, ‘অপারেশন’ চালানোর আগে প্রশিক্ষণ নিতে ভোলেননি। সেই প্রশিক্ষণ পর্ব চলেছিল অনলাইনে। সবটাই সেরেছিলেন স্বামীর চোখের আড়ালে।
তাঁকে যাতে কেউ কখনও শনাক্ত করতে না পারে, পরিপাটি ভাবে সেই বন্দোবস্তও সেরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন জয়া। পুলিশের দাবি অনুসারে, তিনি কালো রঙের বোরখা পরে চুরি করতে যেতেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা থাকত তাঁর। যাতে কেবল দুই চোখ ছাড়া আর কিছুই বাইরে থেকে দেখা না যায়। এমনকি, চুরি করার সময় জয়া দুই হাতে কালো দস্তানাও পরতেন। তাঁর পিঠে থাকত একটি নীল ব্যাগ। অনুমান করা হচ্ছে, চুরির সামগ্রী ওই ব্যাগেই ভরতেন তিনি। সঙ্গে রাখতেন গেট কাটার যন্ত্র। এহেন প্রস্তুতি নিয়ে, তবেই চুরি করতে বার হতেন জয়া।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, জয়া একটি বাড়ির সদর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, বহু চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হন তিনি। এর পর, সেখানে আর অযথা সময় ব্যয় না করে চলে যান অন্যত্র। এই ভিডিয়োতেও জয়ার পরনে দেখা গিয়েছে কালো বোরখা। নজর কেড়েছে পিঠের নীল রঙা ব্যাগ। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
ওই তরুণীর কাছ থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০ লক্ষ টাকার চুরির সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। তেমনটাই দাবি করেছে হায়দরাবাদের উপ্পাল থানার পুলিশ। বাজেয়াপ্ত করা সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে সোনা ও রুপোর গয়না, নগদ অর্থ এবং একটি আইফোন ১৭।
আরও পড়ুন:
কিন্তু, এত সতর্কতা অবলম্বনের পরও কী করে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন জয়া? সূত্র বলছে, অক্টোবরের ২৬ তারিখ হায়দরাবাদের নিউ ভারত নদর কলোনির একটি বাড়িতে চুরি করতে যান জয়া। সেই বাড়ির লোকজন কোমুরাভেল্লিতে এক মন্দিরে গিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়েই চুরির উদ্দেশ্যে ওই বাড়িতে হাজির হন তরুণী।
অভিযোগ অনুসারে, সদর দরজা কেটে ওই বাড়িতে ঢোকেন জয়া। এর পর দম্পতির শোয়ার ঘর এবং বাচ্চাদের ঘরের আলামরি খুলে লুটপাট চালান। তার পর সোনা-রুপোর গয়না এবং নগদ হাসিল করে পালিয়ে যান। ঘটনা জানাজানি হয় পরের দিন, ২৭ অক্টোবর। বাড়ির পরিচারিকা এসে দেখেন, তালা ভেঙে পড়ে রয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান।
তালা ভাঙার খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন তড়িঘড়ি ফিরে আসেন। সেই বাড়ির কর্তা ফিরেই উপ্পাল থানায় অভিযোগ দায়ের করতে যান। তদন্ত চলাকালীন এলাকায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। সেখানে জয়াকে বোরখা পরে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে বেশ কিছু বাড়ির দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
পুলিশের আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। তরুণীর খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়। ৩১ অক্টোবর সকাল ৮টা নাগাদ এলবি নগর বাসস্ট্যান্ডে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন জয়া। জেরার মুখে চুরির কথা স্বীকার করে নেন তিনি।
প্রাথমিক ভাবে পুলিশ মনে করছে, বাজেয়াপ্ত হওয়া সামগ্রীর বাইরেও তরুণী আরও কিছু জিনিস চুরি করেছিলেন। কিছু নগদ এবং গয়না, জয়া ইতিমধ্যেই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করে ফেলেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন অভিযুক্ত। ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত চলছে। চুরির ছক কষা থেকে চুরির পণ্য বিক্রি করে টাকা হাতানো, এই পুরো পর্বের কার্যপদ্ধতি (মোডাস অপারেন্ডি) যথাযথভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।