লাখখানেক বাংলাদেশি শ্রমিক আসা মানে দেশ ধ্বংস! জ্বলন্ত ইউরোপকে দেখে বিবৃতিই দিয়ে ফেলল আতঙ্কিত জাপান
জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় শ্রমঘাটতি মেটাতে লাখখানেক বাংলাদেশি শ্রমিককে নিজের ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়েছে জাপান। সমাজমাধ্যমে এ-হেন ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়তেই সে দেশের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকারকে তুলধোনা করল দ্বীপরাষ্ট্রের আমজনতা।
বাংলাদেশের জন্য দরজা খুলছে জাপান। ঢাকার এক লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে টোকিয়ো। এ-হেন ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়তেই দ্বীপরাষ্ট্রে হইচই! সমাজমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সরকারকে একহাত নিয়েছে সেখানকার আমজনতার একাংশ। ফলে, বেকায়দায় পড়ে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয় তাঁর প্রশাসন। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে রুশ ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পাচ্ছে উদ্বিগ্ন পর্যবেক্ষক মহল।
চলতি বছরের ২৬-২৯ অক্টোবর জাপান সফর করেন বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয় তাঁর। এর পরই সমাজমাধ্যমে টোকিয়ো-ঢাকা শ্রমচুক্তির গুজব খবর ছ়ড়িয়ে পড়ে। সেখানে পদ্মাপারের দেশটির এক লাখ শ্রমিককে দ্বীপরাষ্ট্রের সরকার কাজ দিতে চলেছে বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নজরে আসতেই ফুঁসে ওঠে দ্বীপরাষ্ট্রের আমজনতা।
সমাজমাধ্যমের পোস্টে আরও বলা হয়, দেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত কমতে থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে পাঁচ বছরের ‘শ্রমিক সমঝোতা’ করেছে জাপান। এই গুজবে কান দিয়ে তাকাইচি সরকারের তুলধোনা করতে দেখা গিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রের আমজনতাকে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইউরোপের উদাহরণ টেনে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন চরম আতঙ্কগ্রস্ত সেখানকার নাগরিকদের একাংশ।
টোকিয়ো-ঢাকা শ্রমচুক্তির ভুয়ো খবরকে সত্যি ধরে নিয়ে সমাজমাধ্যমে জাপানি নেটাগরিকদের কেউ কেউ লিখেছেন, ‘‘আপনারা কি নিজেদের নাগরিকদের নিজেরাই ধ্বংস করতে চাইছেন? ফ্রান্স-স্পেন-ইটালির অবস্থা থেকে শিক্ষা নিন। পুড়ে ছাই হতে চলা ইউরোপের দিকে তাকান।’’ কারও আবার বক্তব্য, ‘‘জাপানের ইসলামিকরণ হতে যাচ্ছে। আমাদের দেশের শেষের শুরু হয়ে গেল।’’
জাপানিদের এই আতঙ্ক একেবারেই অমূলক নয়। ২০১৫ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাধলে সেখানকার লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয় পশ্চিম ইউরোপের একাধিক রাষ্ট্র। পরবর্তী কালে লিবিয়া ও মরক্কো-সহ উত্তর আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের বাসিন্দারাও আশ্রয় নেন স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানিতে। ফলে, ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে সেখানকার ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবন।
আরও পড়ুন:
সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিবর্তনের ‘কুপ্রভাবে’ নাজেহাল ইউরোপ। শরণার্থী সমস্যাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও ইটালির মতো দেশে ছড়িয়েছে হিংসাত্মক গণবিক্ষোভ। ফলে, যত্রতত্র দোকানপাট লুট, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এমনকি পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের খণ্ডযুদ্ধের ভয় ধরানো ছবি ওই মহাদেশ থেকে প্রকাশ্যে এসেছে। এতে উদ্বিগ্ন গোটা বিশ্ব।
ইউরোপের আদি বাসিন্দা ও রাজনীতিবিদদের একাংশের দাবি, গত এক দশকে শরণার্থীদের হাত ধরে ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানিতে ছড়িয়েছে ইসলামীয় মৌলবাদ। বিভিন্ন এলাকায় শরিয়া আদালত এবং মাদ্রাসা খুলে ফেলেছে তারা। পাশাপাশি চলছে দেদার ধর্মান্তরণ এবং শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন। বেশ কিছু জায়গা বিদেশি মুসলিম অপরাধীদের ‘মুক্তাঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না।
সেই কারণেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাংলাদেশ থেকে লাখখানেক শ্রমিক আসার ভুয়ো খবরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জাপানের আম নাগরিকেরা। উল্লেখ্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি ভারত বা আমেরিকার মতো বহুত্ববাদে বিশ্বাসী নয়। বরং ‘সমজাতীয়’ বা ‘হোমোজিনিয়াস’ সমাজে থাকতেই পছন্দ করেন সেখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা। বিপুল সংখ্যায় মুসলিম বিদেশির আগমনে সেটা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
জাপান-বাংলাদেশ শ্রমচুক্তি সংক্রান্ত ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে দু’টি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। প্রথমত, ২৭ অক্টোবর তারেক-তাকাইচি শীর্ষ বৈঠকের পর ঢাকার সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় জোর দেয় টোকিয়ো। পাশাপাশি, আগামী পাঁচ বছরে পদ্মাপারের দেশে প্রায় এক লক্ষ কোটি ইয়েন বেসরকারি লগ্নির ইঙ্গিতও দিয়েছে টোকিয়ো।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, জাপানি বিনিয়োগে বাংলাদেশে তৈরি হবে প্রায় দু’লাখ কর্মসংস্থান। এ ছাড়া, বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় শিল্প বিস্তারে সম্মত হয়েছে ঢাকা ও টোকিয়ো। ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামের নতুন কাঠামোর আওতায় সেটা হওয়ার কথা রয়েছে। তারেক-তাকাইচি বৈঠকে শিল্পে লগ্নি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সহ মোট ছ’টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সই হয়েছে। রয়েছে দু’টি বড় ঋণের প্রতিশ্রুতিও।
দ্বিতীয়ত, গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) মে মাসে মানবসম্পদ সংক্রান্ত টোকিয়োর একটি সেমিনারে ‘শ্রম ঘাটতি’ ইস্যুতে সরব হন জাপানি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের একাংশ। শুধু তা-ই নয়, ফারাক মেটাতে লাখখানেক বাংলাদেশি শ্রমিককে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনার কথাও বলতে শোনা যায় তাঁদের। ওই সময় বাংলাদেশের সঙ্গে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক বা মউ-তে (মেমরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই করে জাপান।
এ ছাড়া, চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর একটি পৃথক কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন চুক্তিতে সই করে জাপান ও বাংলাদেশ। এতে শ্রমিক নিয়োগ, সুরক্ষা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির একটি রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর অধীনে ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে ঢাকার কিছু কর্মীকে নিয়োগ করবে টোকিয়ো। সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটি পাঁচ বছরের। তবে, এর সময়সীমা আরও পাঁচ বছরে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ১৭ অক্টোবরের শ্রমিক চুক্তিতে বার্ষিক এক লাখ বাংলাদেশি নিয়োগের বাধ্যতামূলক কোটা নির্ধারণ করেনি জাপান। তার পরেও গত বছরের মউ ও এ বছরের সমঝোতাকে সামনে রেখে সমাজমাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে। বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রে কর্মরত রয়েছে পদ্মাপারের প্রায় ৪৫ হাজার নাগরিক। মূলত, ছোট ব্যবসা, শিল্পোৎপাদন ও বিভিন্ন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তাঁরা।
এই পরিস্থিতিতে আমজনতার ক্ষোভ প্রশসনে আসরে নামে জাপান সরকার। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে এক্স হ্যান্ডলে তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেছেন টোকিয়োর বিদেশ মন্ত্রকের প্রেস সচিব কিতামুরা তোশিহিরো। তাঁর দাবি, ‘‘প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ও রহমানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই ধরনের কোনও আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশের লক্ষাধিক শ্রমিক আসার খবর সর্বৈব মিথ্যা।’’
প্রায়ই একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে বাংলাদেশি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বিডিনিউজ়২৪’কে। তারা জানিয়েছে, জাপান সফরে সেখানকার ‘স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার’ (এসএসডব্লিউ) কর্মসূচির আওতায় ঢাকার কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়েছেন রহমান। তবে, এ ব্যাপারে কোনও সার্বিক প্রতিশ্রুতি দেয়নি টোকিয়ো।
অন্য দিকে, সমাজমাধ্যমে ভুয়ো খবর ছড়ানোর উৎস সন্ধানে মিলেছে বিস্ফোরক তথ্যের হদিস। জানা গিয়েছে, লাখখানেক বাংলাদেশি শ্রমিক আসার গুজব ছড়ানোর নেপথ্যে বড় ভূমিকা নেয় রাশিয়া। গত কয়েক বছরে মস্কোকে এই ‘কাজ’ বার বার করতে দেখা গিয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের আদি বাসিন্দাদের মনে মুসলিম শরণার্থীদের ব্যাপারে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ‘হাতযশ’ রয়েছে ক্রেমলিনের।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এতে দু’দিক থেকে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া। প্রথমত, শরণার্থী ইস্যুকে সামনে রেখে যথেষ্ট উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিম ইউরোপে। যেখানকার অধিকাংশ দেশের সঙ্গে মস্কোর শত্রুতা কারোর অজানা নয়। আর তাই ঘরোয়া কোন্দলে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি ও স্পেনকে ব্যস্ত রাখতে চাইছে ক্রেমলিন।
তা ছাড়া, ১৯৪৫ সাল থেকে জাপানের কুরিল দ্বীপপুঞ্জকে নিজেদের কব্জায় রেখেছে রাশিয়া। এই নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে দুই দেশের মন কষাকষি। আর তাই ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি বা স্পেনের মতো অশান্তি টোকিয়োর অভ্যন্তরে ছড়িয়ে দিতে চক্রান্তের জাল মস্কো বুনেছিল কি না, তার উত্তর দেবে সময়।