মেঝেতে পোঁতা হাড়-চুলভর্তি কলসি! লীলাবতী হাসপাতালের ‘কালোজাদু’ মামলায় অভিযুক্তের সমন বাতিল
লীলাবতী হাসপাতালে নাকি ‘কালোজাদু’ চলত! অছি পরিষদের দফতরের মেঝের নীচে কালোজাদুর সরঞ্জাম পুঁতে রাখার অভিযোগ ওঠে। সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মেঝে খুঁড়ে আটটি কলস উদ্ধার হয়।
লীলাবতী হাসপাতালের ‘কালো জাদু’ মামলা। মুম্বইয়ের অভিজাত হাসপাতালের বহুল আলোচিত সেই মামলায় চাঞ্চল্যকর মোড়। হাসপাতালের অছি পরিষদের প্রাক্তন সদস্য নিকেত বিজয় মেহতার বিরুদ্ধে সমন বাতিল করল আদালত। এই মামলায় মাজগাঁওয়ের গ্রেটার মুম্বই সেশনস কোর্টের পর্যবেক্ষণ হল, মেঝের নীচে পুজোর কলস পুঁতে রাখা, কিংবা পরে তা খুঁজে পাওয়া, এগুলি কোনও ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে না।
অতিরিক্ত দায়রা বিচারক কুণাল ধনজি যাদব এই মামলায় ফৌজদারি ধারা পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করেছেন। একই সঙ্গে, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর মুম্বইয়ের বান্দ্রার আদালতের প্রথম শ্রেণির বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট যে আদেশ দিয়েছিলেন, সেটিও বাতিল করেছেন। ফলে, অছি পরিষদের বর্তমান সদস্যদের আনা কালো জাদুর অভিযোগগুলি নতুন করে খতিয়ে দেখা হতে পারে বলে ধারণা।
মুম্বইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে নাকি ‘কালো জাদু’ চলত! এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন হাসপাতালের ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সদস্যেরা। লীলাবতী কীর্তিলাল মেহতা মেডিকেল ট্রাস্ট পরিচালন পরিষদের সদস্য বলে নিজেকে দাবি করে, প্রশান্ত মেহতা নামের এক ব্যক্তি এই বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তাতে তিনি জানান, ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশের পর তিনি ট্রাস্টি বোর্ডের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পর, ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর কেবিনের মেঝের নীচে থেকে আটটি তামার পাত্রের সন্ধান পাওয়া যায়।
প্রশান্তের অভিযোগ, উদ্ধার হওয়া পাত্রগুলির মধ্যে মানুষের দেহাবশেষ, চাল, চুল, ছাই এবং কালো জাদুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সন্দেহ করা আরও কিছু সামগ্রী ছিল। তাঁর দাবি, নিকেত বিজয় মেহতা-সহ পূর্বতন অছি পরিষদের আরও ছয় সদস্য অলৌকিক শক্তির আশীর্বাদ লাভ এবং বর্তমান ট্রাস্টিদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে তন্ত্র-মন্ত্রের চর্চা করতেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছিল।
একই সঙ্গে, মুম্বইয়ের লীলাবতী হাসপাতালের অছি পরিষদের প্রাক্তন সদস্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন বর্তমান সদস্যেরা। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের তহবিল থেকে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন পূর্বতন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যেরা।
আরও পড়ুন:
এই ঘটনায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ট্রাস্টি বোর্ডের তরফে পুলিশ এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর কাছেও অভিযোগ দায়ের করা হয়। পূর্বতন ট্রাস্টি বোর্ড বা অছি পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তিনটি এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়েছে। সেই সংক্রান্ত অভিযোগগুলিতে আরও দাবি করা হয়, আর্থিক অনিয়মের জেরে মুম্বইয়ের বান্দ্রায় অবস্থিত লীলাবতী হাসপাতালের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
মুম্বইয়ের লীলাবতী হাসপাতালের আর্থিক নথিপত্র সম্প্রতি অডিট করার সময়েই বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপের বিষয়টি সামনে আসে বলে দাবি করেছেন অছি পরিষদের বর্তমান সদস্যেরা। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর মেহতার ভাই বিজয় মেহতা এবং তাঁর আত্মীয়দের বিরুদ্ধেই মূলত এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালের আধিকারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০২ সালে চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান কিশোর মেহতা। সেই সময় ট্রাস্টি বোর্ডের অস্থায়ী দায়িত্ব পান তাঁর ভাই বিজয় মেহতা। অভিযোগ, এই সুযোগে নথিপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে কিশোরকে ট্রাস্টি বোর্ডের স্থায়ী সদস্যপদ থেকে সরিয়ে দেন বিজয়। শুধু তাই নয়, নিজের সন্তান এবং ভাইপোদেরও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন।
আইনি লড়াইয়ের পরে ২০১৬ সালে পুনরায় অছি পরিষদে নিজের স্থান ফিরে পান কিশোর। গত বছরে কিশোরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রশান্ত এর স্থায়ী সদস্য হন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে ট্রাস্ট বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন বর্তমান ট্রাস্টিরা। প্রশান্ত দায়িত্বে আসার পরে হাসপাতালের তহবিলের অডিট করান।
আরও পড়ুন:
এর পর দু’টি সংস্থার মাধ্যমে একটি ফরেনসিক অডিট করানো হয়। প্রশান্তের অভিযোগ, ওই অডিটে প্রাক্তন ট্রাস্টিদের আমলে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, তহবিল তছরুপ এবং অর্থ আত্মসাতের একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে। প্রশান্তের দাবি, অডিট শেষ হওয়ার পর ফরেনসিক নিরীক্ষকেরা পাঁচটিরও বেশি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
স্পষ্ট ভাবে তাতে উল্লেখ রয়েছে, প্রাক্তন পরিচালনকারী গোষ্ঠী ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ ও অপব্যবহার করেছে। এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন প্রাক্তন ট্রাস্টিরা। এঁদের অধিকাংশই অনাবাসী ভারতীয় এবং দুবাই ও বেলজিয়ামের বাসিন্দা বলে অভিযোগ বর্তমান অছি পরিষদের সদস্য ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতার পুত্র প্রশান্তের।
বর্তমান অছি পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্য একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথাও প্রকাশ্যে আনে। তাদের দাবি, কয়েক জন কর্মচারী জানান যে বর্তমান ট্রাস্টিদের দফতরের মেঝের নীচে কালোজাদুর সরঞ্জাম পুঁতে রাখা হয়েছে। এর পর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মেঝে খুঁড়ে আটটি কলস উদ্ধার করা হয়। সেগুলির ভিডিয়োও করা হয়। বর্তমান অছি পরিষদের সদস্যদের দাবি, ওই কলসিগুলির মধ্যে মানুষের দেহাবশেষ, হাড়, চুল, চাল এবং কালোজাদুতে ব্যবহৃত হয় বলে সন্দেহজনক বিভিন্ন সামগ্রী ছিল।
হাসপাতালের এগজ়িকিউটিভ ডিরেক্টর তথা মুম্বইয়ের প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার পরমবীর সিংহ জানিয়েছেন, মহারাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে মামলা রুজু করার জন্য তাঁরা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু, পুলিশ মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন। পরে আদালত বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়। মামলার নথি ও জমা দেওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখতে গিয়ে বেশ কিছু অসঙ্গতি লক্ষ করেছে দায়রা আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, পাত্রগুলি কে বা কারা পুঁতেছিল, ঠিক কখন সেগুলি মাটির নীচে রাখা হয়েছিল কিংবা অভিযুক্তদের প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল, সে সম্পর্কে অভিযোগে কোনও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আদালতের সামনে উপস্থিত করা হয়নি।
আদালত আরও জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া হাড়গুলি আদৌ মানুষের দেহাবশেষ কি না, কিংবা চুল ও অন্যান্য সামগ্রী কোনও বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা প্রমাণ করার মতো কোনও ফরেনসিক রিপোর্ট বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেশ করা হয়নি।
এ ছাড়া, বিচারক উল্লেখ করেছেন, চাল, পবিত্র জল, মুদ্রা-সহ বিভিন্ন সামগ্রী ভিতরে ভরে, সেই পূজার পাত্র মাটির নীচে পুঁতে রাখার প্রথা বাস্তুশাস্ত্র এবং হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই, শুধুমাত্র এই ধরনের পাত্র উদ্ধার হওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না বলেও স্পষ্ট জানিয়েছে আদালত।
বিচারক সমস্ত অভিযোগ এবং সেই সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখার পর জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া কলসগুলি কালোজাদুর সঙ্গে সম্পর্কিত না-ও হতে পারে। আদালতের মতে, নিষিদ্ধ কোনও আচরণের প্রমাণ না থাকলে কিংবা কারও ক্ষতি করা, প্রতারণা বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত না হলে, এ ধরনের কাজকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
তাই, এ ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের সমন জারির আদেশ আইনত গ্রহণযোগ্য নয় এবং তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণও নেই বলে মনে করেছে দায়রা আদালত। সেই ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করে বিজয় মেহতার বিরুদ্ধে জারি করা সমন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।