আবার ‘ইন্ডিয়া আউট’ নীতি! তাই কি মাখামাখি পাকিস্তানের সঙ্গে? স্মৃতিভ্রম হল? মুইজ্জুকে প্রশ্ন মলদ্বীপের অন্দরেই
এত দিন মুইজ্জু পরিচিত ছিলেন ‘চিনপন্থী’ হিসেবে। কিন্তু, সম্প্রতি মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফরে গিয়ে একসঙ্গে ২০টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। সেই তালিকায় অন্যতম, দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি।
পাকিস্তানের সঙ্গে বেশিই মাখামাখি করছেন প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জু! ইসলামাবাদের সঙ্গে মালের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা বর্তমানে মলদ্বীপের জন্য সঙ্কটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এমনটাই দাবি করে মুইজ্জু সরকারকে এক হাত নিয়েছেন মলদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মহম্মদ নাশিদ-সহ বিরোধী নেতারা। তাঁরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের সঙ্গে মুইজ্জুর এই মেলামেশা, মলদ্বীপের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এত দিন মুইজ্জু পরিচিত ছিলেন ‘চিনপন্থী’ হিসেবে। কিন্তু, সম্প্রতি মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফরে গিয়ে একসঙ্গে ২০টি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। সেই তালিকায় অন্যতম হল, দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি। শুধু তাই নয়, পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জ়ারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের পাশাপাশি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সে দেশের সেনা সর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও পৃথক ভাবে বৈঠক করেছেন মুইজ্জু।
প্রতিরক্ষা ও সমুদ্র নিরাপত্তার পাশাপাশি বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কৃষি, মৎস্য চাষ, স্বাস্থ্য, পর্যটন, শিক্ষা, মাদক ও মানবপাচার রোধ এবং বিমান পরিষেবা উন্নত করার বিষয়েও চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ইসলামাবাদ-মালে। মলদ্বীপের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এই চুক্তিগুলি করা হয়েছে। এ ছাড়া, উভয় সরকার আগামী দু’বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১.৩০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে, পড়শি দ্বীপরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নয়াদিল্লিকে কিছুটা চাপে ফেলতে পারে বলে কূটনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা।
প্রসঙ্গত, প্রায় ১১ বছর পরে মলদ্বীপের কোনও রাষ্ট্রনেতা পাকিস্তান সফর করেন। ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত, সেই সফরের সময় পাকিস্তানে দাঁড়িয়ে তাদের সুরে সুর মিলিয়েই ‘সার্ক’ (দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির সংগঠন)-কে পুনরুজ্জীবিত করার ডাক দিয়েছেন মুইজ্জু। ঘটনাচক্রে, মূলত নয়াদিল্লির অনাগ্রহের কারণেই গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয়। ২০১৪ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শেষ বার, ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, সে বছরের সেপ্টেম্বরে জম্মু ও কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনার ঘাঁটিতে সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং ইসলামাবাদ সম্মেলন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভুটান এবং আফগানিস্তানও সেই সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করে। ফলে ইসলামাবাদ শীর্ষ সম্মেলনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। তার পর থেকে আর কোনও সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হয়নি। এর মধ্যেই পাকিস্তানে গিয়ে মুইজ্জুর মুখে শোনা গেল সার্ক-এর স্তুতি।
আরও পড়ুন:
তবে, মলদ্বীপের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সফর মালের বিদেশনীতি নিয়ে, সে দেশের অন্দরেও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী নেতারা প্রশ্ন তুলছেন, ভারতবিরোধী প্রচার করে ক্ষমতায় আসা মুইজ্জু কি দেশটির নিরাপত্তা এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে দীর্ঘ দিনের অংশীদারিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছেন?
সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তাটি এসেছে বিরোধী দল ‘মালদিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ (এমডিপি)-র চেয়ারপার্সন মহম্মদ নাশিদের তরফ থেকে। ২৫ অক্টোবর আদ্দু শহরে একটি সংবাদিক সম্মেলনে নাশিদ অভিযোগ করেন, মুইজ্জু ‘বেপরোয়া ভাবে’ মলদ্বীপকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার দীর্ঘ দিনের উত্তেজনার মধ্যে টেনে আনছেন। সংবাদমাধ্যম ‘সান অনলাইন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী নাশিদ বলেন, “ছোট দেশগুলির, বিশেষ করে মলদ্বীপের সামনে যে ঝুঁকি রয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অথচ, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু কোনও রকম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই পাকিস্তান সফর করেছেন এবং মলদ্বীপকে আবারও ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যেকার বিরোধের কেন্দ্রে ঠেলে দিয়েছেন।”
মলদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেন, “ভারত যদি মনে করে যে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, তবে মলদ্বীপকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে।” তিনি যুক্তি দেন, ইসলামাবাদের সঙ্গে মুইজ্জুর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে যদি নয়াদিল্লি তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে, তবে মলদ্বীপকে বড় খেসারত দিতে হবে। মুইজ্জুর পাকিস্তান সফরকে কেন্দ্র করে যে সে দেশের রাজনৈতিক মহলের অন্দরে উত্তেজনা রয়েছে, তা নাশিদের মন্তব্যেই ফুটে উঠেছে। এ কথা ঠিক যে, মলদ্বীপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের উপর দীর্ঘ দিনের নির্ভরশীলতার কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে মলদ্বীপের প্রতিরক্ষা এবং সামুদ্রিক সহযোগিতার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড় তাৎপর্য বহন করতে পারে বলে মনে করছেন বিরোধীরা।
মুইজ্জুর পাকিস্তান সফর নিয়ে মলদ্বীপের অন্যান্য বিরোধী নেতাও প্রশ্ন তুলেছেন এবং সমালোচনা করেছেন। মলদ্বীপের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহিদের অভিযোগ, মুইজ্জু ২০২৩ সালের মতোই আবারও একটি ‘ভারতবিরোধী প্রচার’ শুরু করতে যাচ্ছেন। আর এক প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিনও এই সফরের সময় মুইজ্জুকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই সব মন্তব্য মলদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামাবাদের সঙ্গে মালের এই ঘনিষ্ঠতার কৌশলগত প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
পাকিস্তানে গিয়ে মুইজ্জু একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করলেও, নিরাপত্তা সংক্রান্ত দিকটিই সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। মুইজ্জু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয়।
পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে তাদের বিরোধের বিষয়টি মুইজ্জুর আলোচনায় নিয়ে আসায় এই সফরের কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান মুইজ্জুর কাছে তুলে ধরেন পাক প্রধানমন্ত্রী শরিফ। পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত নয়াদিল্লি নিয়েছে, ধারাবাহিক ভাবে তার বিরোধিতা করে আসছে ইসলামাবাদ। তবে, এই সফরের সময় কাশ্মীর বা সিন্ধু জল চুক্তির বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থানকে মুইজ্জু প্রকাশ্যে সমর্থন করেননি। বরং, তিনি ‘সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিয়োনাল কোঅপারেশন’ বা ‘সার্ক’-কে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। মুইজ্জু জানিয়েছেন, সার্ক-এর আরও একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলির সঙ্গে কাজ করতে মলদ্বীপ প্রস্তুত।
ইসলামাবাদের সঙ্গে মুইজ্জুর এই যোগাযোগ বা উদ্যোগের বিষয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। ২৪ অক্টোবর ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবাল বলেন, নয়াদিল্লি এই চুক্তিগুলির উপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজনে যথাযথ পদক্ষেপ করবে। জয়সবাল বলেন, ‘‘খবরে এসেছে, দু’দেশের মধ্যে কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা এই ঘটনাপ্রবাহ নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজন হলে যে কোনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করব।’’ এই বার্তা থেকেই স্পষ্ট, ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি এবং ভারতের নিকটতম সামুদ্রিক প্রতিবেশীর মধ্যে ঘটে যাওয়া এ সব ঘটনার উপর বিশেষ নজর রাখছে নয়াদিল্লি।
ভারতের এই বার্তার পরেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে মলদ্বীপের রাজনৈতিক মহলের অন্দরে। দ্বীপরাষ্ট্রটি বর্তমানে কোনও সঙ্কট সামলানোর মতো অবস্থায় নেই বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীরাও। বিরোধী নেতাদের উদ্বেগ কেবল মালে ও ইসলামাবাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির সংখ্যা নিয়ে নয়। তাঁদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, মুইজ্জুর করা পদক্ষেপে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কোনও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে না তো!
২৫ অক্টোবর সংবাদমাধ্যম ‘আধাধু’-তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে মলদ্বীপের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারিয়া আহমেদ দিদি যুক্তি দিয়েছেন, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই নিরাপত্তা চুক্তিগুলি আরও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন ছিল ক্ষমতাসীন মুইজ্জু সরকারের।
দিদি স্বীকার করেছেন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাণিজ্য, কৃষি এবং পর্যটন খাতে পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা প্রকৃত সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি আরও জোর দিয়ে মন্তব্য করেছেন, উভয় দেশের সঙ্গেই স্বাধীন সম্পর্ক বজায় রাখার পূর্ণ অধিকার মলদ্বীপের রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘‘এই সম্পর্কগুলি একে অপরের পরিপন্থী নয়।’’ তবে, দিদি সতর্কও করেছেন। জানিয়েছেন, সরকারের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, এই কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলিকে একটি বৃহত্তর কৌশলগত জোটের অংশ হিসেবে দেখা হতে পারে।
মলদ্বীপের প্রাক্তন এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘পৃথক চুক্তি, প্রকাশ্য বিবৃতি এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলিকে বৃহত্তর কৌশলগত জোটের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এমনকি, যদি সরকারের উদ্দেশ্য তা না-ও হয়ে থাকে, তবুও বিষয়টি অন্য ভাবে দেখা হতে পারে।’’ দিদি এ-ও সতর্ক করেছেন, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে মলদ্বীপ তার কূটনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা সংক্রান্ত অংশীদারি, গোয়েন্দা সম্পর্ক এবং নিজস্ব পরিকাঠামো ব্যবহারের বিষয়ে চাপের মুখে পড়তে পারে।
দিদি এমনটি একবারও বলেননি যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উচিত নয় মলদ্বীপের। বরং, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন মুইজ্জু নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলির দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির যথাযথ ভাবে মূল্যায়ন করেছে কি না এবং দেশটির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে কি না। তাঁর এই উদ্বেগ মলদ্বীপের অর্থনৈতিক চাপের দিকটিও তুলে ধরে। পর্যটনই হল এই দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান উৎস। আবার তারা পণ্য আমদানির উপরেও ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটকদের আস্থা এবং বাণিজ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যার খেসারত দিতে হতে পারে সাধারণ মলদ্বীপবাসীকে। একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে শান্তি এবং স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাটা তাই নিরাপত্তার অগ্রাধিকার এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা—উভয়ই।
মলদ্বীপের প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সফর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে মুইজ্জুর রাজনৈতিক যাত্রা এবং উত্থান নিয়েও। ২০২৩ সালে ‘ইন্ডিয়া আউট’ (ভারত হটাও) স্লোগানকে সামনে রেখে মুইজ্জু এবং তাঁর দল ‘পিপল’স ন্যাশনাল কংগ্রেস’ বা পিএনসি ক্ষমতায় আসে। আর, সঙ্গে সঙ্গে মলদ্বীপে অবস্থানরত ভারতীয় সামরিক কর্মীদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার দাবি তোলেন মুইজ্জু। এর জেরে ২০২৪ সালের মে মাসে মানবিক সহায়তা এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার কাজে ব্যবহৃত বিমান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় সামরিক কর্মীদের পরিবর্তে অসামরিক কারিগরি কর্মীদের নিয়োগ করা হয়। তার আগে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়েও কুরুচিকর মন্তব্য করেছিলেন মুইজ্জুর মন্ত্রিসভার তিন সদস্য। পরে যদিও তাঁদের বরখাস্ত করা হয়।
এর পরেই মলদ্বীপের বিরোধিতা করে সোচ্চার হয় ভারত। দ্বীপরাষ্ট্রটি বয়কটের ডাক দেন ভারতীয় পর্যটকেরা। চাপের মুখে পড়ে যায় মলদ্বীপের পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি। এর পর থেকে মুইজ্জু নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে, ভারতের সঙ্গে মুইজ্জুর অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মলদ্বীপে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এমডিপি (মালদিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি)-র নেতৃত্ব পাওয়ার দৌড়ে রয়েছেন দ্বীপরাষ্ট্রের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহিদ। তাঁর অভিযোগ, মুইজ্জু আবারও ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থানের দিকে ঝুঁকছেন। এক সাক্ষাৎকারে শহিদ মন্তব্য করেছেন, পরবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, প্রেসিডেন্ট হয়তো আবারও ভারতবিরোধী বক্তব্য সামনে নিয়ে আসতে পারেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই এমন আচরণ করছে।
তবে, এগুলি বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র। এর কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই যে মুইজ্জু সত্যিই সেই পুরোনো প্রচার কৌশলকে পুনরুজ্জীবিত করতে চান বা মলদ্বীপকে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চান। তাঁর সরকার নিজেদের বিদেশনীতিকে ‘মলদ্বীপ ফার্স্ট’ (মলদ্বীপই সবার আগে) বলে অভিহিত করে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটির কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ, এই নীতিটিকে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলে রূপান্তরিত করা। মলদ্বীপ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব অটুট রাখতে পারে। তবে, প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এর পরিধি ও প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।