‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’, চিনকে খুশি করতে তাইওয়ানের বিমান চলাচলে ‘না’ বলেও ডিগবাজি খেল পাকিস্তান!
‘এক চিন’ নীতি মেনে নিজেদের আকাশসীমায় তাইওয়ানের বিমান চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে পাকিস্তান। কিন্তু, কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয় ইসলামাবাদ। কেন এই ডিগবাজি?
চিনকে ‘তোষামোদ’ করতে গিয়ে নজিরবিহীন পদক্ষেপ। সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ানের (পড়ুন, রিপাবলিক অফ চায়না) জন্য আকাশসীমা বন্ধই করে দিল পাকিস্তান। তবে, সেই সিদ্ধান্তে বেশিক্ষণ অনড় থাকতে পারেনি তারা। ফলে আপাতত ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর মাটিতে অবতরণ করতে পারবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির যে কোনও যাত্রীবাহী বিমান। বেজিঙের ‘এক চিন’ নীতির প্রতি বাড়তি আনুগত্য দেখাতেই যে ইসলামাবাদ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য।
সম্প্রতি পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয় ‘ব্লুমবার্গ’। সেখানেই জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যমটির করা একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের বিমান চলাচল বিভাগ ‘এক চিন’ নীতি অনুসরণ করে চলছে। আর তাই, শুধু মাত্র ড্রাগনভূমির মূল ভূখণ্ডের উড়োজাহাজকেই এখানে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, বাকিদের নয়।’’ বেজিঙের সমস্ত উড়ান সংস্থা এর আওতাধীন বলেও সেই সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেন তিনি।
তাইওয়ানের বিরুদ্ধে এহেন পদক্ষেপ করা বিশ্বের প্রথম দেশটিই হল পাকিস্তান। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে চিনকেও ছাপিয়ে গিয়েছে তারা। কারণ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির বিমান সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করেনি বেজিং। অন্য দিকে, ইসলামাবাদের সাময়িক নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপ ও মধ্য এশিয়াগামী যাবতীয় বিমানের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হতে হয় সাবেক ফরমোজ়াকে। ফলে, গন্তব্যে পৌঁছোনোর সময় ও খরচ, দু’টিই বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ওই পাক নিষেধাজ্ঞার পর বিমান চলাচলের নজরদারি সংস্থা ‘ফ্লাইটরেডার২৪’-এর তথ্য উদ্ধৃত করে, তাইওয়ানের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাবও তুলে ধরে ‘ব্লুমবার্গ’। মার্কিন গণমাধ্যমটি দাবি করে, গত ২৫ অক্টোবর সকাল থেকে ইসলামাবাদের আকাশসীমা ব্যবহার বন্ধ করে দেয় সাবেক ফরমোজ়ার দু’টি উড়ান প্রতিষ্ঠান। সেগুলি হল, চায়না এয়ারলাইন্স লিমিটেড এবং ইভা এয়ারওয়েজ কর্পোরেশন।
‘ফ্লাইটরেডার২৪’ জানিয়েছে, পাক আকাশসীমা বন্ধ হওয়ার পর রাশিয়া হয়ে অনেকটা ঘুরে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলিতে পৌঁছোয় তাওয়ানের বিমান। পাশাপাশি, পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশের আকাশপথও ব্যবহার করতে শুরু করে তারা। তবে, এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি চায়না এয়ারলাইন্স, ইভা এয়ারওয়েজ এবং তাইওয়ান সরকার।
আরও পড়ুন:
অতীতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে যেতে মস্কোর আকাশসীমা ব্যবহার করত তাইওয়ান। কিন্তু, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ-ইউক্রেন সংঘর্ষ শুরু হলে, নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে, ওই রাস্তা বর্জন করে সংশ্লিষ্ট দুই উড়ান সংস্থা। লড়াইয়ের গোড়াতেই ক্রেমলিনের উপর ১৬,০০০-এর বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় পশ্চিমি বিশ্ব। তার মধ্যে অবশ্য এই দ্বীপরাষ্ট্রের বিমান পরিষেবাকে কখনই অন্তর্ভুক্ত করেনি তারা।
দীর্ঘ দিন ধরেই তাইওয়ানের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছে চিন। সাবেক ফরমোজ়াকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে বেজিং। আর তাই, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির যে কোনও স্বাধীন পদক্ষেপে আপত্তি তুলে থাকে ড্রাগন। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায় তাদের। এর ফলে, অতীতেও বহুবার নানা ভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে তাইওয়ানের সরকারকে।
উদাহরণ হিসেবে, এ বছরের এপ্রিলের কথা বলা যেতে পারে। ওই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ এসওয়াতিনি সফরের সিদ্ধান্ত নেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। যাত্রার সব কিছু যখন ঠিকঠাক, তখনই হঠাৎ তাঁর বিমানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি প্রত্যাহার করে সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কার। ফলে, সফর স্থগিত করতে বাধ্য হন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান।
এ ছাড়া, গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ৩০ এপ্রিল থেকে তাইওয়ানের পাসপোর্ট গ্রহণ বন্ধ করেছে সোমালিয়া। এ বছরের জুনে মোম্বাসায় বিজ্ঞানধর্মী একটি সম্মেলনের আয়োজন করে কেনিয়া। সেখানে সাবেক ফরমোজ়ার গবেষকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি আফ্রিকার দেশটির সরকার। তবে, এদের থেকে আরও একধাপ এগিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাক প্রশাসন, যার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ।
আরও পড়ুন:
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরেই চরম আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে ইসলামাবাদ। এই পরিস্থিতিতে দেউলিয়া হওয়া আটকাতে পাকিস্তানকে লাগাতার ঋণ জুগিয়ে যাচ্ছে চিন। শুধু তা-ই নয়, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর ভূখণ্ডে নিজের প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে বেজিং। সেই কারণেই নানা ভাবে ড্রাগনকে খুশি রাখতে এক প্রকার বাধ্য হচ্ছে সেখানকার শাহবাজ় শরিফের সরকার।
২০১৩ সালে বিআরআই প্রকল্পের অন্তর্গত ‘চিন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ বা সিপিইসি-র ঘোষণা করে বেজিং ও ইসলামাবাদ। দু’বছরের মাথায় (পড়ুন, ২০১৫ সাল) শুরু হয় এর কাজ। এতে এখনও পর্যন্ত ২,৫৯০ কোটি মার্কিন ডলার লগ্নি করেছে বেজিং। আগামী দিনে টাকার অঙ্ক আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর তাই, ড্রাগনের বিরুদ্ধাচরণ করা ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর পক্ষে অসম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, চিন-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে আরও একটি কারণ রয়েছে। সেটি হল, ইসলামাবাদের চরম ভারত-বিরোধিতা। নয়াদিল্লিকে চাপে রাখতে গত শতাব্দীর ৫০ ও ৬০-এর দশকে বেজিঙের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ পাতান তৎকালীন পাক সেনাশাসক ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান। ১৯৬৩ সালে পাক অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের শাক্সগম উপত্যকা ‘উপহার’ হিসেবে ড্রাগনের হাতে তুলে দেন তিনি।
১৯৫৮ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন আয়ুব। তিনি কুর্সিতে বসার আগেই অবশ্য বেজিং-ইসলামাবাদ সম্পর্কের রসায়ন টের পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৫১ সালে ড্রাগনকে খুশি করতে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ভাবে যাবতীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী।
বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির সঙ্গে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য করে থাকে পাকিস্তান। তাইওয়ানকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি ইসলামাবাদ। ফলে, সাবেক ফরমোজ়ার বিমান চলাচলের জন্য ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর আকাশসীমা বন্ধ করা কোনও আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়, বলছেন সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
যদিও তাইওয়ানের বিরুদ্ধে কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার দু’তিন দিনের মাথাতেই ‘ডিগবাজি’ খেয়েছে পাক প্রশাসন। গত ২৮ অক্টোবর এ ব্যাপারে বিবৃতি দেয় শাহবাজ় প্রশাসন। বলে, আগামী বছরের (পড়ুন, ২০২৭ সাল) ২৭ মার্চ পর্যন্ত ইসলামাবাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে সাবেক ফরমোজ়ার চায়না এয়ারলাইন্স এবং ইভা এয়ারওয়েজ়।
তাইওয়ানের ব্যাপারে কেন হঠাৎ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে পাক সরকার সিদ্ধান্ত বদল করল, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। অন্য দিকে, ইসলামাবাদের নরম মনোভাবের জেরে সাবেক ফরমোজ়ার বিমান পরিষেবা সংস্থাগুলি তাদের উড়োজাহাজের মুখ ঘোরাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। কারণ, পশ্চিম ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বার বার পথ পরিবর্তন তাদের জন্যেও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ।