‘ভোট চুরি’ থেকে ‘ঘোড়া কেনাবেচা’, সরকার গঠনে ভারতীয় রাজনীতির ‘ফন্দি’ কাজে লাগাবে ইজ়রায়েল?
জাতীয় নির্বাচন শেষে ইহুদি ভূমির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে টানটান নাটক। এ বারের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনও দল বা জোট। তাহলে কি ফের সরকার গড়তে ‘ঘোড়া কেনাবেচা’য় জড়াবেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী?
জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে ইজ়রায়েলে চড়ছে পারদ। কোনও দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনে ‘ঘোড়া কেনাবেচা’র সম্ভাবনা প্রবল। অন্য দিকে, ইতিমধ্যেই ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে সরব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। এ ব্যাপারে পশ্চিম এশিয়ার ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রটির সঙ্গে ভারতের সংসদীয় রাজনীতির পরতে পরতে মিল ধরা পরায় বিস্মিত বিশেষজ্ঞ মহল।
ইজ়রায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ইহুদি রাষ্ট্রটির ৯০ শতাংশ ব্যালট গণনা হয়ে গিয়েছে। তাতে এখনও পর্যন্ত ৫৩টি আসন জিতেছে নেতানিয়াহু গোষ্ঠী। পাশাপাশি, ‘ইয়াশার’ নেতা তথা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। এ ছাড়া, ১৯টি আসন দখল করেছে আরব জোট, যারা ‘রাজা’ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইজ়রায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর মোট আসন ১২০। ফলে, স্বাভাবিক ভাবেই সরকার গঠনের ‘জাদু সংখ্যা’ বা ম্যাজিক ফিগার হল ৬১। যেটি এখনও পর্যন্ত পায়নি কোনও দল বা জোট। বিশেষজ্ঞদের দাবি, নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনে চরম অনিশ্চয়তার জেরে তিন দিকে বাঁক নিতে পারে ইহুদি রাষ্ট্রটির ঘরোরা রাজনীতি। আনন্দবাজার ডট কম-এর এই প্রতিবেদনে রইল তার হদিস।
উল্লেখ্য, ভোটের ফল অনুযায়ী, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও একক বৃহত্তম জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। বিশেষজ্ঞদের দাবি, রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে প্রথমে তাঁকেই সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন ইজ়রায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজ়োগ। সে ক্ষেত্রে কুর্সি টিকিয়ে রাখতে ‘নেসেট’-এর আস্থা ভোটে জিততে হবে তাঁকে।
তবে, সরকার গঠনে প্রবল ভাবে উঁকি দিচ্ছে আরও একটি সম্ভাবনা। সেটি হল, আরব জোটের সমর্থন নিয়ে আইজ়েনকোট নেতৃত্বাধীন মোর্চার ক্ষমতা দখল। সে ক্ষেত্রে ৬৭-তে (৪৮ + ১৯) পৌঁছোবে তাদের আসনসংখ্যা, যেটি প্রয়োজনীয় ‘জাদু সংখ্যা’র চেয়ে বেশি। তবে, আরব সমর্থন নিলে আইজ়েনকোটের জোট অটুট থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
আরব জোটে রয়েছে মূলত তিনটি দল। সেগুলি হল হাদাশ, তাল এবং বালাদ। এরা সম্মিলিত ভাবে পেয়েছে ১২টি আসন। এ ছাড়া আরেকটি আরব দল র্যাম-এর দখলে গিয়েছে সাতটি আসন। এই পরিস্থিতিতে আরবদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের দাবি তুলেছেন মধ্য-বামপন্থী ‘দ্য ডেমোক্র্যাট্স’ দলের নেতা ইয়াইর গোলান। নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজ়েনকটের পক্ষে এই প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলা কিন্তু বেশ কঠিন।
‘দ্য ডেমোক্র্যাট্স’-সহ আইজ়েনকোটের জোটে মোট চারটি রাজনৈতিক দল রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল, তাঁর নিজের মধ্যপন্থী ও উদারনৈতিক জ়ায়নবাদী দল ‘ইয়াশার’। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের ‘বি’ইয়াহাদ’ এবং আভিগদর লিবারম্যান নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ‘ইজ়রায়েল বেইতেনু’র সমর্থনও পাচ্ছেন তিনি। আরবদের সঙ্গে নিলে এদের মধ্যে ভাঙন ধরার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
ইজ়রায়েলের ঘরোয়া রাজনীতিতে আরব জোটকে ‘অচ্ছুত’ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। কারণ, কোনও দলই ইহুদি ভোটারদের চটাতে চায় না। তার উপর আবার অতি ডানপন্থীদের দাবি, আরব নাগরিকদের আনুগত্য রয়েছে পুরোপুরি প্যালেস্টাইনের দিকে। শুধু তা-ই নয়, গোপনে গোপনে হামাস বা হিজ়বুল্লার মতো সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গেও তাঁদের যোগাযোগের আশঙ্কা করে থাকে তারা।
ইজ়রায়েলের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক পঞ্চমাংশ রয়েছে আরবদের দখলে। এই নাগরিকদের বড় অংশের অভিযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান-সহ একাধিক ইস্যুতে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা। নির্বাচনের আগে এই ইস্যুগুলিকে সামনে রেখে প্রচারে ঝড় তোলে সংশ্লিষ্ট চার আরব রাজনৈতিক দল। এর সুফল যে ভোটের বাক্সে তারা ভাল ভাবেই পেয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন:
২০২১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরেও একই রকম রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখে পড়ে ইজ়রায়েল। ওই সময় ‘বি’ইয়াহাদ’ নেতৃত্বাধীন জোটটে সমর্থন জানান আরব দল ‘র্যাম’-এর নেতা মনসুর আব্বাস। ফলে, সরকার গঠন করে তারা। প্রধানমন্ত্রী হন বেনেট। তবে, সেই বন্দোবস্ত বেশি দিন চলেনি। এক বছরের মাথায় অতি দক্ষিণপন্থীরা জোট ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ায় পতন হয় সেই সরকারের। ফলে, ফের প্রধানমন্ত্রী হন নেতানিয়াহু।
মজার বিষয় হল, নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই রাজনীতির দুনিয়ায় পা রাখেন বেনেট। ২০১৩-২০ সালের মধ্যে ইহুদি রাষ্ট্রটির একাধিক দফতরের মন্ত্রী হন তিনি। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে ছিলেন ‘বিবি’ (নেতানিয়াহুর ডাক নাম)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, আইজ়েনকোটের জোট ভাঙতে তাঁকে ‘বড় টোপ’ দিতে পারেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী।
অন্য দিকে, গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে লিকুদ পার্টির শীর্ষ পদ পান লিবারম্যান। ১৯৯৬ সালের ভোটে ‘বিবি’র জয়ে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভায় দু’দফায় দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলাতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ২০০৯-১৫ সাল পর্যন্ত বিদেশমন্ত্রী এবং ২০১৬-১৮ সাল পর্যন্ত ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি।
২০১৮ সালে প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাস-এর সঙ্গে সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হয় তেল আভিভ। ওই সময় নেতানিয়াহু সরকারের বিরোধিতা করে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন লিবারম্যান। ইহুদি রাষ্ট্রটির রাজনীতিতে কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে বিশেষ পরিচিতি আছে তাঁর। ফলে, সরকার গঠনে আইজ়েনকোট জোট আরব দলগুলির সমর্থন নিলে, ফের ‘বিবি’-র দলে ভিড়তে পারেন তিনিও।
তৃতীয় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হল সময়। ইজ়রায়েলে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড়ের জন্য কোনও দল বা জোটের নেতাকে ২৮ দিন সময় দিয়ে থাকেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। প্রয়োজনে সেটি বাড়তে পারে আরও দু’সপ্তাহ। তবে, ওই সময়ের মধ্যে বৃহত্তম দল বা জোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে, অন্য এক জন নেতাকে বেছে নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্টের বেছে নেওয়া নেতা সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড়ে ব্যর্থ হলে, তৃতীয় নেতা বাছার জন্য আবেদনের সুযোগ পাবেন ‘নেসেট’-এর সদস্যবৃন্দ। সেই নামও যাবে প্রেসিডেন্টের কাছেই। তিনিও সরকার তৈরি করতে না পারলে ফের নির্বাচন হবে ইজ়রায়েলে। এর পর যত দিন না নতুন সরকার গঠিত হচ্ছে, তত দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেবেন প্রেসিডেন্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই নিয়মের ফাঁক গলে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড় করতে ‘ঘোড়া কেনার’ যথেষ্ট সময় পাবেন নেতানিয়াহু। তা ছাড়া, শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থা বজায় থাকলে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যাবেন তিনি। ২০১৯-২২ সালের মধ্যে পাঁচবার ভোট হয়েছে পশ্চিম এশিয়ার ওই ইহুদি রাষ্ট্রে। প্রতি বারই প্রকাশ্যে এসেছে জোটের অসন্তোষ।
গত ২৮ অক্টোবর ভোট গণনা চলাকালীনই ‘বিবি’ যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছেন না, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। এর পরই ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন নেতানিয়াহু। সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে তিনি লেখেন, ‘‘আরব জনবসতিপূর্ণ এলাকার গণনাকেন্দ্রগুলিতে নির্বাচনী কারচুপি হয়েছে।’’ ভুয়ো নথি দেখিয়ে, অন্যদের হুমকি দিয়ে ভোট লুটের কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
সাম্প্রতিক অতীতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে দল ভাঙিয়ে বেশ কয়েক বার সরকার গঠনের অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে একাধিক ভারতীয় রাজ্যের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এ বার ইজ়রায়েলেও সরকার গঠনে বিশেষ কোনও ‘অপারেশন’ দেখতে পাওয়া যায় কি না, তার উত্তর দেবে সময়।