২টি শহরে ৩৬টি বিলাসবহুল ভিলা! কিনে নেন ‘জলের দরে’, দুর্নীতি নিয়ে তদন্তের মুখে আইএএস-আইপিএস দম্পতি
শিখর অগ্রবালের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহারের একগুচ্ছ অভিযোগ আনা হয়েছে। দীর্ঘ সেই তালিকায় কোন কোন সম্ভাব্য অপরাধের উল্লেখ রয়েছে?
দু’টি শহর, ৩৬টি ভিলা, ৫ কোটি টাকা! দুর্নীতির অভিযোগে ‘ঘেরাও’ রাজস্থানের আইএএস-আইপিএস দম্পতি। প্রবীণ আইএএস কর্তা শিখর অগ্রবালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে সে রাজ্যের দুর্নীতি দমন ব্যুরো (এসিবি)।
অভিযোগ, শিখর তাঁর সরকারি পদের অপব্যবহার করে একটি বেসরকারি আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) সংস্থাকে অন্যায় ভাবে সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন এবং নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বেশ কয়েকটি রিসর্ট, ভিলা হাতিয়ে নিয়েছেন।
কয়েক দিন আগে পর্যন্ত শিল্প দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন শিখর। এখন তাঁর এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘গয়াল ফ্যাশনস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর পরিচালকদের মধ্যে যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছেন তদন্তকারীরা। সংস্থাটি ‘অনন্ত’ ব্র্যান্ডের নামে একাধিক হোটেল এবং রিসর্ট পরিচালনা করে।
শিখরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমলা হওয়ার সুবাদে সংস্থাটিকে বিশেষ ছাড় দিয়েছেন তিনি। রিসর্ট নির্মাণের শর্তাবলীতে শিথিলতা আনা এবং বাধ্যতামূলক শংসাপত্রগুলি যথাযথ ভাবে যাচাই না করেই বিভিন্ন অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আর, তার বিনিময়ে নাকি নিজের ও আত্মীয়দের নামে অনৈতিক ভাবে সম্পত্তি বাগিয়েছেন তিনি!
রাজস্থান এসিবি-র প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার শিখরের বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমতি দিয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর বিভিন্ন প্রতিবেদন, শিল্প দফতর এবং গোপন সূত্র থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
এসিবি-র ডিরেক্টর জেনারেল গোবিন্দ গুপ্ত জানিয়েছেন, শিখর অগ্রবাল, গয়াল ফ্যাশনসের পরিচালনমণ্ডলী এবং ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য সরকার ‘প্রিভেনশন অফ করাপশন অ্যাক্ট, ১৯৮৮’-এর ১৭এ ধারার অধীনে এই প্রক্রিয়া চালানোর অনুমতি দিয়েছে।
এসিবি-র প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, অভিযুক্ত আমলা ওই সংস্থার পরিচালকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি নিজের সরকারি পদমর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে নিজের এবং ওই বেসরকারি সংস্থা — উভয়ের জন্যই সুবিধা করে দিয়েছিলেন। ফলে, রাজ্য সরকারের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এসিবি-র এই তদন্ত মূলত রাজস্থান সরকারে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক দায়িত্বে শিখরের কাজ করার সময়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উদয়পুরের জেলাশাসক, রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং শিল্প দফতরে অতিরিক্ত মুখ্যসচিব হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কাল।
এসিবি খতিয়ে দেখছে, ওই পদগুলিতে থাকাকালীন শিখরের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি ‘গয়াল ফ্যাশনস প্রাইভেট লিমিটেড’-কে এমন কোনও সুবিধা পেতে সাহায্য করেছিল কি না, যা অন্যথায় সংস্থাটি পেত না। এ ছাড়া, ওই সিদ্ধান্তগুলির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের রিসর্ট, ভিলা কেনার কোনও যোগসূত্র আছে কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
‘অনন্ত’ ব্র্যান্ডের নামে বিভিন্ন রিসর্ট এবং হোটেল পরিচালনা করে ‘গয়াল ফ্যাশনস প্রাইভেট লিমিটেড’। এর মধ্যে রয়েছে উদয়পুরের বুজদা এবং অলওয়ারের অজবগড়ে অবস্থিত সম্পত্তি। এই দু’টি জায়গাতেই এমন কিছু ভিলা রয়েছে, যা শিখর, তাঁর স্ত্রী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রাথমিক তদন্তে ‘অনন্ত’ ব্র্যান্ডের দু’টি রিসর্টে বেশ কয়েকটি ভিলার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি শিখর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যেরা কিনেছেন বলে অভিযোগ। আরও অভিযোগ হল, উদয়পুরের বুজদায় ২০টি ভিলা কেনা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি শিখরের নামে এবং বাকি ১০টি তাঁর স্ত্রী তথা আইপিএস কর্তা প্রশাখা মাথুরের নামে রয়েছে। প্রতিটি ভিলার ক্রয়মূল্য গড়ে ১৫ লক্ষ টাকা। ফলে, লেনদেনগুলির ভিত্তিতে ২০টি সম্পত্তির মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি টাকা।
তদন্তাধীন সম্পত্তির দ্বিতীয় অংশটি অলওয়ারের অজবগড়ে অবস্থিত ‘অনন্ত’ রিসর্টে রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই রিসর্টে আটটি ভিলা শিখর এবং তাঁর স্ত্রীর নামে কেনা হয়েছিল, যার মধ্যে চারটি করে ভিলা তাঁদের প্রত্যেকের নামে ছিল। এ ছাড়া, আরও চারটি ভিলা তাঁদের দুই ছেলের নামে এবং অন্য চারটি ভিলা শিখরের শ্বশুর-শাশুড়ির নামে ছিল।
অজবগড়ের এই সম্পত্তিগুলির ক্ষেত্রে প্রতিটি ভিলার ক্রয়মূল্য প্রায় ১৫ লক্ষ থেকে ১৬.৫ লক্ষ টাকার মধ্যে। শিখর এবং তাঁর স্ত্রীর নামে কেনা আটটি ভিলার প্রতিটির মূল্য দেখানো হয়েছে ১৬.৫ লক্ষ টাকা। অন্য দিকে, তাঁদের ছেলেদের নামে নিবন্ধিত চারটি ভিলার প্রতিটির দাম প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। শ্বশুর-শাশুড়ির নামে নিবন্ধিত চারটি ভিলার প্রতিটির মূল্য ছিল প্রায় ১৬.৫ লক্ষ টাকা। অভিযোগ, এ সব সম্পত্তিই বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে কিনেছিলেন শিখর।
সব মিলিয়ে তদন্তে অজবগড়ে ১৬টি এবং বুজদায় ২০টি — মোট ৩৬টি ভিলার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। উল্লেখিত ক্রয়মূল্যগুলি সঠিক বলে ধরে নিলে ওই ৩৬টি সম্পত্তির সম্মিলিত মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫.৫২ কোটি টাকা। এসিবি-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানের অর্থ দফতর গত ২৭ মার্চ ‘গয়াল ফ্যাশনস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর জন্য একটি বিশেষ সুবিধাজনক আর্থিক প্যাকেজ জারি করেছিল। তদন্তকারীরা এমন কিছু তথ্যও পেয়েছেন, যা থেকে জানা যায়, ঠিক সেই দিনই শিখর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ২০টি ভিলা নিবন্ধিত হয়েছিল।
তবে, যাঁদের নিয়ে এত হইচই সেই আইএএস-আইপিএস দম্পতির মধ্যে শিখর আপাতত রয়েছেন বিদেশে। রাজস্থান সরকার তাঁর স্ত্রী তথা আইপিএস আধিকারিক প্রশাখাকে ‘অ্যাওয়েটিং পোস্টিং অর্ডার’ (এপিও) বা অপেক্ষমান তালিকায় রেখেছে। ১৯৯৫ ব্যাচের আইপিএস আধিকারিক প্রশাখা পুলিশ সদর দফতরে ‘অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ’ (এডিজিপি) পদে কর্মরত ছিলেন। অন্য দিকে, ১৯৯৩ ব্যাচের আইএএস শিখর শিল্প দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বুধবার রাজ্য সরকার তাঁকেও এপিও (পদায়ন-অপেক্ষমান) অবস্থায় পাঠায়।
শনিবার প্রশাখার বিরুদ্ধে করা পদক্ষেপের পর, এসিবি স্পষ্ট করেছে যে তাদের বর্তমান তদন্তটি কেবল শিখরের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ। প্রশাখার বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা করা হয়নি। তবে, এসিবি-র একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে ভবিষ্যতে তাঁকেও এর অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পাশাপাশি এসিবি কর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে আইএএস আধিকারিক শিখরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হতে পারে। প্রয়োজনে তাঁর স্ত্রী প্রশাখাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে।
শুক্রবার মুখ্যসচিব ভি শ্রীনিবাস এসিবি-র ডিরেক্টর জেনারেল গোবিন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে, এক্স-এ এক পোস্টে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন। ঘটনাচক্রে ওই একই দিনে রাজ্য সরকারের অনুমোদনের পর শিখরের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে এসিবি। সূত্র জানিয়েছে, শিখর বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন। দেশে ফিরলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।