এনভিডিয়ার সিইও-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তথ্যপাচার? জানতেন ট্রাম্পও? চিনা সুন্দরীকে নিয়ে চিন্তায় আমেরিকা
এনভিডিয়া জানিয়েছে, তাদের চিপ চিনে পাচার হওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। বরং, চিন নিজেই তাদের নিজস্ব শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন এআই চিপের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে।
আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার বাজারে এনভিডিয়ার পরিচয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা এআই) ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে। বাজারে শক্তিশালী এআই চিপ বিক্রি করে তারা। সেই এনভিডিয়ার সিইও-র ঘনিষ্ঠ হয়েই নাকি সংস্থার গোপন তথ্য চিনে ‘ফাঁস করেছিলেন’ এক চিনা তরুণী। বিষয়টি নাকি জানতেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। কিন্তু, কোনও পদক্ষেপ করেননি তিনি। তেমনটাই উঠে এসেছে একটি প্রতিবেদনে।
সেই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে হইচই পড়তেই এ বার মুখ খুললেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং। চিনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তদন্তাধীন একটি সংস্থার সঙ্গে তাঁদের ব্যবসায়িক লেনদেনকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর। ওই প্রতিবেদন উঠে এসেছে, চিনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন হুয়াং। তাঁকে নিশানা করেছিলেন এক চিনা তরুণী ‘গুপ্তচর’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে ছিলেন এক জন তরুণী ব্যবসায়ী, যিনি হুয়াংয়ের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং এনভিডিয়ার উন্নত এআই চিপ ও অন্যান্য তথ্য বেজিঙের কাছে পাচার করছিলেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি অ্যালিস হুয়াং নামের এই তরুণীকে চিনা নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির দাবি, চিনের হয়ে চরবৃত্তি করতেন ওই তরুণী। পাশাপাশি, সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার কোম্পানি ‘মেগাস্পিড’-এর শীর্ষ পদেও কর্মরত ছিলেন ডাকসাইটে সুন্দরী অ্যালিস। নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি অনুযায়ী, অ্যালিস এক জন চিনা বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী, যিনি মেগাস্পিডে শীর্ষ নির্বাহী পদে যোগ দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরকারের শেষের দিকে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ মেগাস্পিডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। কারণ, তাদের সন্দেহ ছিল, সংস্থাটি চিনকে এনভিডিয়ার এআই চিপ পাইয়ে দিয়ে আমেরিকার বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলতে সহায়তা করছে।
বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে এনভিডিয়ার সিইও হুয়াং জানিয়েছেন, মেগাস্পিডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এনভিডিয়ার সম্পর্ক ছিল যথাযথ। তিনি আরও জানান, মেগাস্পিড অবৈধ ভাবে এনভিডিয়ার এআই প্রসেসর চিনে পাঠিয়েছে কি না, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে সংস্থাটি প্রয়োজনীয় তদন্তও করেছিল। সেখানে কোনও বেনিয়ম ধরা পড়েনি।
হুয়াংয়ের কথায়, ‘‘মেগাস্পিডের কাছে আমাদের পাঠানো জিপিইউ ব্যবহারের হিসেব রেখেছি। আমার মনে হয়, মার্কিন সরকারও এ বিষয়ে খোঁজখবর রেখেছে।’’ হুয়াং আরও জানান, অ্যালিসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অন্যান্য চিনা গ্রাহক বা এগজ়িকিউটিভদের সঙ্গে হওয়া সাধারণ যোগাযোগের মতোই ছিল। তিনি এখন আর মেগাস্পিডের সঙ্গে যুক্ত নন বলে জানান হুয়াং। তিনি বলেন, “আমাদের সম্পর্ক বা যোগাযোগ যা-ই ছিল, তা মেগাস্পিডের কারণেই ছিল। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল, এতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।” তিনি আরও জানান, অ্যালিসকে নিয়ে মার্কিন সরকারের কোনও সন্দেহের কথা তাঁকে আগে জানানোও হয়নি।
উল্লেখ্য, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ওই প্রতিবেদনে দাবি, প্রায় বছর খানেক আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ওই গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে জানানো হয়েছিল। কিন্তু, তিনি কোনও পদক্ষেপ করেননি। বিভিন্ন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়েছে, এনভিডিয়ার ক্রমবর্ধমান ব্যবসায় কোনও বিঘ্ন ঘটাতে চাননি ট্রাম্প। কারণ, এই ব্যবসা মার্কিন অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারকে সচল রাখতে সহায়তা করছে। এ ছাড়া, চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তাঁর ছিল।
আরও পড়ুন:
অন্য একটি উদ্বেগজনক বিষয় হল, রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের সঙ্গে এনভিডিয়া প্রধানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায়, ট্রাম্প কী ভাবছেন বা কী পরিকল্পনা করছেন, তা জেনসেন হুয়াংয়েরও জানার সম্ভাবনা ছিল। এ দিকে, আমেরিকা এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করার পর মেগাস্পিডের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অ্যালিসের ভূমিকা কমে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েক জন ঊর্ধ্বতন কর্তার সন্দেহ ছিল, চিনের হয়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অ্যালিসের ভূমিকা সম্পর্কে এনভিডিয়ার প্রধান হয়তো অবগত ছিলেন। তবে, সংস্থার মুখপাত্র জন রিজো বলেছেন, “মিসেস অ্যালিসের সঙ্গে হুয়াংয়ের যোগাযোগ অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করা একজন সিইও-র কাজেরই অংশ। হুয়াং প্রতি বছর হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।”
রিজো আরও বলেন, ‘‘মেগাস্পিডের মতো গ্রাহকেরা কেবল সাধারণ ব্যবসায়িক তথ্যই পেয়ে থাকেন। এনভিডিয়ার কোনও সংবেদনশীল বাণিজ্যিক গোপন তথ্য বা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও তথ্য তাদের দেওয়া হয় না।” তা ছাড়া, অ্যালিস যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেই মেগাস্পিডকে নিয়ে এনভিডিয়া নিজেই তদন্ত করেছিল। সেই তদন্তে মেগাস্পিডের মাধ্যমে চিনে চিপ পাচার হওয়ার অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়।
এনভিডিয়া জানিয়েছে, তাদের চিপ চিনে পাচার হওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। বরং, চিন নিজেই তাদের নিজস্ব শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন এআই চিপের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চিনা দূতাবাসও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে, এই অভিযোগগুলি আমেরিকার একটি বৃহত্তর, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের অংশ, যার মাধ্যমে চিনকে লক্ষ্য করে ভিত্তিহীন অপবাদ দেওয়া এবং কুৎসা ছড়ানো হচ্ছে।
২০২২ সালে মার্কিন সরকার উন্নত এনভিডিয়া সেমিকন্ডাক্টরের চিনে প্রবেশ ঠেকাতে রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু, কিছু প্রতিষ্ঠান অবৈধ ভাবে এই হার্ডঅয়্যারগুলি চিনের সীমান্তে পাচার করে বলে অভিযোগ। একই সময়ে, অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের কাজ শুরু করার মাধ্যমে আইনগত সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ চিপ সংগ্রহ করে। তারা সেখানে ডেটা সেন্টার গড়ে তুলছে। সেই ডেটা সেন্টারগুলিই আবার ভাড়া নিচ্ছে চিন। ফলে, ওই চিনা সংস্থাগুলি সেখানকার ‘কম্পিউটিং পাওয়ার’ও ব্যবহার করতে পারছে।
মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ এই পরিকাঠামোগত ব্যবস্থাকে একটি সমস্যাজনক ‘নিয়ন্ত্রক ফাঁক’ হিসেবে দেখেছিলেন, যার প্রেক্ষিতে আগের বাইডেন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তবে, পরবর্তী কালে ট্রাম্প প্রশাসন সেই পদক্ষেপগুলি প্রত্যাহার করে নেয়। মার্কিন সরকার বর্তমানে এই প্রক্রিয়ার উপর পুনরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এটি সরাসরি মেগাস্পিডের মতো বিদেশি ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারীদের উপর প্রভাব ফেলে, যারা চিনের বাজারে পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই চিপগুলি সংগ্রহ করে থাকে।
আমেরিকা যখন অ্যালিসের উপর নজরদারি চালায়, তখন দেখা যায় যে তিনি একজন মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। সাধারণত মার্কিন নাগরিকদের উপর নজরদারি চালানোর জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হয়। তবে, ‘আনমাস্কিং’ বা পরিচয় উন্মোচনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনও নাগরিকের পরিচয় জানা সম্ভব হতে পারে, যদি কোনও সরকারি সংস্থা প্রমাণ করতে পারে যে বিদেশি যোগাযোগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বোঝার জন্য ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা জরুরি। সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জানা যায়, চিনা তরুণী অ্যালিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মার্কিন নাগরিকটি ছিলেন স্বয়ং এনভিডিয়া-প্রধান জেনসেন হুয়াং।
২০২৫ সালের আগে এনভিডিয়ার সিইও খুব কমই ওয়াশিংটনে আসতেন এবং রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। তবে, ট্রাম্প প্রশাসন যখন এনভিডিয়ার সেমিকন্ডাক্টর চিনে পাঠানোর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনা করছিল, তখন এনভিডিয়ার প্রধান এবং তাঁর স্ত্রী ট্রাম্পের ‘মার-এ-লাগো’ রিসোর্টে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের নৈশভোজে যোদ দেন। সেখানে নাকি তিনি ব্যক্তিগত ভাবে প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানান, যাতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে বেজিঙের সঙ্গে তাঁদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
এর পরেই গত বছর এনভিডিয়াকে চিনে পুরনো প্রজন্মের চিপ বিক্রির অনুমতি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিনিময়ে তিনি বিক্রয়লব্ধ আয়ের একটি অংশ পাওয়ার শর্ত রেখেছিলেন। ঘটনাচক্রে এনভিডিয়া ট্রাম্পের সরকারি তহবিলে অন্তত ২ কোটি ডলার অনুদানও দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে ৫০,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এমনকি, গত মাসে হোয়াইট হাউসে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও এনভিডিয়ার সিইও-কে প্রধান টেবিলে আসন দেওয়া হয়েছিল।