আন্ডারওয়ার্ল্ডের কায়দায় কোটি কোটি ডলার ‘তোলা’ আদায়, আরব শেখদের ঘুম উড়িয়েছে পারস্যের ‘ডন’!
ইরান ও তাদের মদতপুষ্ট হুথিদের হামলা থেকে খনিজ তেল, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো বাঁচাতে তেহরানকে মোটা টাকা ‘তোলা’ দিচ্ছে একাধিক আরব রাষ্ট্র। পশ্চিম এশিয়ার নতুন ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে তেহরান?
এ যেন ৯০-এর দশকের মুম্বই, যেখানে দাপিয়ে বেড়াত কুখ্যাত সব ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন’! দাউদ ইব্রাহিম কাসকার, ছোটা শাকিল, আবু সালেম থেকে ছোটা রাজন বা অরুণ গাউলি। পৈতৃক প্রাণ রক্ষায় যাঁদের নিয়মিত ‘তোলা’ দিতে বাধ্য হতেন শিল্পপতি, ছোট ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি নামী-দামি বলি তারকাও। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর হুবহু সেই ছবিই যেন দেখা যাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায়। ক্রমেই সেখানকার ‘বেতাজ় বাদশা’ হয়ে উঠেছে ইরান।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক আরব দুনিয়ার একাধিক রাষ্ট্রকে নিশানা করে যাচ্ছে তেহরান। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার রোষ থেকে বাঁচতে পারেনি ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, জর্ডন এবং ওমানের মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্র। এরই মধ্যে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো, সৌদি আরবে আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়িয়েছে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি।
এহেন পরিস্থিতিতে তেহরানকে ‘নজরানা’ দিয়ে সংঘর্ষবিরতি নিশ্চিত করতে চাইছে একাধিক উপসাগরীয় রাষ্ট্র। যার মধ্যে অন্যতম হল সৌদি আরব। সম্প্রতি, এই ইস্যুতে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইজ়রায়েলি গণমাধ্যম ‘ইজ়রায়েল হায়োম’। তাদের দাবি, ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের শান্ত করতে ইরানের মাধ্যমে তাদের ১০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ‘ঘুষ’ দিতে রাজি হয়েছে রিয়াধ। আর, এই মধ্যস্থতায় রয়েছে ‘দালাল’ পাকিস্তান।
উল্লেখ্য, গত ২৬ অক্টোবর ইরান সফর করেন সৌদির রাজপুত্র তথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সলমন। তেহরানে পৌঁছে সাবেক পারস্যের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সারেন তিনি। সেখানে হাজির ছিলেন পাক ফৌজের সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্স) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা ‘এমআইটি’-র প্রধান ইব্রাহিম কালিন।
‘ইজ়রায়েল হায়োম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বৈঠকেই হুথি হামলার থেকে সুরক্ষা চেয়ে ইরানকে ‘তোলা’ দিতে রাজি হয়েছে সৌদি আরব। শুধু তা-ই নয়, ‘নজরানা’ হিসেবে ১০০ কোটি ডলার নাকি প্রেসিডেন্ট পেজ়েশকিয়ানের হাতে তুলেও দিয়েছেন রিয়াধের রাজকুমার! সেই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘সি-১৩০ হারকিউলিস’ সামরিক মালবাহী বিমানে তেহরান যেতে হয়েছে তাঁকে। যার পেটে লুকোনো ছিল টাকার ব্যাগ।
আরও পড়ুন:
যদিও ঘুষের বিনিময়ে ইরান বা হুথি হামলা বন্ধ করার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করেনি রিয়াধ। রাজকুমার খালিদের তেহরান সফর নিয়ে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে সৌদির বিদেশ মন্ত্রক। সেখানে বলা হয়েছে, ‘‘সংঘাত পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে সাবেক পারস্যে গিয়েছেন তিনি। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা সফল করা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং শান্তি ফেরানো এর মূল উদ্দেশ্য।’’
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে পড়ে, লড়াইয়ের প্রথম দিনেই ‘সুপ্রিম লিডার’ তথা শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লা আলি খামেনেই, তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং বেশ কয়েক জন সেনা কমান্ডারকে হারায় তেহরান। এর পরই প্রত্যাঘাত শাণাতে অদ্ভুত একটি রণকৌশল নেয় ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।
আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের মতো জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’কে ঠেকাতে প্রথমেই আরব দুনিয়ার সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে দেয় ইরানি ফৌজ। দ্বিতীয় ধাপে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে তারা। পাশাপাশি, ‘তরল সোনা’র পরিশোধনাগার থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় আছড়ে পড়ে আইআরজিসি-র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন।
ইরানি ফৌজের এই রণকৌশলে চরম বিপাকে পড়ে সৌদি আরব। কারণ, রিয়াধের অর্থনীতি পুরোপুরি খনিজ তেলের উপর নির্ভরশীল। হরমুজ় বন্ধ হওয়ায় ভারত-সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে তেল বিক্রি করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি, আরব রাষ্ট্রটির সরকারি তেল পরিশোধন সংস্থা ‘আরামকো’র বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরায় লাগাতার আছড়ে পড়তে থাকে আইআরজিসি-র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন।
আরও পড়ুন:
এই অবস্থায় তেহরানের রোষ থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি ৪৫ বছরের পুরনো ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’-কে সক্রিয় করে রিয়াধ। ফলে, রাতারাতি প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার লম্বা ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। পাশাপাশি, ইরানের বিভিন্ন এলাকায় বোমাবর্ষণ করে সৌদির বিমানবাহিনী।
কিন্তু, তার পরেও আইআরজিসি-কে বাগে আনতে ব্যর্থ হয় রিয়াধের ফৌজ। এর জেরে বাড়তি নিরাপত্তার খোঁজে গত অগস্টে পাকিস্তান ও তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে একটি ত্রিশক্তি জোট গড়ে তোলে সৌদি। যার পোশাকি নাম ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা’ চুক্তি। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, অন্য কোনও শক্তি দ্বারা এই তিন দেশের যে কোনও একটি আক্রান্ত হলেই, তাকে রিয়াধ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মক্কা চুক্তিতে সই করেও সৌদি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ, তত দিনে ইয়েমেনের বেশ কয়েকটি কৌশলগত এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এর পর রিয়াধের উপর চাপ বাড়িয়ে লোহিত সাগর সংলগ্ন সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বাব এল-মান্দেব প্রণালীটি অবরুদ্ধ করে তারা।
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সৌদির ‘পূর্ব পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনে’ লাগাতার হামলা চালায় হুথি গোষ্ঠী। এতে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘তরল সোনা’ পরিবহণের ওই বিকল্প রাস্তা। অক্টোবরে রিয়াধের রক্তচাপ বাড়িয়ে বিমানবন্দর-সহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিকে নিশানা করে ওই ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ফলে, মারাত্মক ভাবে হ্রাস পায় আরব রাষ্ট্রটির খনিজ তেলের রফতানি বাণিজ্য।
ইজ়রায়েলি গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, এই হাঁসফাঁস অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাইছে সৌদি রাজপরিবার। কারণ, মক্কা চুক্তিতে সই করা দুই ‘বন্ধু’ তুরস্ক ও পাকিস্তান যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে পারবে না, তা ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে তারা। আর তাই, ইরানের সঙ্গে গোপন চুক্তি সেরে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রিয়াধ। তেহরান সফরের মাধ্যমে তার সূত্রপাত যে রাজপুত্র খালিদ করলেন, সে কথা বলাই বাহুল্য।
বিশেষজ্ঞদের চোখে, সৌদির এই পদক্ষেপ মোটেই অস্বাভাবিক নয়। সূত্রের খবর, গত অগস্টে ইরানের সঙ্গে একই রকম সমঝোতা করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই)। এর জেরে আবু ধাবির থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং প্রায় দু’টন সোনা হাতে পায় তেহরান, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২৮.৩ কোটি মার্কিন ডলার বলে জানা গিয়েছে।
এ বছরের ১৮-১৯ মার্চের মধ্যে কাতারের রাস লাফান শিল্পতালুকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় আইআরজিসি। এতে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দোহার তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন এবং রফতানির পরিকাঠামো। এর পর আর দেরি না করে গোপনে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই আরব রাষ্ট্র। বিপুল সোনা ‘তোলা’ দিয়ে তেহরানের আক্রমণ বন্ধ করায় তারা।
এ বছরের এপ্রিলে হরমুজ়ে চলাচলকারী তেলের ট্যাঙ্কারগুলিতে বিশেষ ট্রানজিট ফি চাপায় ইরান। তার পর থেকে ব্যারেল প্রতি এক ডলার বা জাহাজ পিছু কম-বেশি ২০ লক্ষ ডলার আদায় করছে তেহরান। যার তীব্র বিরোধিতা করে যাচ্ছে আমেরিকা। আইআরজিসি-র হামলার ভয়ে এ বার কি ওই ‘তোলা’ দিতে বাধ্য হবে পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রও। সৌদির সিদ্ধান্তে বাড়ছে সেই জল্পনা।