তাল তাল সোনা কিনে গোপনে জঙ্গলে পুঁতে রেখে আসছেন ভাইকিংয়ের বংশধরেরা! তার পরই যা ঘটছে...
কিসের টানে জঙ্গলে সোনা রেখে আসছেন বিনিয়োগকারীরা? কোন ভরসায় ভাবছেন, সেই সোনা সেখানে নিরাপদে ফুলেফেঁপে উঠবে? বাস্তবে কি তেমনটাই ঘটছে?
সুরক্ষিত বিনিয়োগ হিসেবে তালিকার উপরের দিকেই স্থান থাকে সোনার। দুঃসময়ের জন্য কাঞ্চনে বিনিয়োগ করাকেই শ্রেয় বলে মনে করে রাষ্ট্রশক্তি থেকে শুরু করে আমজনতা। আর, এই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই একদল প্রতারক নিঃস্ব করে ছেড়েছে নিরীহ বিনিয়োগকারীদের।
নরওয়েতে একদল প্রতারকের উদ্ভব ঘটেছে। প্রতারণার অভিনব কৌশল খুঁজে বার করেছে তারা। আমজনতাকে সোনা কিনে তা জঙ্গলে রেখে আসার জন্য প্ররোচিত করছে এই দলের সদস্যরা। প্রথমে প্রতারকরা ফোন কল বা অনলাইনে যোগাযোগ করে সাধারণ মানুষকে বিপুল পরিমাণ সোনা কিনতে প্রলুব্ধ করছে। তারা যুক্তি সাজাচ্ছে, ভবিষ্যতে সোনার দাম চড়চড় করে বাড়বে। ফলে, এই বিনিয়োগ থেকে মোটা অঙ্কের লাভ করা সম্ভব হবে।
তারা বিনিি
প্রকাশ্যে আসা ঘটনাক্রম থেকে জানা গিয়েছে, প্রথমে বিনিয়োগকারীদের সোনা কিনে নির্দিষ্ট জঙ্গলে রেখে আসতে বলে প্রতারকেরা। তারা আশ্বাস দেয়, সেখানে সোনা নিরাপদে থাকবে। সময়ের সঙ্গে তার দামও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে, এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ভুক্তভোগীরা তাঁদের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়ে ধনে-প্রাণে মারা পড়েন। কারণ, পরে তাঁরা দেখেন, সমস্ত জমানো সোনা হাপিশ হয়ে গিয়েছে!
জানা গিয়েছে, প্রতারকেরা গ্রাহকদের বুঝিয়েছিল, সোনা নিরাপদে রাখার জন্য তারা একটি বিশেষ দল বা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সেই মতো পূর্বপরিকল্পিত কোনও একটি নির্জন জায়গায় বা জঙ্গলে সোনা রেখে আসতে বলত তারা। এই সম্পদ নিরাপদে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, এমন একটি বিশ্বাসও গড়ে তুলতে সক্ষম হয় প্রতারক দলটি।
আরও পড়ুন:
অনেক সময় প্রতারকরা সামনাসামনি দেখা করার কথা বলে শেষ মুহূর্তে ফাঁকি দিয়ে গ্রাহককে তাঁর সোনা কোনও উদ্যান বা জঙ্গলে রেখে আসতে বলে। সহজ সরল বহু মানুষ তাদের কথা বিশ্বাস করে জঙ্গলেই লাখ লাখ টাকার সোনা বা সোনার বাট ফেলে আসেন। আর, তার পরই প্রতারকরা তা তুলে নিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।
এই প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে নরওয়ে সরকার। দেশটির আর্থিক পরিষেবা খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘ফিন্যান্স নরগে’ সাধারণ মানুষকে প্রতারকদের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
হঠাৎ কানাঘুষো ছড়িয়ে পড়ে, দেশ জুড়ে বেশ কয়েক জন ব্যাঙ্ক গ্রাহক তাঁদের বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নির্দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে সোনা কিনেছেন। এর পরই এই ধরনের প্রতারণা থেকে গ্রাহকদের রক্ষা করতে কোমর বেঁধে মাঠে নামে সে দেশের ব্যাঙ্কিং সংস্থাগুলিও। এই ধরনের ‘সোনালি প্রতারণা’র কৌশল চেনা এবং প্রতারকদের ফাঁদ এড়ানোর উপায় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা।
‘ফিন্যান্স নরগে’-এর তথ্য অনুযায়ী, অসলো এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্গেন-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন প্রতারণার শিকার হয়ে বহু গ্রাহক তাঁদের বিরাট অঙ্কের সঞ্চয় হারিয়েছেন। তাই, ব্যাঙ্কগুলি এখন নরওয়ের জনগণকে এই ধরনের যে কোনও ‘সোনার নিরাপদ বিনিয়োগ’ প্রস্তাব সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ফিন্যান্স নরওয়ের জালিয়াতি-বিরোধী কার্যক্রমের পরিচালক গ্রাই নেরগার্ড জানিয়েছেন, প্রতারণার প্রথম ঘটনাগুলির খবর পাওয়া যায় গত বছরের বসন্তকালে। এর পর থেকে রাজধানী অসলো, তার আশপাশের শহরগুলি এবং নরওয়ের পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ শহর বার্গেনেও একই ধরনের প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে।
তবে, এই প্রতারণার ঘটনাগুলিতে মোট কত পরিমাণ অর্থ বা সোনা খোয়া গিয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি ‘ফিন্যান্স নরগে’। গোটা ঘটনায় জনমানসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বিপুল লাভের প্রলোভন দেখিয়ে আমজনতাকে সোনা কিনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর পর সেই সোনা নির্দিষ্ট স্থানে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে আসতে বলা হচ্ছে, যার ফলে তা চুরি হয়ে যাচ্ছে।
সোনার এই কেলেঙ্কারিটি এমন তিন ধরনের আর্থিক জালিয়াতির মধ্যে অন্যতম, যেগুলি সম্পর্কে নরওয়ের ব্যাঙ্কগুলি তাদের গ্রাহকদের সতর্ক করছে। দেশটিতে আর্থিক জালিয়াতি এখনও বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতি বছর এই ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হারাচ্ছেন গ্রাহকেরা, যা নিয়ে শঙ্কিত ব্যাঙ্কগুলি।
ফিন্যান্স নরগে-র তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নরওয়ের ব্যাঙ্ক ও তাদের গ্রাহকেরা আর্থিক জালিয়াতির কারণে সম্মিলিত ভাবে ৯৬.২ কোটি ক্রোনার, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার হারিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, নানা কৌশলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ প্রতারকেরা কুক্ষিগত করে ফেলেছে।
এই ফাঁদ এড়াতে আর্থিক পরিষেবা খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা বার বার সতর্ক করছে ভাইকিংদের দেশটির জনসাধারণকে। সম্পদ সংরক্ষণের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে সোনার পরিচিতি থাকলেও, সোনাকে কেন্দ্র করে করা প্রতিটি বিনিয়োগের প্রস্তাব বৈধ নয় বলে জানিয়েছে ফিন্যান্স নরগে। এই প্রতারণার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বিপুল লাভের আশায় সোনা কিনতে গিয়ে প্রতারকেরা শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদই হারিয়ে ফেলছেন।