মশার পর অন্য পতঙ্গে নজর, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে শক্তিশালী করতে এ বার গঙ্গাফড়িঙের ‘মাথা পড়ছে’ আমেরিকা!
ইতিমধ্যেই মশার আকারের অতি ক্ষুদ্র ড্রোন তৈরি করে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে চিন। সেই রাস্তায় হেঁটে এ বার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে আরও শক্তিশালী করতে গঙ্গাফড়িঙের আশ্রয় নিচ্ছে আমেরিকা!
মাত্র দেড় থেকে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা শরীর। ডানার আকার মেরেকেটে ১২.৫ সেন্টিমিটার। গ্রাম-গঞ্জের মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ানো অতি সাধারণ ফড়িঙের মস্তিষ্ক ‘পড়ে ফেলতে’ এ বার কোমর বেঁধে নেমেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষকদের একাংশ। উদ্দেশ্য, এর উপর ভিত্তি করে ক্ষেপণাস্ত্র বা সামরিক ড্রোন নির্মাণ। যাতে চোখের পলকে নিখুঁত নিশানায় বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে লুকিয়ে থাকা শত্রুকে ধ্বংস করতে পারে ওয়াশিংটন।
ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রযুক্তিকে অত্যাধুনিক করতে কেন হঠাৎ ফড়িংকে বেছে নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা? এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, গঙ্গাফড়িং বা ড্রাগনফ্লাইয়ের শিকার ধরার সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশ। এটা বাঘ, সিংহ বা চিতার মতো হিংস্র প্রাণীরও নেই। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট পতঙ্গটির উপর ভিত্তি করে পাইলটবিহীন যানের নকশা তৈরি করা অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করেছেন তাঁরা।
গঙ্গাফড়িঙের শরীরে বেশ কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, পতঙ্গটির চোখে এক বা দুই নয়, রয়েছে ৩০ হাজারের বেশি লেন্স। তা ছাড়া, ৩৬০ ডিগ্রি কৌণিক বিন্দুতেও স্পষ্ট দেখতে পায় সেটি। ফলে পিছন থেকে আক্রমণ করে একে ধরে ফেলা মোটেই সহজ নয়।
উল্লেখ্য, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের চোখে কালার সেন্সর থাকে তিনটি। সেখানে গঙ্গাফড়িঙের জিনে এখনও পর্যন্ত ১৫ থেকে ৩৩টি কালার সেন্সরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তা ছাড়া, মানব চোখের রিফ্রেশ রেট কমবেশি ৬৫ হার্ৎজ়। গেমিং স্মার্টফোনে সেটা ১২০ হার্ৎজ় পেয়ে থাকেন গ্রাহক। অন্য দিকে, ফড়িঙের ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক ৩০০ হার্ৎজ়।
গঙ্গাফড়িঙের ডানার সংখ্যা চার। মজার বিষয় হল, এগুলির প্রতিটিতে আলাদা আলাদা পেশি রয়েছে। ফলে ওড়ার সময় প্রতিটি ডানাকে পৃথক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এই পতঙ্গ। আগে-পিছে যাওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধবিমানের মতো মাঝ-আকাশে ডিগবাজি খাওয়ারও সক্ষমতা রয়েছে ফড়িঙের।
আরও পড়ুন:
বর্তমানে বিশ্বের তাবড় শক্তিশালী সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত চার ডানাযুক্ত ড্রোনের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে নিজের জাত চিনিয়েছে ‘ফার্স্ট পারসন ভিউ’ বা এফপিভি নামের আকারে ছোট অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী বিশেষ ধরনের একটি পাইলটবিহীন যান। কিন্তু গঙ্গাফড়িঙের মতো এদের প্রত্যেকেই মাঝ-আকাশে ডিগবাজি খেতে অক্ষম।
একটি পূর্ণবয়স্ক ফড়িং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। এদের মস্তিষ্ক একটি ১৬ নিউরনের সার্কিটের সঙ্গে তুলনীয়। সেখান থেকে ওড়া, মাঝ-আকাশে রাস্তা বদল বা শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো যাবতীয় নির্দেশ পেয়ে থাকে তারা।
বাঘ, সিংহ বা চিতার মতো শিকার ধরার সময় সাধারণত পিছন থেকে হামলা করে না ফড়িং। বরং পরের মুহূর্তে শিকার কোন দিকে পালাতে পারে সেটা বুঝে নেওয়ার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তাদের। সেইমতো ঘুঁটি সাজিয়ে আসরে নামে তারা। সেটা মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষকদের প্রাণীটির প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
পৃথিবীর যে কোনও প্রাণীরই চোখের একটি প্রতিবর্ত সময় রয়েছে। দৃশ্যমান কোনও উদ্দীপক বস্তুর নড়াচড়া দেখার পর সেটার প্রতিক্রিয়া জানাতে কিছুটা সময় নেয় মস্তিষ্ক ও শরীর। একেই বলে প্রতিবর্ত সময়। মানুষের ক্ষেত্রে সেটা ৩০০ মিলি সেকেন্ড। অন্য দিকে, এর জন্য মাত্র ৫০ মিলি সেকেন্ড সময় নিয়ে থাকে কোনও ফড়িং।
আরও পড়ুন:
এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে মাথায় রেখেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের জন্য গঙ্গাফড়িঙের মস্তিষ্কের আদলে বিশেষ কম্পিউটার অ্যালগরিদম তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সান্ডিয়া ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজ়’। যদিও এই গবেষণা একেবারেই সহজ নয়। পাশাপাশি তাদের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, বর্তমান প্রজন্মের যুদ্ধে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। একে এড়িয়ে হামলার পরিকল্পনা করতে হচ্ছে সেনা কমান্ডারদের। বাস্তবের গঙ্গাফড়িঙের এ সব ঝামেলা নেই। পতঙ্গটি নিজের ইচ্ছামতো শিকার ধরতে পারে। ফলে, গবেষকদের পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
গত বছরের জুনে চিনা মাইক্রো ড্রোনকে নিয়ে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে হংকঙের ইংরেজি গণমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। সেখানে বলা হয়, সামরিক অভিযানের জন্য মশার আকারের পাইলটবিহীন যান তৈরি করে ফেলছেন বেজিঙের প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা।
‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্য চিনের হুনান প্রদেশের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ ডিফেন্স টেকনোলজির (এনইউডিটি) একটি রোবোটিক্স ল্যাবরেটরি তৈরি করেছে এই মাইক্রো ড্রোন। এর নমুনাও (প্রোটোটাইপ) দেখানো হয় ‘চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি)’ নামের বেজিঙের রাষ্ট্রায়ত্ত সামরিক চ্যানেলে।
টিভিতে সম্প্রচারিত ভিডিয়োয় এনইউডিটির ছাত্র লিয়াং হেক্সিয়াং-কে অতি ক্ষুদ্র ড্রোনটিকে হাতে ধরে থাকতে দেখা গিয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘আমার হাতে যেটি রয়েছে, সেটি একটি মশার আকারের রোবট। এই ধরনের ক্ষুদ্র রোবট যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য গোপন অভিযানের জন্য উপযুক্ত।’’
চিনের তৈরি মশার আকারের ড্রোনটিতে বেশ কয়েকটি ডানা রয়েছে। এর পায়ের সংখ্যা তিন। পাইলটবিহীন মাইক্রো যানগুলি লম্বায় প্রায় ১.৩ সেন্টিমিটার বলে জানা গিয়েছে। স্মার্টফোনের সাহায্যে এগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে দাবি করেছে বেজিঙের প্রতিরক্ষা গবেষক বাহিনী।
তবে চিনের এই মশা-ড্রোন কখনও কোনও লড়াইয়ে ব্যবহার করা হয়নি। সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পটিও কতকটা বেজিঙের মতোই। সেটা যুদ্ধের ময়দানে কতটা কাজে আসবে, তার উত্তর দেবে সময়।